হেসে বললাম, দুশমনদের হাতে পড়বে কেন? তারা তো আর সে দ্বীপ চেনে না।
কিন্তু আমিও যে চিনি না!
আপনি না চেনেন, আমি তো চিনব!
তুমি চিনবে! জোয়াকিমের গলার স্বরে বোঝা গেল কথাটা তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না।
আশ্বাস দিয়ে বললাম, হ্যাঁ, চিনব। পনেরো বছরে তিন ইঞ্চি, এই হিসেব ধরেই চিনব!
সে আবার কী? প্রশ্নটা জোয়াকিম করেছিলেন কিনা জানিনা, কিন্তু আমাদের মুখ দিয়ে আপনা থেকেই বেরিয়ে গেল।
যথাসময়েই জানবে! এসব নির্বোধ প্রশ্ন যে পছন্দ করেন না তা বুঝিয়ে ঘনাদা আবার শুরু করলেন, জোয়াকিমকে সেখান থেকে সাহস দিয়ে বিদায় দেবার সময় হঠাৎ চমকে উঠলাম। অন্ধকারে কাছের একটা ঢিবির আড়াল থেকে কী যেন সরে গেল মনে হল। সেই দিকে যেতে গিয়েও নিজেকে রুখলাম। এই দ্বীপেও শত্রুর উপস্থিতি যে আমি টের পেয়েছি তা আর তাকে না জানানোই ভাল, কিন্তু আমাদের। আর দেরি করা চলবে না। জোয়াকিমের কাছে জানা গেছে যে তাঁর ইজারার মেয়াদ এই ১৯৫২-তেই শেষ। বছর শেষ হবার আগেই সুতরাং নতুন ইজারা নিতে হবে। কিন্তু দ্বীপ না খুঁজে পেলে ইজারা নেওয়া হবে কীসের? দ্বীপটা এই বছরেই না খুঁজে পেলেই নয়।
কিন্তু খোঁজবার জন্য সেখানে যাওয়া তো দরকার। ওয়ালিস দ্বীপাবলিতে এই বছরের মধ্যে যাব কী করে?
পরের দিন সকালে খোঁজ করতে গিয়ে একেবারে চক্ষুস্থির। নরফোক দ্বীপে চোদ্দ দিন অন্তর একটি করে প্লেন আসে অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ড থেকে আসে শুধু শনিবারে। টেলিগ্রাফও নেই যে অস্ট্রেলিয়া থেকে টেলিগ্রাফে ভাড়া করে একটা সি-প্লেন আনব। আগের দিনই ছিল শনিবার। প্লেন যা আসবার এসে চলে গেছে, সুতরাং আরও তেরোটি দিন অপেক্ষা না করে উপায় নেই। কিন্তু তেরোদিন বাদেই তো একুত্রিশে ডিসেম্বর! বছরের শেষ।
কী ভাবে যে সেই তেরোটা দিন কাটালাম তা বলে বোঝানো যায় না। এমন শুভ যোগাযোগের পর শুধু একটু সময়ের অভাবে সব আশায় ছাই পড়বে। সম্ভব হলে বোধহয় সাঁতরেই চলে যেতাম। তার বদলে শুধু হাত কামড়েই তেরো দিন কাটালাম।
একত্রিশে ডিসেম্বর প্লেনে জোয়াকিমকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেই একটা সি-প্লেন ভাড়া করতে ছুটলাম। কিন্তু ভাগ্য সেখানেও বিরূপ। সেদিন রাত্রে যাবার মতো একটা প্লেনও ভাড়া পেলাম না। রওনা হতে হল বাধ্য হয়েই তার পর দিন সকালে। পাইলটকে বলে দিলাম ওয়ালিস দ্বীপপুঞ্জের ওপর গিয়ে শুধু যেন খানিক চক্কর দিয়ে ফেরে। ভোর না হতে বেরিয়েছিলাম। দুপুর নাগাদ ওয়ালিস দ্বীপপুঞ্জের মাথায় গিয়ে প্লেনটা চক্কর দিতে লাগল। জোয়াকিম ও আমি দুজনেই তখন প্লেনের দুদিকের জানালায় মুখ বাড়িয়ে নীচের দিকে চোখ এঁটে বসে আছি। এক রাশ ছোট ছোট পাথুরে দ্বীপ। সব এক রকম। আলাদা করে চেনে কার সাধ্য। প্লেনটা একটু নীচে নেমে এসে বার কয়েক চক্কর দেবার পরই আমি আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম, পেয়েছি, ড. জোয়াকিম! পেয়েছি আপনার সাতরাজার ধন মানিকের দ্বীপ!
