এখানে তবু একটা চেনবার মতো রাস্তা পাওয়া যায়। এর বাইরে মরুভূমি তো দিকচিহ্নহীন অসীমতা। যেদিকে চাও, শুধু ছোট বড় বালিয়াড়ি। মাঝে মাঝে দু-একটা বেঁটে বাবলা জাতের শক্ত কাঁটাগাছ। কোথায় যে আছি তা জানবার উপায় নেই। সব দিকই এক রকম।
যতদূর পারা যায় কুরুমান নদীর শুকনো খাত দিয়ে এসে উইদ্রায়ই বলে একটা জায়গায় আমরা আবার আসল মরুতে উঠলাম। ফিংক অবশ্য জায়গাটার পরিচয় কিছু জানত না।
এ পর্যন্ত এটা-ওটা হুকুম করা আর যখন-তখন গালাগাল দেওয়া ছাড়া ফিংক আমার সঙ্গে কথাই বলেনি। খাবার যা সঙ্গে এনেছে তা থেকে দুবেলা গাণ্ডেপিণ্ডে খেয়েছে আর আমায় প্রায় ছোবড়া চুষতেই দিয়েছে বলা যায় হেলাফেলায়।
জুতোর সুকতলা হয়ে তবু সবই সহ্য করেছি শুধু তার গোপন শয়তানি মতলবটুকু জানবার জন্য।
কুরুমান নদীর খাত ছেড়ে ওঠবার পর তাকে বেশ একটু ভাবিত হয়ে ওদিক-ওদিক দূরবিন চোখে দিয়ে চাইতে দেখে বুঝলাম, জায়গাটা ঠিক ঠাহর করতে পারছে না।
যেন অত্যন্ত কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, যদি ভরসা দেন তো একটা কথা বলি, বোয়ানা।
কী কথা? চোখ থেকে দূরবিনটা নামিয়ে ফিংক খিঁচিয়ে উঠল।
এ জায়গাটা আমি চিনি, বোয়ানা। এটার নাম ছিল উইতদ্ৰায়াই।
তুই কেমন করে জানলি? ফিংক বেশ সন্দিগ্ধ। আমার ঠাকুরদাদার কাছে শোনা, বোয়ানা। এখানে অনেক অনেক আগে একটা উটের কাফিলার সরাই ছিল। মরুভূমি পার হবার পথে জিরিয়ে নিতে এখানে থামত।
বটে! তোর ঠাকুরদা কি উট ছিল নাকি সে কাফিলায়? তাই জন্যই বুঝি জল না খেলে তোর চলে?
নিজের নীচ রসিকতায় ফিংকের সে কী বিশ্রী হাসি!
অম্লান বদনে সব হজম করে চুপ করে রইলাম। ফিংক দুরবিনটা আবার চোখে দিয়ে এদিক-ওদিক দেখে বললে, হ্যাঁ, উটের চোখে তুই ঠিকই চিনেছিস। এখন এখান থেকে তোকে একলা কাজ হাসিল করতে যেতে হবে। ভাল করে মন দিয়ে শুনে নে।
মনে মনে বললাম, তোমার এই কাজটা কী জানবার জন্যই জুতোর সুকতলা হয়ে এতদূর এসেছি, আর মন দিয়ে শুনব না!
মুখে বললাম, বলুন, বোয়ানা!
শোন, এখান থেকে পাঁচ দিনের হাঁটাপথে কীটমানসুফ-এ পৌছোবি। কীটমানসুফ-এ কী আছে, জানিস?
কীটমানসুফ নামটা শুনেই ফিংকের শয়তানি মতলবটা আঁচ করে মনে মনে চমকে উঠেছিলাম। বাইরে সেটা প্রকাশ না করে বললাম, কী আর থাকবে, বোয়ানা! ও অঞ্চলে সোনাদানা কি হিরে নেই বলেই শুনেছি।
ফিংক দাঁত বার করে হেসে বললে, ঠিকই শুনেছিস। সোনাদানা কি হিরের জন্য তোকে পাঠাচ্ছি না। তোকে ওখান থেকে আনতে হবে…
এক শিশি ডিউটোরিয়াম, মানে ভারী জল! ঘনাদার আগেই ফোড়ন কেটে বসল শিবু।
না, না, ইউরেনিয়ম যাতে থাকে সেই পিচব্লেন্ড খানিকটা। আমিই বা কম যাই কেন!
উঁহু! শিশির টেক্কা দিতে চাইলে, সেই যে নিরুদ্দেশ বৈজ্ঞানিক ওখানে লুকিয়ে থেকে ক্লোরোফিল তৈরি করছে, তার যুগান্তকারী ফরমুলা!
