চুপ! চুপ! ফিংক বিরক্ত হয়ে কাছের টেবিলে রাখা খবরের কাগজটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, ওই রকম কাগজ পড়তে পারিস?
কাগজ! আমি যেন হতভম্ব, কাগজ পেলে তো আমরা পোড়াই, বোয়ানা!
আচ্ছা! আচ্ছা! বুঝেছি! ফিংক এবার তার আসল প্রশ্নে ফিরে এল, একাজের খবর পেলি তা হলে কোথায়?
ওই হেরেরা-দের বস্তিতে, বোয়ানা! সরল মুখ করে বললাম, এক ঠিকাদার ক-জনকে ডেকে খোঁজ নিচ্ছিল, তাই শুনেই চলে এলাম।
হুঁ! ফিংক চুরুটে টান দিয়ে কী যেন ভেবে নিলে। তারপর আমার দিকে চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, কালাহারির মরুভূমি পার হয়ে এসেছিস বলছিস?
হাঁ, বোয়ানা! কালাহারি পার না হলে এখানে আসব কী করে?
কদিন লেগেছে পার হতে?
তা তো বলতে পারব না, বোয়ানা। তবে কালাহারিতে পা দেবার আগে গোঁফদাড়ি কামিয়ে এসেছিলাম, এখানে পৌঁছে মুখে চার আঙুল জঙ্গল হয়ে গেছল। এখানকার নাপিতরা সে জঙ্গল…
আচ্ছা! আচ্ছা! বুঝেছি। বলে তাড়াতাড়ি আমায় থামিয়ে ফিংক বললে, কালাহারি যে পার হলি, তো জল পেয়েছিলি কোথায়?
জল! আমি যেন অবাক!
হ্যাঁ, জল! খাবার জল! তার কী করেছিলি?
কী আবার করব, বোয়ানা। খাইনি।
জল খাসনি! ফিংক আমায় বিশ্বাস করবে, না মিথুক বলে বুটের ঠোক্কর দেবে, যেন ঠিক করতে পারছে না।
বললাম, জল তো আমার তেমন লাগে না, বোয়ানা। চাঁদ খইতে খইতে যখন একেবারে মুছে যায় তখন একবার খাই আর বাড়তে বাড়তে পুরো থালা হয়ে ওঠে। যখন তখন একবার।
ভুরু কুঁচকে আমার দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে ফিংক বললে, ঠিক আছে। তোর কথা সত্যি কি মিথ্যে হাতেনাতেই প্রমাণ হবে! শোন, আমার সঙ্গে ওই কালাহারিতেই তোকে যেতে হবে। প্রথমে আমার সঙ্গে যাবি মোটরে, তারপর এক জায়গায় তোকে ছেড়ে দেব। তোকে একলা গিয়ে কাজ হাসিল করতে হবে। কতদিন যে জল পাবি না, খাবার পাবি না তার কিছু ঠিক নেই। তা তুই তো জল খাস একবার পূর্ণিমায়, একবার অমাবস্যায়। তোর আর ভাবনা কী!
না, সে ভাবনা নেই, বোয়ানা। কিন্তু কাজটা কী যদি বলতেন!
এদিক ওদিক চেয়ে পাহারাদারকে পর্যন্ত চোখের ইঙ্গিতে ঘর থেকে বার করে দিয়ে ফিংক কাজটার কথা বলতে গিয়েও কী ভেবে আর বললে না। শুধু বললে, যা কাজ তা এখন শুনে কী হবে! কালাহারিতে গিয়েই বলব।
তা কী করে হয়, বোয়ানা। ভয়ে ভয়ে যেন নিবেদন করলাম, কাজটা না জেনে কী করে আপনার সঙ্গে যাই। সে পারব না।
পারবি না মানে! ফিংকের আসল মূর্তি এবারেই পুরোপুরি দেখা গেল। একটি বিরাশি সিক্কার চড় আমার গালে কষিয়ে হাতটা আবার রুমাল বার করে মুছতে মুছতে বললে, নচ্ছার কালা নেংটি। আমার মুখের ওপর বলিস কি পারব না! ঘাড় যদি আর বাঁকিয়েছিস তো দুমড়ে শুধু সিধে করব না, সোজা গারদে চালান করে দেব ট্যাক্স রসিদ নেই বলে। আছে তোর ট্যাক্স রসিদ? আছে পাস?
