কিন্তু সেখানে পৌঁছোনো তো দরকার! আমি যেন ফিংকের জন্যই ভাবিত, কম সময় তো নয়, দিন দশেক। দিন দশেক জল না খেয়ে কি আপনার চলবে?
জল না খাব কেন? ফিংক হায়নার মতো হেসে উঠল, এখনও কম-সে কম এক মাসের জল আমার গাড়িতে মজুদ।
না, বোয়ানা! অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানালাম, ভেড়ার ছানা ভরতে গিয়ে দেখি, সব জলের জায়গাগুলোই খালি। হয় ফুটো হয়ে পড়ে গেছে, নয় কেউ ফেলে দিয়েছে।
তুই! তুই জল যদি ফেলে থাকিস, ফিংক রিভলভার হাতে লাফিয়ে উঠল খ্যাপার মতোই, তা হলে একখুনি তোকে আমি…
গুলি করবেন। আমি ফিংসের কথাটাই পূরণ করে দিলাম, কিন্তু তা হলে বিপদ তো আরও বাড়বে, বোয়ানা। এই কালাহারিতে জলের সন্ধান যদি কেউ দিতে পারে তো আমি। জলের লুকোনো ঝরনা যদি না-ও মেলে তা হলেও এ-মরুভূমিতে যা দিয়ে তেষ্টা মেটানো যায় সেই বুনো তরমুজ সোমা কোথায় পাওয়া যায় আমিই আপনাকে দেখাতে পারি। আমায় গুলি করলে আপনার ফেরবার কোনও আশাই তো নেই।
রাগে দাঁত কিড়মিড় করলেও অবস্থাটা বুঝে নিজেকে সামলে ফিংক বললে, বেশ, গুলি তোকে করব না। তা হলে কী তুই চাস?
আর কী চাইব, বোয়ানা, একটু বকশিশ চাই!
কী বকশিশ? ফিংক উদার হয়ে উঠল, আমায় রোডেশিয়ায় ভালয় ভালয় পৌঁছে। দিতে পারলে তোকে এত টাকা দেব যে সারা জীবন আর তোকে খেটে খেতে হবে না। নিজের মুল্লুকে গিয়ে মোড়ল হয়ে বসবি।
আপনি মহানুভব! যেন কৃতার্থ হয়ে বললাম, কিন্তু আপনার বড় ভুলো মন, বোয়ানা। ওখানে পৌঁছে হয়তো হাত চুলকে উঠে গুলি করে বসবেন। আমি তাই বকশিশটা চাই নগদ।
কী বকশিশ, বল! ফিংক একেবারে কল্পতরু।
এমন কিছু নয় আমি একটু যেন লজ্জা লজ্জা ভাব করে নিবেদন করলাম, জোহাম্নেসবার্গে আমাকে যা দিয়ে ধন্য করে ছিলেন, তা-ই শুধু আপনাকে ফেরত দেবার হুকুম।
কী দিয়েছিলাম তোকে সেখানে? ফিংক বেশ একটু ভ্যাবাচাকা!
শুধু গালে একটা চড়, বোয়ানা! আমার গলা মিছরির মতো।
ফিংক যেরকম তিড়বিড়িয়ে উঠল তাতে রিভলভারটা বেকায়দাতেই ছুটে যেতে পারত। উট কাঁটা গাছের একটা জ্বলন্ত ডাল তার দিকে ছুঁড়ে আগেই তাই আমি একটু সরে গেছি। সেখান থেকে শোয়াঝাঁপ দিয়ে তার পা দুটো ধরে মাটিতে তাকে আছড়ে ফেলে রিভলভারটা কেড়ে নিলাম। তারপর বাঁ হাতে জামার কলার ধরে তাকে উঠিয়ে বসিয়ে যেন লজ্জিত হয়ে বললাম, একটা বড় ভুল হয়ে গেছে, বোয়ানা, একটা নয় দুটো চড়ই দুগালে আপনার দিতে হবে।
উট কাঁটার আগুন তখন ফিংকের চোখেই যেন জ্বলছে। শুধু আমার হাতের রিভলভারটার দিকে চেয়ে সে নাক দিয়ে এঞ্জিনের স্টিম ছাড়তে ছাড়তে চুপ করে রইল।
বললাম, একটা চড় দিতে হবে, বোয়ানা, যারা আপনার কাছে জন্তু-জানোয়ারের অধম এ-দেশের সেই কালো মানুষের হয়ে, আর একটা আমার নিজের জন্য।
তুই! তুই এ-দেশের লোক নয়! ফিংক সাপের মতো হিসহিসিয়ে উঠল।
না, বোয়ানা। আমার দেশের নাম মানুষের দুনিয়া। আপনার দক্ষিণ আফ্রিকা তার মধ্যে নেই।
চাবুকটা নিরুপায় হয়ে হজম করে ফিংক বললে, তা হলে তুই একাজে এসেছিলি কেন?
