মাউন্ট পিট বলে নরফোক দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমের ছোটখাটো একটা পাহাড় থেকে তখন বেড়িয়ে ফিরছি। বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে ইতিমধ্যেই। দ্বীপের হাসপাতালটি ছাড়িয়ে কিছুদূর গিয়ে হোটেলের দিকে বাঁক নিয়েছি, এমন সময় চাপা গলায় কে যেন কোথা থেকে ডস বলে ডাকল। অন্ধকারে এদিকে ওদিক চেয়ে কাউকেই দেখতে না পেয়ে পথের ধারের পাথুরে টিবিগুলোর ওপাশে খোঁজ করব কিনা ভাবছি এমন সময় টর্চ হাতে একজনকে আমার দিকেই আসতে দেখলাম। কাছে আসবার পর দেখা গেল লোকটি মি. সিডনি।
হেসে জিজ্ঞাসা করলাম, কী মি. সিডনি! টর্চ হাতে বেড়াতে বেরিয়েছেন যে!
সাবধানের মার নেই মশাই! মি. সিডনিও হেসে বললেন, পাথুরে দ্বীপে কোথায় সাপখোপ আছে কে জানে।
মি. সিডনি টর্চ নিয়ে চলে যাবার পর বেশ চিন্তিত ভাবেই হোটেলে ফিরলাম। আমার নাম ধরে আর কোনও ডাক তারপর শুনতে পাইনি। ব্যাপারটা কি আমার মনের ভুল?
না, মনের ভুল কখনও নয়। সেদিন রাত্রে হোটেলের ঘরে আলো নিবিয়ে বসে ভাবতে ভাবতে আমার নিশ্চিত ধারণা হল, কোনও ব্যাপারেই আমার ভুল হয়নি। পথে আসতে স্পষ্ট আমার নাম ধরে কাউকে ডাকতে আমি শুনেছি। আর নম্যান হ্যারিস বলে নিজের পরিচয় যে দিতে চায় সে বৃদ্ধ মি. জোয়াকিম ছাড়া আর কেউ নয়। পনেরো-ষোলো বছর আগের কথা বটে, কিন্তু তার সঙ্গে এক-আধ দিন তো নয়, দুটি মাস আমি কাটিয়েছি, আর লোকের ভিড়ের মধ্যে নয়, একেবারে নির্জন এমন এক জায়গায় যেখানে সারাদিন দুজনেই পরস্পরের একমাত্র সঙ্গী। কিন্তু বৃদ্ধ সেই জোয়াকিমই যদি হয় তার এ দশা কেন? আমার কাছেও নাম লুকোবার এখন আর তার কী কারণ থাকতে পারে?
উত্তরটা মাঝরাতেই পেলাম।
তখনও এই সব কথা ভেবে ঘুম আমার আসেনি। মনে হল দরজায় কে যেন আস্তে আস্তে টোকা দিচ্ছে। প্রথমে মনে হল মি. সিডনির এটা আরেকটা মোটা রসিকতা হয়তো। সিডনির যেমন দশাসই পাহাড়ের মতো চেহারা, প্রাণে ফুর্তিরও তেমনই অজস্র ফোয়ারা। আমুদে মিশুকে লোক, এখানে এসে ক-দিনের আলাপেই আমার সঙ্গে জমিয়ে ফেলেছে। এই কদিন আগের রাত্রেই জানলার কাছে কী একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে জেগে উঠে দেখি, একটা বিরাট ভালুকের মতো কালো মৃর্তি পাল্লা দুটো একটু ফাঁক করে ঘরে উঁকি দিচ্ছে। ঘরে আলো নেই তখন, কিন্তু হোটেলের দূরের বারান্দার আলোয় তার আকারটা ফুটেছে জানলার ফ্রেমে সাড়া না দিয়ে চুপ করে কিছুক্ষণ থাকবার পর দেখলাম মূর্তিটা জানলা টপকে সন্তর্পণে ভেতরে নামল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এল আমার মশারির কাছে। মশারিটার একটা কোণ একটু তোলবার চেষ্টা করেই মূর্তিটা ককিয়ে উঠে মেঝের ওপর গিয়ে ছিটকে পড়ল। এক লাফে উঠে আলো জ্বেলে তারপর হেসে আর বাঁচি না। কালো পোশাক পরে মি. সিডনিই মেঝেয় কাত হয়ে পড়ে আছে। মি. সিডনিও একবার করে হাতের যন্ত্রণায় কোঁকায় আর একবার হাসে। হেসে বলতে লাগল, আমায় ভয় দেখাতে এসে এমন শাস্তি হবে জানলে সে আসত না। জব্দ করতে এসে নিজেই কিনা জব্দ। হাসতে হাসতে যাবার সময় জিজ্ঞাসা করে গেল, আমার হাতে সাঁড়াশি লুকোনো আছে। কিনা? নইলে এক মোচড়ে হাতটা ভাঙবার জোগাড় হয়।
আজ আবার সিডনি রসিকতা করতে এসে থাকলে আর একটু কড়া ওষুধ দেব ঠিক করে চুপি চুপি দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আবার দুটো টোকা পড়ল তারপর। না, সিডনি এমন ভয়ে ভয়ে টোকা দেবার মানুষ নয়।
দরজাটা হঠাৎ খুলে দিতেই যে-মূর্তিটা ছায়ার মতো নিঃশব্দে এসে ঘরে ঢুকল অন্ধকারেই সে কে বুঝতে আমার দেরি হল না।
চাপা গলায় বললাম, কী? হ্যারিস, না জোয়াকিম কী বলে এখন ডাকব আপনাকে?
