হুঁ, গম্ভীরভাবে বলে ঘনাদা সটান ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। আমরাও আশা আশঙ্কায় দুলতে দুলতে তাঁর পিছুপিছু।
কী হল কী, ঘনাদা?
ঘনাদা তখন হুইল ছিপটা ঘরের কোণে রাখছেন। আমাদের দিকে না তাকিয়েই বললেন, কিচ্ছু না।
গৌর তাঁকে উসকে দেবার চেষ্টা করলে, হুইল ছিপ ফেলবার পুকুর নেই বলে রাগ করলেন?
না। ঘনাদা শোলার টুপি নামালেন।
তবে? কেঁচো দিয়ে মাছ ধরা পছন্দ নয়? শিবু ফোড়ন কাটল।
না, নয়। ঘনাদা গামবুট খুলতে খুলতে অগ্নিদৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকালেন।
কেঁচো দেখলে ভয় পান বুঝি? আমার মুখ থেকে ফস করে কথাটা বেরিয়ে গেল। এবং তাতেই বাজিমাত।
হ্যাঁ, ভয় পেয়েছিলাম! ঘনাদা অন্য জুতো জোড়াও খুলে তক্তপোশের ওপর পা মুড়ে বসলেন। আমরাও যে যেখানে পারলাম।
কিন্তু ওই ভয় পেয়েছিলামটুকু বলেই ঘনাদা চুপ। আবার একটু নাড়া দিতে হল সুতরাং, কেঁচো দেখে ভয়! কেঁচো খুঁড়তে গোখরো বেরিয়েছিল বুঝি?
না, গোখরো নয়, কিন্তু চেহারায় তারও দুশমন, লম্বায় পাক্কা আড়াই হাত।
আড়াই হাত কেঁচো! আমাদের কণ্ঠে সন্দিগ্ধ বিস্ময়, কেঁচো না কাছি?
কাছির মতোই মোটা, তবে কেঁচোই। মেগাসকোলাইডিস অ্যালিস! দেখেছিলাম অস্ট্রেলিয়ায়। তার জ্ঞাতি গোত্র অবশ্য অন্য জায়গাতেও আছে— আফ্রিকায়, দক্ষিণ আমেরিকায়, আমাদের দক্ষিণ ভারতেও। দক্ষিণ আমেরিকার কেঁচো-দৈত্যের নাম হল গ্নসাস্কোলেকস জাইগ্যানটিয়স আর…
থাক, থাক! আমরা সভয়ে বাধা দিলাম।
কিন্তু কিচিন্দের কেঁচো তো ওরকম দৈত্য-দানো কিছু নয়। শিবুই খোঁচা দিলে, নেহাত নিরীহ পুঁচকে। তাদের আবার ভয় কীসের?
ভয় নয়, ভক্তি। ঘনাদা যেন মন্ত্র পড়লেন গম্ভীর গলায়।
ভক্তি কেঁচোতে? আমরা হতভম্ব।
হ্যাঁ, কেঁচোতে ভক্তি!—কেঁচো না থাকলে পৃথিবী কবে মরুভূমি হয়ে যেত, জানো? জানো এক বিঘে ভালো জমিতে প্রায় দু লক্ষ কেঁচো থাকে? জানো মাটির নীচে আট থেকে দশ হাত গর্ত করে গিয়ে নীচের মাটি ওপরে তারা চালাচালি করে বলেই পৃথিবী এমন উর্বর? জানো গায়ের জোরে পঞ্চাশটা ভীমসেন তাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না? একটা কেঁচো তার চেয়ে ষাট গুণ ওজনের পাথর কুচি সরিয়ে ফেলে অনায়াসে—তা জানো…
আরও অনেক কিছু পাছে শিখে ফেলতে হয় সেই ভয়ে ঘনাদাকে তাড়াতাড়ি থামিয়ে দিয়ে বললাম, ভক্তি কি ওই সবের জন্য!
