সেইখানেই তাকে ফেলে রেখে জিপে গিয়ে একটা দড়ি নিয়ে এলাম। হাত আর পা দুটো তাই দিয়ে বাঁধতে বাঁধতে বললাম, এটা বকশিশের ফাউ। জোহানেসবার্গে যা দিয়েছিলেন কড়ায় গণ্ডায় শোধ না করলে চিরকাল ঋণী থাকব যে! রাত্তিরটা এখানেই কাটান। কম্বল ঢাকা দিয়ে যাচ্ছি। সকালে উঠেই কীটমানসুফ রওনা হওয়া যাবে। কী বলেন?
জবাবে ফিংক তার আফ্রিকানস ভাষায় কুৎসিত একটা গালাগাল দিলে শুধু। জিপ থেকে আর একটা কম্বল নিয়ে বেশ একটু দূরে একটা লুকোনো জায়গায় গিয়ে শুলাম। কিছুক্ষণ অন্তত জেগে থাকবার ইচ্ছে থাকলেও কদিনের ধকলে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না।
সকালে উঠে যা ভেবে রেখেছিলাম তাই হয়েছে দেখলাম। ফিকে রাত্রেই জিপ নিয়ে পালিয়েছে।
ফিংক পালাবে বলেই ভেবে রেখেছিলেন? শিশিরের হতভম্ব প্রশ্ন।
হ্যাঁ, সেই জন্যই বাঁধন এমন দিয়েছিলাম যাতে নিজেই ছিড়তে পারে?
ফিংককে তা হলে সেই ভেড়ার ছানা দুটো নিয়েই পালাতে দিলেন? আমার গলায় যেন আওয়াজই বার হতে হতে চায় না।
হ্যাঁ, তা-ই দিলাম, কিন্তু পালাবে আর কোথায়। তার কম্পাস আগেই বিগডে জিপটা একটু ঘুরিয়ে রেখে দিয়েছি। মেঘলা রাতে আকাশের তারাও দেখতে পাবে না দিক ঠিক করতে। জিপ নিয়ে নাক বরাবর সোজা গিয়ে উঠবে ওই কীটমানসুফ-এই। সেখানে তার জন্য অভ্যর্থনাসভা তৈরি। বমাল সমেত গ্রেফতার আর হাজত। নিজে নিয়ে গিয়ে ধরিয়ে দেবার ঝামেলাটা বাঁচালাম তাকে পালাবার সুযোগ দিয়ে।
হামি কী বলবে বড়াবাবু! নিরুপায় বনোয়ারির কাকুতি আবার শোনা গেল।
দেখো তো হে, কে আবার এসেছে জ্বালাতন করতে! ঘনাদা তাচ্ছিল্যভরে হুকুম করলেন আমাদের মুখের চেহারাগুলো পড়ে নিয়ে।
শিশির তা-ই দেখতেই গেল।
মিনিট পনেরো বাদে যখন ফিরে এল তখন ঘনাদা তার সিগারেটের টিনটা ভুলে পকেটে করে তাঁর টঙের ঘরে উঠে গেছেন।
ব্যাপার কী, শিশির? আমরা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
বিশেষ কিছু নয়। শিশির নাকটা একটু ওপরে তুলে বাতাসটা শুকতে শুকতে বললে, ওই!
ওপর থেকে তখন পয়লা নম্বরের অম্বুরি তামাকের গন্ধ ভেসে আসছে।
ওই মানে? আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ওই তামাকের গন্ধ?
হ্যাঁ! বড় রাস্তার তামাকের দোকান থেকে ঘনাদা সবচেয়ে সরেস অম্বুরি তামাক কবে বুঝি কিনে এনেছিলেন দামটা বাকি রেখে। তারপর ওধার আর মাড়াননি। আজ দূর থেকে তাঁকে দেখতে পেয়ে দোকানের মালিক পিছু পিছু এসেছে তাগাদা করতে। নীচে সে-ই গোলমাল করছিল।
তা তুমি কী করলে? আমাদের ব্যাকুল প্রশ্ন।
কী আর করব! তাকে খুশি করেই বিদেয় করতে হল। এ সব তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে ঘনাদার শান্তিভঙ্গ তো আর করা যায় না। গৌরের রেনকোট যখন গেছে তখনই জানি ওর হিংসেতে একটা কিছু লোকসানের ফাঁড়া আমার আছেই।
গৌরের মুখে এতক্ষণে সত্যিই হাসি ফুটল।
ঘনাদাকে ভোট দিন (গল্পগ্রন্থ)
কেঁচো
ঘনাদা এক কথায় রাজি!
