শনিবারের এই ভোজনবিলাস ছেড়ে ঘনাদা এক কথায়—ধাড়ধাড়া গোবিন্দপুরকেও হার মানানো কিস্কিন্ধ্যেরও বটতলা সংস্করণ কিচিন্দে যেতে রাজি হবেন, এ আমাদের স্বপ্নাতীত।
ঘনাদাকে একটু জ্বালাবার মতলবেই বুধবার বিকেলে কথাটা তুলেছিলাম।
ঘনাদা তখন তাঁর মৌরসি আরামকেদারায় বসে শিশিরের চতুঃসহ সপ্তশত সপ্তবিংশতিতম সিগারেটটি ধার নিয়ে সবে ধরাচ্ছেন।
শিবু তখনও ফেরেনি। আমি, গৌর আর শিশির মিলেই ঘনাদাকে সঙ্গ দিচ্ছি। আমাদের ফন্দিমতো শিশিরই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাটা পাড়লে, এ শনিবারের খ্যাঁটটা কিন্তু ফসকাল!
কেন? ঘনাদা সিগারেটের সুখটানটা মাঝপথেই থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। ঘনাদার গলার স্বরটা বিস্ময়ে আশঙ্কায় উদ্বেগে ঠিক আশানুরূপ তীক্ষ না শোনালেও, মনে হল ওষুধ ধরেছে।
গৌরই জবাবটা দিলে যেন হতাশভাবে, আর বলেন কেন? শিবুর সঙ্গে তার গাঁয়ে যেতে হবে। গাঁ যেন আমরা কেউ দেখিনি। আর যেতে হবে কিনা শনিবার এখানকার এই খাওয়া ফেলে! কী অন্যায় আবদার বলুন তো!
ঘনাদার মুখে কথা নেই। সিগারেটটাও না। সেটা আঙুলের ফাঁকে পুড়ছে।
লক্ষণ সব ভালই বলতে হবে।
আমি মনসায় ধুনোর গন্ধ দিলাম এবার, আহা, অত চটছ কেন? শিবুর যে ওই গাঁয়েই জন্ম। এই শনিবারই আবার ওর জন্মদিন। আমাদের সবাইকে নিজের গাঁয়ে নিয়ে গিয়ে তাই একটু হই-হুল্লোড় করতে চায়।
একটু থেমে ঘনাদার মুখের ওপর চট করে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ব্রহ্মাস্ত্রটি ছাড়লাম, ঘনাদাকেও তো নিয়ে যাবে বলেছে!
ডিনামাইটের সলতেয় দূর থেকে আগুন দিয়ে এঞ্জিনিয়াররা যেমন দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করে, আমাদের তখন সেই অবস্থা।
এই বিস্ফোরণ হল বলে! শনিবারের যজ্ঞির খাওয়ায় ফাঁকি দিয়ে ঘনাদাকে কিনা নিয়ে যেতে চায় কোথাকার অখদ্দে পাড়াগাঁয়ে! এত বড় আস্পর্ধায় ঘনাদা কীভাবে ফেটে পড়েন তাই দেখবার জন্যেই আমরা উদগ্রীব। শিবুর গাঁয়ে কেন তাঁর যাওয়া অসম্ভব তা বোঝাতে গিয়ে, চাই কি ফেটে-পড়া রাগের বারুদ থেকে একটা-আধটা গল্পের ফুলঝুরিও ঝরে পড়তে পারে।
কিন্তু কোথায় বিস্ফোরণ! ফটফটাসের বদলে এ যে একেবারে শুধু ফুস!
ঘনাদা আমাদের একেবারে বসিয়ে দিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, বেশ, যাব।
অ্যাঁ?
আমাদের চক্ষু সব বিস্ফারিত, মুখের হাঁ বোজ না। আপনা থেকে বেরিয়ে আসা অ্যার সঙ্গে যাবেন তাহলে?বলে আনন্দোচ্ছাস জুড়ে দেবার চেষ্টা করলাম বটে, কিন্তু মাঝখানে বেশ খানিকটা ফাঁক থেকে গেল, সুরেও মিলল না।
গ্রামটা কোথায়?ঘনাদা আমাদের দুরবস্থা লক্ষ না করেই বোধহয় প্রশ্ন করলেন নিজে থেকে।
গ্রামটা? আমি চাইলাম গৌরের মুখের দিকে।
ওঃ, গ্রামটা! গৌর চাইল শিশিরের দিকে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, গ্রামটা! ওই যে, বললা না হে গ্রামটার নাম? শিশির নিজেকে বাঁচাতে আমাকেই বাঘের মুখে এগিয়ে দিলো।
ওঃ, নাম জিজ্ঞেস করছেন? আমি একটা ঢোঁক গিললাম, নাম হল গিয়ে— আমার দুটো ঢোঁক গেলা হল—ওই যে…
উচ্চারণ করা শক্ত বুঝি? ঘনাদার সরল কৌতূহল।
না, না উচ্চারণ শক্ত নয়! আমি নাম হাতড়াবার জন্যে সময় নেবার ফিকির খুঁজলাম, বড় বিদঘুটে নাম কিনা! শিবুর জন্মস্থান তো-বিদঘুটে না হয়ে কি মোলায়েম নাম হতে পারে! চট করে তাই মনে আসতে চায় না।
শিবুর মনে আছে নিশ্চয়! ঘনাদার গলায় যতখানি সম্ভব মধুর সারল্য।
বাঃ, কী যে বলেন! আমরা ক্ষুণ্ণ হলাম যেন একটু, নিজের জন্মস্থানের নাম মনে থাকবে না। আমাদেরও তো মনে ছিল, এই মাত্র ভুলে গেলাম! এই—এই…
মধ্যমগ্রাম! বলে ফেলল শিশির।
মধ্যমগ্রাম? ঘনাদাও উচ্চারণ করলেন চোখ দুটো কেমন একটু সন্দেহে কুঁচকে।
দূর! মধ্যমগ্রাম কী বলছিস! গৌর তাড়াতাড়ি সামলাল।
হ্যাঁ, মধ্যমগ্রাম কী? ওটা কি একটা বিদঘুটে নাম হল? আমিও শিশিরের ওপর খাপ্পা হলাম। তারপর হঠাৎ বলে ফেললাম, হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে—কিচিন্দে!