চড় খেয়ে একটা ডিগবাজি মেরে যেখানে পড়েছিলাম সেখান থেকে যেন কাঁদো কাঁদো মুখে গালে হাত বোলাতে বোলাতে বললাম, না, বোয়ানা!
তবে!হাত মোছা রুমালটা ঘরের কোণে ফেলে দিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে ফিংক বললে, ট্যাক্স রসিদ আর পাস ছাড়া এ-শহরের রাস্তায় তোর মতো কালো ছুঁচোর হাঁটবার পর্যন্ত হুকুম নেই তা জানিস না?
কথাটা সত্যি। দক্ষিণ আফ্রিকায় ধলাদের শয়তানি রাজত্বে আঠারো বছর বয়স হলেই কালাদের ওপর ট্যাকস ধরা হয়। সে ট্যাকস দেবার রসিদ আর পাস না নিয়ে শহরে ঘুরলে ধরা পড়লেই কয়েদ।
ফিংক এবার পাহারদারকে ডেকে বলে, আর যে কটা আছে, সব বিদেয় করে দাও। আর এ হতভাগাকে বেঁধে রেখে দাও এই ঘরে তালা দিয়ে। কিছুতে যেন পালাতে না পারে। আজ রাত্রেই ওকে নিয়ে রওনা হব।
তারপর আমার দিকে ফিরে সোয়াহিলিতে বললে, কী রে! আর ট্যাঁফু করবি?
ভয়ে যেন সিটিয়ে গিয়ে বললাম, না, বোয়ানা। এখন থেকে আমি আপনার জুতোর সুকতলা।
জুতোর সুকতলা হয়েই সে রাত্রে ফিংকের সঙ্গে রওনা হলাম তার জিপ গাড়িতে।
ফিংকের আসল মতলব যে শয়তানি গোছের কিছু তা তার রওনা হবার ব্যাপারের গোপনীয়তা থেকেই বোঝা গেল। আমায় ছাড়া আর একটা লোককে সে সঙ্গে নেয়নি। নিজে সামনে বসে জিপ চালাচ্ছে, পেছনে একরাশ খাবারদাবারের বাকস আর জলভরা ব্যাগের মাঝখানে আমি কোনওরকমে বসে আছি। খাবার আর জলের জায়গা ছাড়া একটা জাল দেওয়া সিন্দুক গোছের বাকসও আছে সেখানে। সেটা সম্পূর্ণ খালি বলেই রহস্যজনক।
জোহান্নেসবার্গ ছাড়িয়ে দুদিন দুরাত কালাহারির মরুর ভেতর দিয়ে যাবার পর সে বাকসের রহস্যটা পরিষ্কার হল। সেই সঙ্গে আমায় কী কাজের জন্য আনা তা-ও।
এতক্ষণ পর্যন্ত কালাহারির কুরুমান নদী ধরেই আমরা এসেছি। কালাহারির নদী মানে শুকনো খাত মাত্র। তাতে জলের বাম্পও নেই। কালাহারির আকাশে কখনও কখনও অবশ্য মেঘের ঘটা দেখা যায়, বৃষ্টি যে পড়ে না কখনও তা-ও নয়, কিন্তু সে ছিটেফোঁটাও পড়তে-পড়তেই যায় মিলিয়ে। তবে সত্তর বছর আগে একবার এই কুরুমান নদীতে নাকি অবিশ্বাস্য রকমের বৃষ্টিতে বান ডেকেছিল বলে গল্প আছে।
কুরুমানের এখনকার চেহারা দেখে সে গল্পে বিশ্বাস করা শক্ত। পৃথিবীর পুরোনো ঘায়ের দাগের মতো শুকনা মরা খাত যেন সৃষ্টির আদিকাল থেকে পড়ে আছে। এখানে-সেখানে একটা দুটো উটকাঁটার নিচু ঝোপ ছাড়া কোথাও প্রাণের লক্ষণ নেই।
তবু কালাহারির মতো মরুতে এই ধরনের মরা নদী দিয়ে যতদূর পারা যায় যাওয়াই সুবিধের।
