ড. জোয়াকিম খানিক বিমূঢ় ভাবে বসে থেকে হঠাৎ আনন্দে চিৎকার করে উঠে প্লেনের মধ্যেই আমায় জড়িয়ে ধরলেন। তারপর সে কী উচ্ছাস! সত্যি একথাটা আমার মাথাতেই আসেনি, ডস। ওয়ালিস আর সামোয়া দ্বীপপুঞ্জ যে পাশাপাশি হলেও আন্তর্জাতিক তারিখ-লাইনের দুধারে এ খেয়ালই আমার হয়নি! তোমায় কী বলে যে ধন্যবাদ দেব!
হেসে বললাম, ধন্যবাদ আমায় নয়, দিন ওই কেঁচোদের?
কেঁচোদের! জোয়াকিম আবার হতভম্ব।
হ্যাঁ, সেই কেঁচোদের, যাদের অনুগ্রহ ছাড়া ও-দ্বীপ অমম সবুজ হত না আজ, আর আমরাও চিনতে পারতাম না, শত চেষ্টাতেও।
তার মানে?
তার মানে এই যে গত মহাযুদ্ধের আগে নাৎসি গুণ্ডাদের হাত থেকে বাঁচাতে আপনাকে ও-দ্বীপ থেকে সরিয়ে দেবার সময়ই, দ্বীপটা পরে খুঁজে পাবার ওই বুদ্ধি আমি করেছিলাম। আপনার মনে আছে কিনা জানি না যে মার্কিন মুলুক থেকেই আমি আপনার ও-দ্বীপে যাই। আমেরিকার এক কেঁচো-পালন কেন্দ্র থেকে কেঁচোর ডিমের গুটি আমি সঙ্গে করে এনেছিলাম। সেই ডিমভরা গুটিই আমি ও-দ্বীপে ছেড়ে দিয়ে আসি। জানতাম যে কয়েক বছরের মধ্যেই ওই সব গুটির ডিম থেকে বেরিয়ে সারা দ্বীপ কেঁচোয় ছেয়ে যাবে আর তারাইনীচের মাটি ওপরে তুলে সমস্ত দ্বীপ উর্বর করে তুলবে। করেছেও তাই। সেই উর্বর মাটিতেই ঘাস-ঘাসড়া গজিয়ে সমস্ত দ্বীপ সবুজ হয়ে গেছে। সেই দেখেই আমি ও-দ্বীপ চিনেছি। নরফোক দ্বীপে আমি বলেছিলামপনেরো বছরে তিন ইঞ্চি হিসেব দেখেই আপনার দ্বীপ আমি চিনব। প্রায় পনেরো বছর বাদে এ-দ্বীপে আমরা এলাম। পনেরো বছরে কেঁচোরা সাধারণত তিন ইঞ্চি উর্বর মাটি নীচে থেকে ওপরে তুলে আমায় বলেই ওকথা বলেছিলাম।
ঘনাদা একটু থামলেন। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার ড, জোয়াকিম তাহলে তাঁর দ্বীপের ইজারা আবার পেলেন?
পেলেন বইকি! প্যাগো প্যাগোতে নেমেই নতুন করে রেজেস্ট্রি করিয়ে নিলেন। সেখান থেকে সবার আগে অস্ট্রেলিয়ার সমস্ত রেজেস্ট্রি অফিসেও খবর পাঠিয়ে দেওয়া হল।
মুখের গ্রাস হারিয়ে সেই সিডনি নিশ্চয় তখন খাপ্পা! গৌর ভোজের শেষে পান মশলাও বাদ দিতে চায় না। জিজ্ঞাসা করলে, আপনার সঙ্গে আর দেখা হয়নি?
হয়েছিল। প্যাগো প্যাগোতেই এসেছিল আমার দফা নিকেশ করতে!
তারপর? আমরা উদগ্রীব।
ঠিক জানি না। হাসপাতাল থেকে এতদিনে বোধহয় বেরিয়েছে! ঘনাদা হাই তুললেন।
আচ্ছা, আপনার ড. জোয়াকিম তাঁর লুকোনো গবেষণার জিনিস খুঁজে পেয়েছেন তো! আমরা এখনও কৌতূহলী।
পেয়েছেন। ঘনাদা সংক্ষিপ্ত।
অত দামি গবেষণার বস্তুটা কী? আমাদের সবিনয় নিবেদন।
বস্তুটা কী? ঘনাদা অবজ্ঞা ভরে আমাদের দিকে তাকালেন, বস্তুটা কী, তোমরা বুঝবে?