ফিসফিস করে প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় সে বললে, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা দিয়ো না, ডস। আমার দুঃখের কাহিনী আগে শোনো।
শুনতে তো চাই।
তাহলে এখানে নয়। হোটেলের বাইরে কোথাও নির্জনে গিয়ে বসি, চলো।
তা-ই গেলাম আর জোয়াকিমের সমস্ত কাহিনীও শুনলাম।
আমার অনুমানে এতটুকু ভুল হয়নি। এ বৃদ্ধ সেই বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক জোয়াকিম, মহাযুদ্ধের কয়েক বছর আগে নাৎসিদের হাত এড়িয়ে নির্বিঘ্নে নিজের যুগান্তকারী গবেষণা করবার জন্যে প্রশান্ত মহাসাগরের একটি জনমানবহীন ছোট্ট দ্বীপ ইজারা নিয়ে নিজেকে যিনি সমস্ত পৃথিবী থেকে নির্বাসিত করে রাখেন।
সেই দ্বীপেই জোয়াকিমের সঙ্গে আমার তখন পরিচয়। নাৎসি চরেরা তাঁর গবেষণার দাম বুঝে হন্যে হয়ে সন্ধান করতে করতে তাঁর এই গোপন আস্তানারও যে খবর পেয়েছে এবং যে কোনও দিন যে তাঁকে পাকড়াও করতে আসতে পারে এই খবর দিতেই আমি সেখানে গেছলাম। গিয়ে তাঁর গবেষণার মূল্যবান সব কিছু লুকিয়ে রাখবার ব্যবস্থা করে, নাৎসি গুণ্ডারা সত্যিই একদিন হানা দেবার পর, একরকম তাদের নাকের ওপর দিয়ে, জোয়াকিমকে সরিয়েও দিয়েছিলাম সে দ্বীপ থেকে। যাবার সময় বলে দিয়েছিলাম পরে যে কোনও সময়ে যেন ফিরে এসে জোয়াকিম তাঁর গবেষণার কাজ উদ্ধার করেন।
কিন্তু সে তো প্রায় পনেরো বছর আগেকার কথা। তার মধ্যে অত বড় মহাযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, নাৎসি জার্মানির অস্তিত্ব আর নেই। এতদিনেও জোয়াকিম তাঁর সেই গবেষণার কাজ সে দ্বীপ থেকে উদ্ধার করতে পারেননি?
সেই প্রশ্নই অবাক হয়ে করলাম।
জোয়াকিম হতাশ ভাবে বললেন, কী করব! তুমি তো জানো, ডস, ওয়ালিস দ্বীপাবলির যেটি আমি ইজারা নিয়েছিলাম তা নেহাত নগণ্য পাথুরে একটা সমুদ্রের চড়ার মতো। ওরকম ন্যাড়া পাথুরে ছোট্ট দ্বীপ ওখানে যে কত আছে তার ঠিক ঠিকানা নেই। ইজারা নেবার কাগজপত্রও যুদ্ধের সময় হারিয়ে ফেলেছি। এখন সে দ্বীপ আমি চিনব কী করে? বুড়ো হয়েছি, কবছর আর বাঁচব! কাছাকাছি সব কটা দ্বীপ খুঁজে বেড়াতে হলে তো আমার পরমায়ুতেই কুলোবে না। তা ছাড়া আমার গভীর সন্দেহ হচ্ছে যে নাৎসিরা শেষ হয়ে গেলেও অন্য কোনও দুশমনদের চর আমার পিছু নিয়েছে। তাড়াতাড়ি গোপনে সে দ্বীপ খুঁজে বার করতে না পারলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমার গবেষণা যতদূর এগিয়ে রেখেছি তা দুশমনদের কারুর যদি হাতে পড়ে, তাহলে পাষণ্ড কোনও বৈজ্ঞানিকতা থেকেই হয়তো আসল কাজ উদ্ধার করে নেবে।
