সিডনি আবার হো হো করে হেসে উঠে বললে, ও, এ-দ্বীপ তোমাদের! মানে ওই ছুঁচো বৈজ্ঞানিক ড. জোয়াকিমের! আজ কত তারিখ তা খেয়াল আছে? ১৯৫৩ সালের ১লা জানুয়ারি, কাল ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত জোয়াকিমের ইজারা ছিল এ দ্বীপের ওপর। কালকের মধ্যে যখন নতুন ইজারা নিতে পারেনি তখন আর ইজারা পাচ্ছে কোথায়? আজকের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে গিয়ে কাল সকালেই এ-দ্বীপের অবস্থান জানিয়ে আমরা নতুন ইজারা নিচ্ছি।
ডা. জোয়াকিম এ কথা শুনে কাতরভাবে বলে উঠলেন, কী হবে তাহলে, ডস? সব যে গেল!
তাঁকে হাত নেড়ে থামিয়ে নিতান্ত নিরীহকণ্ঠে বললাম, তা ইজারা আপনারা নিতে চান, নিন। ড. জোয়াকিমের এ-দ্বীপে লুকিয়ে রাখা গবেষণার জিনিসগুলো আমরা শুধু খুঁজে নিয়ে যাই তাহলে?
খুঁজে নিয়ে যাবি তোরা, সিডনি হিংস্রভাবে হেসে উঠল, একবার চেষ্টা করে দেখই না!
সিডনি তখন পিস্তল বার করেছে, তার পেছনেও তার প্লেনের দুজন সঙ্গী এসে দাঁড়িয়েছে পিস্তল উঁচিয়ে।
তাদের দিকে চেয়ে যেন ভয়ে ভয়ে বললাম, আপনাদের যেন খুঁজতে দেবার ইচ্ছে নেই মনে হচ্ছে?
বুঝতে পেরেছিস কালা নেংটি! সিডনির সে কী উল্লাসের হাসি, নাৎসিদের ফাঁকি দিয়ে ওই ছুঁচো বৈজ্ঞানিকটা এখানকার গর্তে সেঁধিয়ে যে-গবেষণা করেছে, নাৎসিদের ভয়েই যুদ্ধের আগে যা এখানে লুকিয়ে রেখে গেছে তা আমরাই এবার খুঁজে বার করব।
ভালমানুষের মতো বললাম, কিন্তু আমরা না থাকলে কোনো জায়গাটা খুঁজতে একটু অসুবিধা হবে না? খুঁজে হয়তো পাওয়া যাবে শেষ পর্যন্ত, কিন্তু দেরি হতে পারে তো!
হয় হবে? সিডনি গর্জন করে উঠল, যতদিন লাগে খুঁজব। এ-দ্বীপ এখন আমাদের।
কিন্তু এ দ্বীপের দখল যদি না পান? নির্বোধের মতো সিডনির দিকে তাকালাম।
পাব কী! পেয়ে গেছি। সিডনি জ্বলে উঠল, আমাদের লোক অস্ট্রেলিয়ায় বসে আছে তৈরি হয়ে। খবরটা নিয়ে গেলেই রেজেস্ট্রি।
আমরা এখন যদি অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে আমাদের দাবি জানাই? আমার সরল জিজ্ঞাসা।
সিডনি চিড়বিড়িয়ে উঠল একেবারে, তোরা গিয়ে দাবি জানাবি? আমাদের প্লেনটা দেখেছিস? তোদের ও রদ্দি প্লেনের ডবল জোরে চলে। তোদের প্লেন মাঝপথে থাকতেই আমরা পৌঁছে যাব। তা ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার দিকে তাদের প্লেন একবার। চালাবার চেষ্টা করে দেখ না? কত কাল বাদে কে জানে সমুদ্রে একটা রদ্দি সি-প্লেনড়ুবির খবর শুধু বেরুবে! আমাদের প্লেনে ক-টা কামান আছে জানিস?
যেন সভয়ে বললাম, থাক, জানবার দরকার নেই। আমাদের তাহলে এখান থেকে খসে পড়াই সুবুদ্ধির কাজ?