আমরা সবাই তো একেবারে যাকে বলে পপাত ধরণীতলে!
যে ঘনাদাকে নেহাত তাঁর নিজের মর্জি ছাড়া মেস থেকে এক পা বার করা যায় , শনিবার দিনটা অন্তত পুলিশের হুলিয়া দেখিয়েও যাঁকে মেস ছাড়া করা প্রায় অসম্ভব, তিনি বলা মাত্র শনিবার ভোরে আমাদের সঙ্গে শিবুর জন্মস্থান এক অজ পাড়াগাঁয়ে যেতে রাজি হয়ে গেলেন!
শিবুর জন্মস্থান যেখানেই হোক, কোনও অজ পাড়াগাঁয়ে নয়। কোথায় যে তার জন্মস্থান তা অবশ্য তার নিজেরও বোধহয় জানা নেই—তবু ঘনাদাকে জব্দ করার ফিকিরেই ভেবেচিন্তে কিচিন্দে বলে একটা গ্রামের নাম উদ্ভাবন করে, আমরা কলকাতা থেকে মাইল ত্রিশেক দূরে আমাদের কাল্পনিক মানচিত্রে বসিয়েছিলাম। গ্রামটি ঘনাদার খাতিরে সুগমও করেছিলাম যথেষ্ট। ট্রেন বা বাস কিছুই সেখানে যায় না। বর্ষাকালে শালতি করে কোনওরকমে একটা জনমানবহীন বাদায় গিয়ে নেমে ক্রোশ পাঁচেক হাঁটুভর কাদা ভেঙে সেখানে পৌঁছতে হয়।
কিচিন্দে গ্রামের এসব বাহার নিজেদের মান বাঁচাতেই জুড়তে হয়েছিল অবশ্য পরে।
নিজেদের ফাঁদেই নিজেরা যে অমন করে পড়ব আগে কি জানি!
শনিবার রাত্রে আমাদের মেসে বেশ জবর গোছের খ্যাট হয়। বাপি দত্ত আমাদের মেস ছেড়ে গেছে বটে, কিন্তু তার মতো মফসলি আরও দু-চারজন আছে। তাদের খাতিরেই রবিবারের বদলে শনিবার রাত্রেই এই ভূরিভোজের ব্যবস্থা।
ঘনাদা শনিবার দিনটায় তাই মেস থেকে নড়বার নাম করেন না। শুধু নট নড়ন চড়ন হয়ে খ্যাঁটের যাকে বলে সিংহভাগ নিলে বলবার কিছু ছিল না, কিন্তু তাঁর আবার উপরি আবদার বায়নার অন্ত থাকে না সেদিন। সকালে উঠেই হইচই লাগিয়ে তো দেনই কই হে, বাজারে যাচ্ছ আজ কে! বলি মেনুটা কিছু ঠিক করেছ নাকি! তারপর কোনও দিন ফরমাশ হয়: আজ একটু ভেটকি মাছের ক্রোকেট করবে তো হে। দেখো আবার যেখান সেখান থেকে ভেটকি কিনো না! কোনওদিন বা অনুযোগ দিয়ে শুরু হয়—ওহে আগেরবারে বিরিয়ানিটা তেমন জুত হয়নি। মটনটাই ছিল শুটকো! হাতের চর্বি ধুতে একটা বারসোপ না খরচ হয়ে গেলে আবার মটন! মটন একেবারে হগ সাহেবের বাজারে নুরুদ্দিনের দোকানে কিনবে, বুঝেছ। কাবলি ছোলার খোসা না ছাড়িয়ে নুরুদ্দিন ভেড়াকে খাওয়ায় না।
ফি শনিবার ঘনাদার এরকম নতুন নতুন খাবারের চিন্তার ঢেউ খেলে মাথায়।
মনে মনে হাসি বা গজরাই, তাঁর আবদার শেষ পর্যন্ত রাখতেই হয়।
