ব্যাপারটা বুঝিয়ে তিরিক্ষি মেজাজে শিবু বললে, সেই থেকে ঘনাদা এ শনিবারের ফাঁড়া কাটাবার ফিকির খুঁজছেন। আর সে ফিকির তোরাই জুগিয়ে দিলি নিজে থেকে!
শুধু তাই! ঘনাদার কাটানো ফাঁড়া যে এখন আমাদের ঘাড়ে! গৌর হতাশভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললে, নিজেদের প্যাঁচে নিজেরাই পড়ে যে এখন হিমসিম। এ প্যাঁচ কেটে বেরোই কী করে?
প্যাঁচ কেটে বেরুবার জন্য সবাই মিলে পরামর্শ করে চেষ্টার ত্রুটি কিছু রাখলাম না।
বুধবার বিকেলের আগে যে কিচিন্দের অস্তিত্ব ছিল না, বৃহস্পতিবার সকালে তাকে লগি বাওয়া শালতিতে নোংরা খালের রাস্তায় নিয়ে গিয়ে, হাঁটুভর কাদা প্যাচপেচে বাদার ধারে ফেলে যতখানি সম্ভব দুর্গম করে তুলি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। ঘনাদা নিজে থেকেই যাতে মত বদলান তার জন্য শিবুর কাল্পনিক জন্মস্থান যত বিশ্রী বিদঘুটে করে তুলি, ঘনাদার উৎসাহ তত যেন বেড়ে যায়।
ক্রোশ পাঁচেক কাদা ভেঙে যেতে হবে শুনে যেন তাঁর আনন্দ আর ধরে না।
বলেন, বলো কী হে! পাঁচ ক্রোশ কাদার রাস্তা? খুব মজা তো!
মজাটার জন্য আমরাও যেন উৎসুক, এরকম একটা ভাব দেখাতে হয়। সেই উৎফুল্ল মুখ নিয়েই বলি, শিবুর বাড়িটাও খুব মজার, জানেন ঘনাদা? আস্ত ঘর নাকি একটাও নেই।
তাই নাকি হে? ঘনাদা শিবুকেই প্রশ্ন করেন।
একটু আশার ফুলকি দেখে শিবু সজোরে হাওয়া দেয়। এক গাল হেসে বলে, আজ্ঞে তা সত্যি—নেই। যেটার ছাদ আছে তার দেয়াল নেই, আর দেয়াল যেটার খাড়া আছে তার ছাদ একেবারে হাঁ। আর বাড়িময় যা মজার জঙ্গল হয়েছে!
শিবু থামতেই গৌর উদ্বিগ্ন হবার ভান করে বলে, আপনার অসুবিধে হবে না। তো, ঘনাদা?
অসুবিধে! ঘনাদা যেন অপমানিত বোধ করেন, আমার অসুবিধে হবে ও বাড়িতে থাকতে! আরে ওই সব অসুবিধের মজা করতেই তো যাওয়া!
এর পর আর কী করা যায়! অগত্যা যথাসম্ভব সেঁতো হাসি মুখে ফুটিয়ে চলে আসি।
সেদিন বিকেলেই ঘনাদার সংকল্পের গড় ভাঙবার চেষ্টায় নতুন দিক দিয়ে আক্রমণ চালাই।
শিবু কী সব খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করেছে শুনেছেন তো, ঘনাদা?
ঘনাদা ঔৎসুক্য দেখান শিবুর দিকে চেয়ে, কী খাওয়াবে হে?
যত জবর বর্ম-ই এঁটে থাকুন, তার এই একটা জায়গায় ফুটো থাকতে বাধ্য বুঝে, শিবু সেই ফুটো লক্ষ্য করেই মোক্ষম তীর চালায়। যেন খুশিতে ডগমগ হয়ে বলে, সে যা খাওয়াব, দেখবেন। খুব নতুন ধরনের খাওয়া। গাঁয়ে আর কিছু না পাওয়া যাক, চাল ভাজা তো পাওয়া যাবেই, আর তার সঙ্গে ধরুন—ধরুন, বেগুন পোড়া। বেগুনগুলো আমাদের গাঁয়ে কেমন শুটকো পোকা খেকো বটে! কিন্তু তাতে কী আর হবে! আর বেগুন যদি না জোটে তো, কী বলে, আঁদাড়পাঁদাড় খুঁজে দুটো কচু কি আর পাব না!