ওই আপনার অদ্ভুত বিজ্ঞাপনের টানে, বোয়ানা। একটা কিছু শয়তানি প্যাঁচ এর মধ্যে আছে সন্দেহ করে।
কিন্তু কালাহারির মরু তুই চিনলি কী করে? বিনা জলে দশ দিনের পথ গেলি-এলি কী করে? ভেড়ার ছানাও কেমন করে আনলি? ভয়-ভাবনা রাগের চেয়ে ফিংকের কৌতূহল তখন বেশি।
বকশিশ নেওয়া যখন পালিয়ে যাচ্ছে না, আর তা নেবার পর কানে শোনবার অবস্থা আপনার যখন না-ও থাকতে পারে, তখন প্রশ্নগুলোর জবাবই আগে আপনাকে দিয়ে নিই। এই কালাহারি মরু আমার কাছে নতুন নয়, বোয়ানা। এখানকার আদিবাসী হোটেনটটদের খোঁজ নেবার জন্য আগেও কবার এসেছি…
হঠাৎ গৌরের কাশিটা বড় বেয়াড়া হয়ে উঠলেও দাদা আজ আর ঐক্ষেপ না করে বলে চললেন, জল সঙ্গে না থাকলেও এ অঞ্চলের গোপন সব ঝরনা আমার জানা, আর তা-ও যেখানে নেই সেখানে যার কথা আগে বলেছি সেই সোমা অর্থাৎ বুনো তরমুজ খুঁজে বার করেই কাজ চালিয়েছি। ভেড়ার ছানা অবশ্য আমাকে চুরি করতে হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকার সব ধলাই আপনার মতো নয়। মানুষের রক্ত যাদের শরীরে বয় এমন দু-চারজনও আছে। কীটমানসুফ-এ এরকম একজনের সঙ্গে আমার একটু দোস্তি আছে। টাঙ্গানাইকায় একবার শিকারে গিয়ে আলাপ। তার ধারণা, এক খ্যাপা হাতির আক্রমণ থেকে তাকে আমি বাঁচিয়েছি। সেই বন্ধুর কাছেই আপনার কথা বলে কদিনের জন্য দুটো ভেড়ার ছানা ধার করে এনেছি। ইচ্ছে আছে কালই আপনার জিপ নিয়ে রওনা হব ফিরিয়ে দেবার জন্য।
ফিরিয়ে দেবে আগেই ঠিক করে রেখেছিলে! ফিংকের উন্নতি শুধু তুই থেকে তুমিতে। গলায় নইলে বিস্ময়ের সঙ্গে তেমনই পারলে ছিঁড়ে ফেলা আক্রোশের জ্বালা।
হ্যাঁ, বোয়ানা, আগেই ঠিক করেছিলাম। নইলে সত্যিই চুরি করে আনতে তো পারি না। কিন্তু আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। মেঘলা রাত। ঠাণ্ডা বাড়ছে। বকশিশটা নেওয়া এবার সেরে ফেলি।
নিজের হাতের দিকে চেয়ে একটু থেমে আবার বললাম, হাতে রিভলভারটা থাকলে আবার জুত হয় না।
রিভলভারটা ছুঁড়ে ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই ফিংক বুনো মোষের মতো আমার ওপর লাফিয়ে পড়ল।
তারপর প্রায় উটকাঁটার আগুনের ওপর পড়ল সচাপ্টে।
ডান গালের চড়টা একটু জোরেই হয়েছিল। তাড়াতাড়ি সেখান থেকে তাকে তুলে বাঁ গালে একটু আস্তেই মারলাম। শতরঞ্জির ওপর খাবার প্লেটগুলোর কয়েকটা ভাঙল।