না, শুধু ওসবের জন্য নয়। ভক্তি—এ যুগের সপ্তমাশ্চর্য এক আবিষ্কার ও গবেষণা ওরা সাহায্য না করলে চিরকালের মতো হারিয়ে যেত বলে। ওরা না থাকলে পৃথিবীর এক অসামান্য বৈজ্ঞানিককে সে গবেষণা সম্পূর্ণ করবার সুযোগ দিতে পারতাম না। পৃথিবীর ঘড়ির কাঁটা উলটে এক বছর পিছনে ফিরে গিয়েও তাহলে কোনও লাভ হত না।
মাথাটা আমাদের সকলেরই তখন ঘুরছে। গৌরই তবু প্রথম একটু সুস্থির হয়ে মাথা গোলানো ধাঁধার একটা জটকেই ছাড়াবার চেষ্টায় ধরা গলায় জিজ্ঞাসা করলে, ঘড়ির কাঁটা উলটে এক বছর পিছনে ফিরে যাওয়ার কথা কী বললেন যেন?
ঘনাদা করুণাভরে আমাদের দিকে চেয়ে বললেন, হ্যাঁ, বললাম ১৯৫৩ থেকে ১৯৫২তে ফিরে যাওয়ার কথা।
সশরীরে? আমাদের চোখ সব ছানাবড়া।
হ্যাঁ, সশরীরে। ঘনাদা একটু অনুকম্পার হাসি হেসে শুরু করলেন, তখন নরফোক দ্বীপে ক-দিনের জন্য বেড়াতে গেছি। এ-দ্বীপটি অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ৯০০ মাইল পুবে আর নিউজিল্যান্ডের সাতশো মাইল উত্তরে। ছোট্ট দ্বীপ, কিন্তু যেমন সুন্দর তেমনই নির্জন। ট্রাম বাস কি ট্রেনের বালাই নেই। একটা আধটা মোেটরের আওয়াজ শুধু মাঝে মাঝে পাওয়া-যায় দ্বীপে মানুষই তো মাত্র হাজার খানেক, ত ওসব ঝামেলা থাকবে কোথা থেকে! ডিসেম্বর মাসের শেষাশেষি হবে। নরফোকের এক পুরোনো বাসিন্দার সঙ্গে গল্প করতে করতে আমার হোটেলের দিকে যাচ্ছিলাম। নরফোকে মানুষের বাস খুব বেশি দিনের নয়। বাউন্টি জাহাজের বিদ্রোহের কথা হয়তো পড়েছ, ছবি অন্তত দেখে থাকবে। সেই বাউন্টি জাহাজের নজন বিদ্রোহী ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে পিটকেয়ার্ন নামে একটি দ্বীপে গিয়ে বসবাস করে। তাদেরই বংশধরেরা আবার ১৮৫৬ সালে আসে এই নরফোক দ্বীপে বাস করতে। এই সব পুরোনো দিনের গল্প শুনতে শুনতে যাচ্ছি, এমন সময় রাস্তার একটি লোককে দেখে হঠাৎ চমকে উঠলাম। বেঁটে-খাটো শুকনো চেহারার এক বৃদ্ধ। আমাদের উলটো দিক থেকে এসে আমায় দেখে একটু থমকে দাঁড়িয়ে পড়েই আবার পাশ কাটিয়ে চলে যাবার চেষ্টা করলে। কিন্তু তা আর যেতে দিলাম না। হঠাৎ হাত বাড়িয়ে বৃদ্ধকে ধরে ফেলে বললাম, কে? মিস্টার জোয়াকিম না?
বৃদ্ধ কিন্তু আমার সামনে যেন ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। কাতরভাবে মাথা নেড়ে বললে, না না, আপনার ভুল হয়েছে। আমি জোয়াকিম নয়, আমার নাম হ্যারিস, নম্যান হ্যারিস?
নর্ম্যান হ্যারিস? একটু বিমুঢ় হয়েই বৃদ্ধকে ছেড়ে দিলাম। প্রায় পনেরো যোলো বছর আগের কথা বটে, কিন্তু এত বড় ভুল তবু কি হয়!
সেই মুহূর্তে আমার হোটেলের নতুন বন্ধু মি. সিডনি এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ায় তখনকার মতো ব্যাপারটা মনে চাপা পড়েই রইল।
মি. সিডনি অবশ্য এসেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন হেসে, ও বুড়োকে ধরেছিলেন কেন, মশাই?
লজ্জিতভাবে নিজের ভুলের কথাটা তাঁর কাছে স্বীকার করে প্রসঙ্গটা বদলে ফেলেছিলাম।
ব্যাপারটা মনের মধ্যে চাপা দিলেও সন্দেহ আমার যায়নি একেবারে।
সন্দেহ যে ভুল নয় সেই দিন সন্ধ্যার পরই তার কিছু প্রমাণ পাওয়া গেল।