হ্যাঁ এবং এই মুহূর্তে!মনে থাকে যেন অস্ট্রেলিয়ার দিকে প্লেন ফেরালে আর রক্ষে থাকবে না? ভালয় ভালয় যে জ্যান্ত ফিরে যেতে দিচ্ছি এই ভাগ্যি মনে কর।
ধন্যবাদ, মি. সিডনি। বলে গদগদ হয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে হতভম্ব ডা. জোয়াকিমকে নিয়ে আমাদের প্লেনের দিকে চললাম। আমাদের পিছনে পিস্তল উঁচিয়ে চলল সিডনি আর তার সঙ্গীরা। আমাদের প্লেনে উঠিয়ে বিদেয় না করে তারা ছাড়বে না বোঝা গেল।
ড. জোয়াকিম যেতে যেতে হতাশভাবে বললেন, কোথায় যাবে, ডস?
দেখি কোথায় যাই! আমিও করুণ স্বরে বললাম, অস্ট্রেলিয়ার দিকে যাওয়া তো বারণ।
হ্যাঁ, অস্ট্রেলিয়া শুধু নয়, নিউজিল্যান্ডেও। পশ্চিমে কি দক্ষিণে কোনও দিকে প্লেন চালালেই মজা টের পাবে! সিডনি হুংকার ছাড়ায় বুঝলাম আমার কথাগুলো তার কানে গেছে।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, না, মজার লোভ আর নেই। পুবদিকেই তাহলে কোথাও যেতে হবে।
প্লেনে উঠে পুবদিকেই সত্যি রওনা হলাম। চালাকি করে লুকিয়ে কোথাও থেকে মুখ ঘুরিয়ে অস্ট্রেলিয়া যাবার চেষ্টা করে এখন লাভও নেই। আমাদের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সিডনির প্লেনও আকাশে উঠে চক্কর দিচ্ছে। কোনও রকমে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হলেও
সে প্লেনের আগে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছোনো যাবে না।
কিছু দূর নীরবে যাবার পর জোয়াকিম বুকফাটা যন্ত্রণার সঙ্গে বলে উঠলেন, কী যে সর্বনাশ হল, ডস! শুধু যদি একটা দিন আগে রেজেস্ট্রিটা করে ফেলতে পারতাম!
শান্তস্বরে বললাম, একটা দিন আগেই রেজেস্ট্রি করবেন, চলুন না!
এই দুঃখের ওপর আর ঠাট্টা কোরো না, ডস! জোয়াকিমের গলায় ক্ষুব্ধ ভৎসনার স্বর।
ঠাট্টা তো করছি না!
ঠাট্টা করছ না! জোয়াকিম যেভাবে আমার দিকে তাকালেন তাতে বোঝা গেল আমার মাথা খারাপ হয়েছে বলেই তাঁর সন্দেহ। একটু রাগের সঙ্গেই তারপর বললেন, একটা দিন আগে যাওয়া যায়! হ্যাঁ, টাইম-মেশিন বলে সত্যি কিছু থাকলে যাওয়া যেত।
টাইম মেশিনের দরকার নেই। এই প্লেনেই যাওয়া যায়। আর যায় শুধুনয়, আমরা আগের দিনেই সত্যি পৌছে গেছি।
জোয়াকিম হতভম্ব হয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। বললাম, আমার মুখ কী দেখছেন? নীচের দিকে তাকান। আমাদের প্লেন আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা পার হয়ে সামোয়া দ্বীপপুঞ্জের ওপর এখন এসেছে। এ তারিখ-রেখার ওপারে এখন ১৯৫৩-এর ১লা জানুয়ারি বটে কিন্তু পুবদিকে এপারে এখন ১৯৫২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। আমরা খানিক বাদেই প্রধানতম শহর ও বন্দর প্যাগো প্যাগোতে নামছি— সেখানে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব। তাদের মারফত আপনি ও দ্বীপের ইজারা বছরের এই শেষ দিনেও যদি নতুন করে নিয়ে রেজেস্ট্রি করান, আর কেউ তাহলে তারপর ও-দ্বীপ ছুঁতেও পারবে না। দুশমনদের সব শয়তানি তাহলে ভণ্ডুল!