শিবু যতক্ষণ ধনুর্বিদ্যা চালায়, আমরা একেবারে রুদ্ধ নিঃশ্বাসে ঘনাদার দিকে চেয়ে থাকি। বর্ম ভেদ করে বাণ একেবারে মর্মে পৌঁছে ঘনাদাকে কাবু করে কিনা দেখতে!
কিন্তু বৃথা আশা।
যেন আর তর সইছেনা এমনভাবে ঘনাদা বলেন, বলো কী হে! এখুনি যে যেতে ইচ্ছে করছে!
শুক্রবার সকাল অবধি সব রকম চেষ্টা করে বিফল হয়ে শেষ পর্যন্ত মরিয়া হয়ে উঠলাম।
ঘনাদাকে যখন টলানো যাবে না, আর নিজেদের শনিবারের ভোজেরও যখন দফা রফা, তখন কিচিন্দিতেই যাব ঠিক করলাম ঘনাদাকে নিয়ে। কিচিন্দে কোন চুলোয় তা না জানি, কিচিন্দে নামের সঙ্গে মানানসই অতি বিদঘুটে একটা রাস্তায় বেরিয়ে পড়া তো যাবে ঘনাদাকে নাকাল করতে। নাকাল অবশ্য নিজেরাও হব। কিন্তু নিজের নাক কেটেও পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে তখন আমরা প্রস্তুত।
শনিবার সকালে বেরিয়ে পড়ার মতো একটা দিক তখন সলাপরামর্শ করে ঠিক করে ফেলেছি। বেরিয়ে তো পড়া যাবে, তারপর যা হয় হোক।
ঘনাদাকে সকালে উঠেই তাড়া দেব ঠিক করেছিলাম, কিন্তু সেখানেও আমাদের হার।
ঘনাদাকে তৈরি হতে বলবার জন্য ওপরে উঠে দেখি, তিনি একেবারে ধড়াচুড়ো পরেই ঘর থেকে বেরুচ্ছেন। তাঁর এই এত সকালে তৈরি হওয়ায় যত না আমরা তাজ্জব, ধড়াচুড়ো দেখেও তেমনই।
ঘনাদার মাথায় শোলার টুপি, গায়ে খাকি শার্ট-প্যান্ট, পায়ে জুতোর ওপর গামবুট, আর হাতে হুইল ছিপ সমেত মাছ ধরার ঝুলি।
কী ব্যাপার, ঘনাদা! বেশ খানিক হাঁ হয়ে থাকবার পর আমাদের মুখে কথা সরল।
কী ব্যাপার, ভুলে গেছ নাকি! বেরুতে হবে না? তোমরা এখনও তৈরিই হওনি? ঘনাদা ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।
হ্যাঁ, তৈরি এখুনি হচ্ছি। আমরা লজ্জিত হয়ে বলি, কিন্তু এসব কী করেছে?
কেন? ঘনাদা অবাক, এই পোশাকই তো দরকার কিচিন্দের মতো গাঁয়ে যেতে, কাদা ভাঙতে হবে বলে গামবুটটা নিলাম।
কিন্তু ওই ছিপ-টিপ? আমাদের বিস্মিত প্রশ্ন।
বাঃ, মাছ ধরতে হবে না। পুকুর আছে তো? ঘনাদার প্রশ্নটা শিবুর উদ্দেশে।
হ্যাঁ, পুকুর থাকবে না কেন? শিবু একটু থতমত খেয়ে বললে, কিন্তু সেখানে ও-হুইল ছিপ তো বেকার!
কেন? ঘনাদা বেশ অসন্তুষ্ট।
মানে, শিবু আমতা আমতা করে একটা জুতসই জবাব খাড়া করবার চেষ্টা করলে, মানে, পুকুর মানে সব ডোবা কি না। সেখানে হাতছিপে বড় জোর কেঁচো দিয়ে পুঁটি-টুটি ধরা যায়?
কী বললে? ঘনাদার এ একেবারে অন্য মূর্তি। যেন দিনের বেলায় ভূত দেখছেন এমন ভাবখানা!
এক মুহূর্তে কী হয়ে গেল বুঝতে না পেরে শিবুও দিশাহারা হয়ে ভয়ে ভয়ে কবুল করলে, বললাম, সেখানকার ডোবায় কেঁচো দিয়ে বড় জোর পুঁটি ধরা যায়!