পাইলটকে সে দ্বীপের এক ধারে খানিকটা ঘেরা বন্দরের মতো সমুদ্রে প্লেন নামাতেও বললাম।
কিন্তু বাধা দিলেন স্বয়ং জোয়াকিম। বেশ একটু সন্দিগ্ধস্বরে বললেন, করছ কী, ডস? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে! এ দ্বীপ আমার হতে পারে না।
হেসে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন বলুন তো?
কেন? জোয়াকিম একটু বিরক্তির সঙ্গেই বললেন, দেখতে পাচ্ছ না, দ্বীপটা দস্তুরমতো সবুজ!
দেখতে পাচ্ছি বলেই তো বলছি এ-ই আপনার দ্বীপ!
জোয়াকিম হতভম্ব হয়ে বললেন, তার মানে?
মানে এখুনি বুঝিয়ে দেব। আগে প্লেনটা নামতে দিন।
প্লেন সে দ্বীপের সমুদ্রে নামবার পর মানেটা জোয়াকিমকে বোঝাবার সময় কিন্তু পাওয়া গেল না। এমন আশ্চর্য সৌভাগ্যে এ-দ্বীপ খুঁজে পাবার পর তা আবার নতুন করে ইজারা নেবার যেটুকু আশা ছিল আমাদের প্লেনের মিনিট দুয়েক পরেই আর একটি অনেক বড় প্লেন নামার সঙ্গে সঙ্গে তা ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
সে প্লেন থেকে আমাদের মতোই ছোট রবারের বোটে তীরে এসে নামল আর কেউ নয়, স্বয়ং সিডনি।
আমি তখন সমুদ্রের তীরের ওপরই দাঁড়িয়ে এ-দ্বীপ কী করে চিনলাম তাই জোয়াকিমকে বোঝাচ্ছি।
একগাল হেসে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে সিডনি সমস্ত দ্বীপটাকে যেন শুনিয়ে বললে, আরে, মি. দাস না! পৃথিবীটা বড্ড ছোট মনে হচ্ছে। এখানে আপনাকে দেখব তা তো ভাবিনি!
বললাম, আমি কিন্তু জানতাম, আপনি আসছেন।
বলেন কী! সিডনি বিরাট শরীর কাঁপিয়ে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই জিজ্ঞাসা করলে, কবে থেকে?
সাপের ভয়ে যেদিন নরফোক দ্বীপে টর্চ নিয়ে বেরিয়েছিলেন সেই দিন থেকেই।
তাই থেকেই বুঝে ফেললেন! একটি বেশি হেঁয়ালি হয়ে যাচ্ছে না?
হেঁয়ালি নয়, ব্যাপারটা অত্যন্ত সোজা! আপনিও জানেন নরফোক দ্বীপে আর যাই থাক, সাপ নেই। ও কৈফিয়তটা দিয়ে সেদিন তাই ভাল করেননি। আমার ঘরে রাত্তির বেলা হানা দিতে এসেও একটু ভুল করেছিলেন বোধহয়।
কিন্তু এখন বোধহয় ভুল করিনি। সিডনির গলা কর্কশ হয়ে উঠল, সাপ না থাক, নরফোক দ্বীপে একটা নেংটি ইদুর আর ছুঁচো ছিল। সে দুটো আবার এখানে এসে জুটেছে। তাই সে দুটোকে তাড়াবার জন্যই এখানে এসেছি, বুঝতে পারছেন বোধহয়!
হেসে বললাম, আপনার উদ্দেশ্য খুব সাধু সন্দেহ নেই। কিন্তু সেদিন রাত্রে টিবির আড়াল থেকে সব শুনে ওই নেংটি ইদুর আর ছুঁচোর পিছু নিয়েই তো এ-দ্বীপের সন্ধান পেয়েছেন। এ দ্বীপটাও যে নেংটি ইদুরের না হোক ওই ছুঁচোর, তা-ও ভুলে যাচ্ছেন কেন?