না বুঝি, তে দোষ কী? আমাদের সবিনয় নিবেদন।
বস্তুটা একটা অঙ্ক। ঘনাদার মুখে অনুকম্পা মিশ্রিত তাচ্ছিল্যের হাসি।
অঙ্ক!
হ্যাঁ, স্রেফ একটা অঙ্ক যার কিছুটা কষা বাকি রেখে জোয়াকিমকে পালাতে হয়েছিল। পুরোনো কাগজপত্র উদ্ধার করে এখনও তিনি যা কষছেন।
একটা অঙ্কের জন্যে এত! আমাদের সন্দেহমিশ্রিত বিস্ময়।
হ্যাঁ, একটা অঙ্কের জন্যে। একটা অঙ্কের কী দাম হতে পারে ভাবতে পারো? ঘনাদা আবার উত্তেজিত, ই ইকোয়াল টু এম সি স্কোয়ার অঙ্কটার কথা কখনও শুনেছ?
না শোনাই যুক্তিযুক্ত বুঝে তাঁর দিকে সসম্ভ্রমে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার অঙ্ক বুঝি ঘনাদা?
না, ঘনাদা ঝাঁজিয়ে উঠলেন, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকদের অঙ্ক, ওই একটা অঙ্কে দুনিয়ার সব মানেই পালটে গিয়েছে। ড. জোয়াকিমের অঙ্ক তার চেয়েও জটিল, সূক্ষ্ম। সে অঙ্ক কষা হয়ে গেলে মানুষের হাতে কী ক্ষমতা যে আসবে তা কেউ ভাবতেও পারে না।
এই মেসেই বসেই রাজা উজির যা চাই তা-ই হতে পারব! শিবু হঠাৎ রসভঙ্গ করে বসল, হ্যাঁ, ভাল কথা মনে পড়েছে। আপনার নুরুদ্দিনকে হুকুম পাঠিয়েছেন নিশ্চয়, ঘনাদা। কিচিন্দে যাওয়া না হয়ে ভালই হল। অ্যাঙ্গোরা খাসির মাংসটা প্রাণ ভরে খাওয়া যাবে, কী বলেন?
কেমন করে যাবে? নুরুদ্দিন তো খাসি তৈরিই রেখেছিল, কিন্তু সবাই কিচিন্দে যাচ্ছি জেনে তাকে বারণ করে দিতে হল যে! যা অভিমানী লোক, ওর কাছে আর কিছু কখনও চাওয়াই যাবে না। অম্লানবদনে বলে ঘনাদা শিশিরের দিকে হাত বাড়ালেন, গলাটা কেমন নো-শুকনো লাগছে কেন বলো তো হে?
আজ্ঞে, বুঝেছি। বলে শিশির সিগারেটের টিন আনতে ছুটল।
ঘনাদাকে ভোট দিন (পার্ট ১)
অন্য কিছু কেউ যদি শুনে থাকেন তা ভুল।
সেই বাহাত্তর এখনও।
না, বাহারে কিছু নয়, বাহাত্তর নম্বর সেই বনমালি নস্কর লেন।
সেই ট্রাম, বাস, লরি, মোটর, রিকশা, ঠেলা আর মানুষের ভিড়ের ধাক্কায় যেন টলতে টলতে ছিটকে পড়া নোংরা, সরু, আঁকাবাঁকা গলিটা। সেই উপচে-পড়া ডাস্টবিন আর খুঁটে-লেপটানোপোড়া বাড়ির দেওয়াল বাঁচিয়ে, একবার ডাইনের। খাটালের সুবাসে আর একবার বাঁয়ের টিনের কারখানার ঝাঁপতাল সংগীতে দিশাহারা হয়ে খাপরা আর টিনের চালের বস্তির মধ্যে যেন থমকে দাঁড়ানো বেঢপ বেমানান পলস্তারা-খসা সেকেলে বাড়িটা।
সেই আমাদের বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের মেস ঠিক যেমনটি ছিল তেমনিই আছে।
ওর আর অদল বদল হবার কোনও আশা নেই।
কিন্তু কী সুবিধেটাই না হয়েছিল! একেবারে আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়ার মতো। সে চেরাগ হাতে পেয়েও কেন যে সব ভেস্তে গেল, সে কাহিনী বলতে গেলে একেবারে গোড়া থেকে শুরু করতে হয়।
