তা বলে চুনি-পান্নার খনির কাছে ভেড়া! ঘনাদার কথার মাঝখানে শিবুর মুখ ফসকেই বুঝি বেরিয়ে গেল।
হ্যাঁ, খনিও যার কাছে লাগে না এমন ভেড়া। ঘনাদা ব্যাখ্যা করলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ আর দামি ভেড়া হল পারস্যের। কারাকুল ভেড়া তার চেয়ে কম যায় না। একটা ভেড়ার দামই অন্তত পনেরো হাজার টাকা। কিন্তু সে ভেড়া বিক্রি হয় না। একজোড়া ভেড়ার একপাল হয়ে উঠতে ক-টা বছর আর লাগে! কারাকুল ভেড়ার ছানার পশমি ছাল কিনতে দুনিয়ার শৌখিন ধনকুবেররা পয়সার পরোয়া করে না। একশো বছরেরও আগে পারস্য থেকেই সবচেয়ে সরেস ক-জোড়া ভেড়া কালাহারি মরুর সীমান্তে আমদানি করা হয়। পালকদের যত্নে আর চেষ্টায় সেই ভেড়ার বংশ আজ পারস্যের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। এ ভেড়ার জাতের ওপর লোভ অনেকের। কিন্তু আইন করে কারাকুল ভেড়া চালান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মালিকরা মূর্তিমান যম হয়ে তাদের ভেড়ার পাল পাহারা দেয়। দেবে না-ই বা কেন? দুটো ভেড়া সেখান থেকে সরাতে পারলেই কাম ফতে। ফিংক সেই শয়তানি মতলব নিয়েই এই কালাহারি মরুর বিপদ অগ্রাহ্য করে এখানে এসেছে। আসল কাজটা অবশ্য আমার মতো কাউকে দিয়েই হাসিল না করালে তার নয়। ছায়ার মতো নিঃশব্দে লুকিয়ে সে-মুল্লকের মজবুত তারের বেড়া দিয়ে গলে যাবার জন্য পাতলা ছিপছিপে হওয়া চাই। মরুভূমির দিকটাতেই তেমন ভয়ের কিছু নেই বলে পাহারা একটু আলগা। কিন্তু সেখান দিয়ে ঢোকা তো যার-তার কর্ম নয়। জল আর খাবার দুই-এর কিছুই অন্তত পাঁচদিনের পথে মিলবে না। সেসব লটবহর সঙ্গে বয়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। এমন কাউকে তাই চাই উটের মতো জল ছাড়াই অন্তত বেশ কিছুদিন যে টিকে থাকতে পারে। ফিংক এই সব ভেবেই ওরকম বিজ্ঞাপন দিয়েছিল।
আমায় এবার সে সোজা হুকুম দিলে, যেমন করে হোক কীটমানসুফ-এ গিয়ে ভেড়ার ছানার জোড়া চুরি করে আনতে।
যেন নিরুপায় হয়ে বললাম, কিছু খাবার জল তা হলে সঙ্গে দিন।
শুনেই ফিংক খাপপা—আরও কিছু চাই না? এই জিপ গাড়িটাও? সেই জন্যই সব নিয়ে এসেছি যে! হতভাগা কালা ছুঁচো। যেমন আছিস ঠিক তেমনিভাবে একখুনি রওনা হবি। তোর না একবার পূর্ণিমা আর একবার অমাবস্যায় জল খেলেই চলে! আমায় ধাক্কা দিয়েছিলি তা হলে?
ধাপ্পা কেন দেব, বোয়ানা! কাকুতি করে বললাম, কিন্তু একাজ হাসিল করতে পুরো চাঁদ থেকে পুরো আঁধারের বেশিও তো লাগতে পারে! আপনার তো অনেক আছে, শুধু একটা জলের বোতল যদি দিতেন।
একটি ফোঁটাও না! ফিংক গর্জে উঠল, তোর যদি বেশি দিন লাগে তো আমি এখানে আঙুল চুষব নাকি! তুই ওখানে গুলি খেয়ে মরলে আমায় ফিরে যেতে হবে না! তবে ওদিক দিয়ে পালাবার মতলব যদি করে থাকি তা হলে মরেছিস জানবি। এখানে আসার আগে আশেপাশে সব রাজ্যে তোর ওই সঁটকো চেহারার বর্ণনা দিয়ে খবর পাঠিয়ে দিয়েছি। খবর পাঠিয়েছি আমার টাকা চুরি করে পালিয়েছিস বলে। পালালে ধরা তুই পড়বিই। আর পড়লেই অন্তত সাতটি বছর জেলের ঘানি টানবি। বেঁচে থাকলে তাই তোকে ফিরতেই হবে এখানে।
ফিংক যে কতবড় শয়তান আগে বুঝিনি এমন নয়। তার আসল চেহারাটা এবার আরও একটু স্পষ্ট হল মাত্র।
ঘনাদা দম নেবার জন্য একটু থামতেই আবার আমাদের মূর্তিমান বনোয়ারি দরজায় এসে খাড়া। ভয়ে ভয়ে জানালে—
নীচে উ বাবু বড়া গোলমাল লাগাইসে!