রেনকোট হারাবার বদমেজাজ গৌরের এখনও পুরো ঠাণ্ডা হয়নি। প্রায় যজ্ঞি নষ্ট করে সে বলে বসল, ঘোড়ার ডিম!
এর পর ঘনাদার মুখ আর সাঁড়াশি দিয়েও খোলা যাবে? সভয়ে তাঁর দিকে। তাকিয়ে আমরা সামলাবার হতাশ চেষ্টা করতে গিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম।
কথাটা যেন কানেই যায়নি এমন ভাবে একবার শুধু বাইরের দরজার দিকে তাকিয়ে ঘনাদা নিজে থেকেই বললেন, না, ফিংক বললে, আনতে হবে দুটো ভেড়ার ছানা।
ভেড়ার ছানা! আমরা সবাই একেবারে পপাত ধরণীতলে। এত পেল্লয় পাহাড়-পর্বত গোছের ভনিতার পর নেংটি ইদুর!
হাঁ, স্রেফ দুটো ভেড়ার ছানা! ঘনাদা আমাদের মুখগুলোর ওপর চকিতে একবার চোখ বুলিয়ে বলে চললেন, ও-ই হল ফিংকের ফরমাশ। হাবাবোকা সেজে বললাম, কিন্তু ভেড়ার ছানা যদি ওরা না দেয়। শুনেছি ওখানে নাকি বড্ড কড়াকড়ি। ভেড়া তো ভেড়া, তার দুটো লোম ছিঁড়েও কারুর নিয়ে যাবার উপায় নেই। বাইরের কাউকে ভেড়ার পালের ত্রিসীমানায় যেতে দেয় না।
তা নয় তো কী তোকে আদর করে ডেকে নিয়ে গিয়ে কারাকুল ভেড়া ভেট দেবে হতভাগা! ফিংক খিঁচিয়ে উঠল, তোকে দুটো কারাকুল ভেড়ার ছানা যেমন করে হোক চুরি করে আনতে হবে এখানে! কালাহারি মরুভূমির ভেতর দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে যাবি আর তক্কে তক্কে থেকে ভেড়ার পাল যেখানে চরায় সেখান থেকে দুটো বেশ তাগড়া ছানা চুরি করে এই মরুভূমির ভেতর দিয়ে পালিয়ে আসবি।
কাঁদোকাঁদো মুখ করে যেন মিনতি করে বললাম, কিন্তু টের পেলে যে ওদের নেকড়ের মতো সব কুকুর লেলিয়ে দেবে, বোয়ানা, নয়তো গুলি করে মারবে। না, বোয়ানা, আমায় বরং অন্য কাজ দিন। আমি আপনাকে এক আজব পাহাড়ে নিয়ে যেতে পারি, বোয়ানা। নাম তার ব্রাকোরোটজ। এককালে তার মুখ থেকে আগুন ঠিকরে বেরুত। এখন নিবে গেছে।
ফিংক বেশ একটু অবাক হয়ে সন্দিগ্ধভাবে আমার দিকে চেয়ে বললে, ব্রাকোরোটজ আগ্নেয়গিরির নাম তুই জানলি কী করে?
ওই আমার সেই ঠাকুরদার কাছে, বোয়ানা। তিনিই আমায় হদিস দিয়ে গেছেন। সে পাহাড় যেখানে হাঁ করে আছে তার কাছে এমন জায়গা আপনাকে দেখাতে পারি যা খুঁড়তেনা-খুঁড়তে লাল নীল সবুজ ঝিলিক দেওয়া সব নুড়ি আপনাকে চমকে দেবে।
তার মানে চুনি, পান্না, নীলা! শিবুই চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞাসা করলে, সত্যি সত্যি ও সব পাওয়া যায় এমন জায়গা আপনি জানেন?
তা জানি বই কী! ঘনাদা মূর্তিমান বিনয় হয়ে বললেন, ইংরেজিতে যাদের নাম অ্যামেথিস্ট, ওপ্যাল, গার্নেট, টোপাজ বলে, সেসব পাথরেরও সেখানে ছড়াছড়ি। সে যাই হোক, আমার কথায় একবার একটু দোনামোনা হলেও ফিংক টলল না। ধমক দিয়ে বললে, থাম কালা ছুঁচো, তোকে আর লোভ দেখাতে হবে না! তোর ঠাকুরদার ভরসায় বুনো হাঁসের পেছনে আমি ছুটে মরি আর কী! আর তোর কথা যদি সত্যিই হয় তবু চুনি পান্না তো একবার বেচলেই ফুরিয়ে গেল। তার তো আর ছানাপোনা হয় না। আর এই কারাকুল ভেড়ার জোড়া পাওয়া মানে অফুরন্ত টাকার গাছ পোঁতা। যত দিন যাবে তত হবে তার বাড় আর ফলন।