ভাগ্যিস সামনের টেবিলের খবরের কাগজটার দিকে চোখ পড়েছিল। সেখানে বড় বড় হরফে ইংরাজিতে একটা বিজ্ঞাপন—কিচেন ইউটেনসিলস।
তাহলে মধ্যমগ্রাম নয়, কিচিন্দে? ঘনাদার প্রশ্নটার সুরটা যেন কেমন!
হ্যাঁ, হ্যাঁ, কিচিন্দে। আমরা সমস্বরে সায় দিলাম।
তা নামটা বেশ বিদঘুটে বটে! আচ্ছা, কিচিন্দেই যাওয়া যাবে। যাওয়া ঠিক তো? ঘনাদা মনে হল দস্তুরমতো উদগ্রীব।
ঠিক ছাড়া কী? নিশ্চয় ঠিক! বলে ল্যাজেগোবরে হয়ে সেখান থেকে। কোনওরকমে বেরিয়ে পড়ে বাঁচলাম।
বাঁচলাম তো তখনকার মতো। তারপর উপায়?
নিজেদের ফাঁদেই পড়েছি স্বীকার করে হার মানতেও মান যায়, অথচ ঘনাদাকে নিয়ে যাবার মতো কিচিন্দে গ্রামই বা পাই কোথায়?
শিবু ফিরে আসতেই গোপন মন্ত্রণাসভায় ডেকে তাকে, খবরের কাগজের ভাষায়, পরিস্থিতিটা জানালাম।
শুনেই তো সে খাপ্পা। আহাম্মক সব, করেছিস কী! সব মাটি করে দিলি!
মাটি করে দিলাম! কী? আমরা বিমূঢ়।
আরে, সব বুদ্ধির গন্ধমাদন! শিকু আমাদের মধুর সম্ভাষণ করে বললে, ঘনাদা কি সাধে,—ওই—তোদের কী বললি, কিচিন্দে যেতে রাজি হয়েছেন। শনিবার যে ওঁকে রামজব্দ করবার ব্যবস্থা করেছিলাম। যা প্যাঁচে ফেলেছিলাম আর বেরুবাব রাস্তা ছিল না। শেষে নিজেরাই প্যাঁচ কেটে পালাবার পথ করে দিলি!
আমাদের প্রতি জ্বালা-ধরানো আরও কয়েকটি বাছা বাছা বিশেষণ প্রয়োগ করে শিবু তারপর ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলে। শনিবারের ভোজের ব্যাপারে ঘনাদার মাতব্বরি চালবাজি ফাঁসিয়ে দেবার সে একটা ভাল ফন্দি করেছিল। ঘনাদা যেরকম ভাবগতিক দেখান তাতে মনে হয় গোটা হগ সাহেবের বাজারটাই তাঁর জমিদারি। বিশেষ করে খাসি মটনের কারবারি নুরুদ্দিন তো তাঁর কথায় ওঠে বসে। শিবু সেই নুরুদ্দিনের নাম নিয়েই ঘনাদাকে কাত করবার ব্যবস্থা করেছিল। ঘনাদাকে এসে বলেছিল যে নুরুদ্দিন তো ঘনাদার নাম করতে অজ্ঞান! বাজারে গেলেই তাঁর কথায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে। প্রায়ই সে বলে, এসব খাসি মটন কি ছার, দাসবাবু একবার হুকুম দিলে সে একেবারে খাস তুরুক মুলুকের অ্যাঙ্গোরা খাসির মাংস ভেট দিয়ে আসতে পারে। শুনে ঘনাদা, এ আর এমন কী, ভাব দেখিয়ে একটু ফুলে ফেঁপে উঠতেই শিবু কোপটি বসিয়েছিল। সামনের শনিবারটাই অ্যাঙ্গোরা খাসির মাংসের জন্য নুরুদ্দিনকে একটু হুকুম জানাবার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিল সবিনয়ে। বলেছিল, আপনার শুধু একটু লে আও বলবার ওয়াস্তা। বলে পাঠান না ঘনাদা। অ্যাঙ্গোরা খাসির মাংস খেয়ে জীবন ধন্য করি। ঘনাদা আর তখন পিছু হটবার পথ পাননি। বেকায়দায় পড়ে নুরুদ্দিনকে খবর পাঠাতে রাজি হয়েছিলেন।