বনোয়ারিকে কিছু বলব কী, ঘনাদা তার আগেই শুরু করে দিয়েছেন :
যেমন ছিলাম তেমনিই অগত্যা রওনা হয়ে পড়লাম। ফিরেও এলাম দিন দশেকের ভেতরই এক রাত্রে। সঙ্গে দুটো কারাকুল ভেড়ার ছানা।
ফিংক তো মহা খুশি। জাল দেওয়া যে সিন্দুকের মতো বাকসটা এনেছিল তার ভেতর ভেড়ার ছানা দুটোকে আমায় যত্ন করে ভরে রাখতে বলে কাজ হাসিল হওয়ার দরুন নিজেই ফুর্তি করতে বসে গেল।
কাজ সেরে তার কাছে যখন গেলাম তখন বাইরে বালির ওপরই শতরঞ্জি পেতে কাছেই উটকাঁটাঝোপ গাছের আগুন জ্বেলে সে নবাবি মেজাজে চব্যচোষ্য খাবার সাজিয়ে বসেছে। কতদিন এ কাজে লাগবে, না-জানায় ফুরিয়ে যাবার ভয়ে এতদিন জল আর খাবার যথাসম্ভব যা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে আজ তার সদ্ব্যবহার করছে। নির্ভাবনায়।
কালাহারিতে অন্য মরুভূমির মতোই দিনের বেলা যেমন গরম, রাত্রে তেমনই কনকনে ঠাণ্ডা। দিনের বেলা থেকেই আকাশ মেঘে ঢাকা ছিল বলে সে রাত্রে ঠাণ্ডা একটু বেশি।
আগুনের কাছাকাছি গিয়ে বসে বললাম, আমার কাজ তো শেষ, বোয়ানা। এবার আমার বকশিশ।
হুঁ, তোর বকশিশটাই শুধু বাকি, খাবার চিবোতে চিবোতে পাশে রাখা রিভলভারটা হাতে করে নিয়ে ফিংক বললে, তোর জন্য খুব ভাল বকশিশই ভেবে রেখেছি।
যেন ধৈর্য ধরতে পারছি না এমনভাবে জিজ্ঞাসা করলাম, কী বোয়ানা?
তোর জন্য এখানে বালির তলায় যদি একটা ছোট্ট ঘর বানিয়ে দিই, কেমন হয়? অনেক ঘোরাফেরা করেছিস, খুব ধকল হয়েছে! একটু বিশ্রাম দরকার। সে ঘরে থাকলে আর তোকে নড়তে চড়তে হবে না। চিরকাল শুয়ে থাকতে পারবি। আমারও একটু সুবিধে হবে। তুই-ই এ ব্যাপারে একমাত্র সাক্ষী। তোর মুখ থেকে কথা বার হবার ভাবনা আর থাকবে না।
একেবারে গদগদ হয়ে বললাম, সে তো খুব ভাল কথা, বোয়ানা। শুনেই আমার আড়মোড়া ভাঙতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সুবিধের সঙ্গে একটু অসুবিধে যে আপনার হবে।
আমার অসুবিধে! রিভলভারটা তুলে আমার দিকে তাক করে ফিংক বিশ্রীভাবে হেসে বললে, আমার অসুবিধে তো শুধু মরুভূমিটা একলা পার হওয়া। সঙ্গে আমার কম্পাস আছে। তাই দেখে জিপের মুখও আমি ঘুরিয়ে রেখেছি। এখন শুধু নাক বরাবর চালিয়ে গেলেই দক্ষিণ রোডেশিয়ায় দিন দশেকের মধ্যে গিয়ে পৌঁছোব। সেখানে একবার পৌঁছেলে আর আমায় পায় কে!
