দক্ষিণ আফ্রিকায় কালাদের ওপর ধলাদের জুলুমের সঠিক খবর আনবার জন্য এক মার্কিন কাগজের হয়ে তখন সেখানে গিয়েছি। পোর্ট এলিজাবেথ, ডারবান, কিম্বার্লি, প্রিটোরিয়া হয়ে শেষ পৌঁছেছি জোহান্নেসবার্গে। যা দেখবার শোনবার সবই দেখাশোনা হয়েছে, পাততাড়ি গুটিয়ে ফিরে এলেই হয়। এমন সময় সেখানকার কাগজে ওই বিজ্ঞাপনটি চোখে পড়ল। আফ্রিকানস ভাষার কাগজে। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ ধলাই মূলে ওলন্দাজ। প্রায় চারশো বছর আগে যারা এসেছিল তাদেরই বংশধর। আফ্রিকানস ভাষাও সেই আদি ওলন্দাজি ভাষার অপভ্রংশ।
ছোট্ট বিজ্ঞাপন। খবরের কাগজের লাইন চারেক মাত্র। কিন্তু যেমন অদ্ভুত তার মর্ম তেমনই কালাদের ওপর অবজ্ঞা আর ঘৃণা মেশানো তার ভাষা। বিজ্ঞাপনটা কালাদের পড়বার জন্য অবশ্য লেখা নয়। পড়বে কে? ওখানকার কালাদের কাগজকালির সঙ্গে সম্পর্ক তো শুধু টিপসই দেওয়ায়।
কালা কুলিমজুরদের ঠিকাদারদের উদ্দেশেই বিজ্ঞাপনটা দেওয়া। তাতে লেখা সাতদিন জল না খেলেও মরে না এমন সুটকো চিমসে গোছের একটা কালা নফর চাই। কোনও ঠিকাদার সেরকম কাউকে ধরে আনলে পুরস্কার পাবে।
এরকম বিজ্ঞাপন দেখে আর ঠাণ্ডা থাকা যায়।
গেলাম ঠিকানা যা দেওয়া ছিল খাস শহরের সেই এলফ স্ট্রিটের অফিসে।
পোশাকটা কুলি মজুরের মতোই করেছিলাম। যেতে যেতে এ-শহরের যা এক বিশ্রী উপদ্রব সেই সাদা ধুলোর ঝড়ে পড়ে চেহারা আরও খোলতাই হয়ে গেল। জোহানেসবার্গের চারধারে সোনার খনির গুঁড়ো করা পাথর থেকেই এই ধুলোর পাহাড় জমে থাকে। ঝড়ের সময় তারই ধুলোয় সারা শহর অন্ধকার করে দেয়।
জোহান্নেসবার্গ শহরের রাস্তাগুলো যেন জ্যামিতি ধরে পাতা। পুব থেকে পশ্চিম আর উত্তর থেকে দক্ষিণের সোজা সোজা রাস্তাগুলো পরস্পর চৌকোণা করে কেটে গিয়েছে।
অফিসটা একটা ছোটখাটো তামাকের কোম্পানির। ঠিক এলফ স্ট্রিটে নয়, তার গা থেকে বার হওয়া একটি গলির মধ্যে।
আমাদের মতো কালা আদমির অবশ্য আসল অফিসে ঢোকবার হুকুম নেই। অফিসের পেছনের গোডাউনের ভেতরে গিয়ে দাঁড়াতে হল।
বিজ্ঞাপন চার লাইনের হলেও উমেদার খুব কম জোটেনি দেখলাম। ভরসার কথা এই যে বিজ্ঞাপনের ফরমাশের সঙ্গে তাদের প্রায় কারুরই মিল নেই। বেশির ভাগই শক্তসমর্থ চেহারা। রোগা পটকা যা আছে সবই বুড়োটে। সঙ্গে ধলা ঠিকাদার। পুরস্কারের লোভেই কপাল ঠুকে যা হাতের কাছে পেয়েছে, ঝেটিয়ে এনেছে।
আমার অনুমান ভুল নয়। এক এক করে ডাক পড়ে আর ভেতরে গিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই বাতিল হয়ে বেরিয়ে আসে।
দেখতে দেখতে আমার পালা এসে গেল।
পাহারাদার গোছের যে জোয়ান লোকটা সবাইকে ডাক দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, আমার দিকে এবার সে ভুরু কুঁচকে ঠোঁট বেঁকিয়ে বললে, এই কালা ভূত! তোর ঠিকাদার কই? কার সঙ্গে এসেছিস?
আফ্রিকানস যেন বুঝি না এই ভাব দেখিয়ে হাঁ করে চেয়ে রইলাম। লোকটা আবার ভাঙা ভাঙা সোয়াহিলিতে প্রশ্ন করায় যেন ভয়ে ভয়ে বললাম, আজ্ঞে, একলাই এসেছি।
একলা এসেছিস! পাহারাদারের গলার আওয়াজে আর মুখের চেহারায় মনে হল আমায় নিয়ে যাবে, না বুটের ঠোক্কর দিয়ে বিদেয় করবে, ঠিক করতে পারছে না।
শেষ পর্যন্ত কী ভেবে ব্যাজার মুখে বললে, আয় তবু! আমার চেয়ে কর্তার গোদাপায়ের লাথির জোর বেশি।
গোডাউনের একধারে কাঠের পার্টিশন দেওয়া একটা মাঝারি মাপের ঘর। তারই ভেতর হাতের খাটো লাঠিটা দিয়ে পাহারাদার আমায় ঠেলে ঢুকিয়ে দিলে।
ভেতরে ঢুকে যে মূর্তিটিকে মোটা একটা চুরুট মুখে বেশ অস্থিরভাবে পায়চারি করতে দেখলাম তার জুড়ি পাওয়া ভার।
দেখলে সম্রম হওয়াই উচিত। আমাদের কিক্কড় সিং পালোয়ানের রংটা যদি ধবধবে হত আর চুলগুলো হত কোঁকড়া আর প্রায় গনগনে আগুনের মতো লাল, তা হলে খানিকটা বোধহয় মিল পাওয়া যেত।
পাহারাদার আমার পেছনে এসে ঘরে ঢুকেছিল। সসম্মানে এবার সে জানালে, কেলেটা একলাই এসেছে বলছে, হের ফিংক। চেহারাটা চিমসে দেখে নিয়ে এলাম।
মুখে চুরুট রেখেই হের ফিংক মেঘগর্জনের মতো আওয়াজে বললেন, ছুঁচোটাকে ধুলোর গাদা খুঁড়ে এনেছ নাকি? ঘরটা তো নোংরা করে দিলে!
আমার দিকে ফিরে হের ফিংক তারপর সোয়াহিলিতে ধমকের সুরে জিজ্ঞাসা করলে, সঙ্গে ঠিকাদার নেই কেন?
ঠিকাদার কোথায় পাব, বোয়ানা! মাটিতে যেন মিশিয়ে বললাম, সবে তো কাল কালাহারি পেরিয়ে কাজের খোঁজে শহরে এসেছি।
কালাহারি পেরিয়ে এসেছিস? ফিংক মুখ থেকে চুরুটটা নামিয়ে এবার একটু আগ্রহভরেই আমায় লক্ষ করে বললে, আসছিস কোথা থেকে?
তা কি জানি, বোয়ানা। সেখান থেকে আসতে অনেকগুলো সূর্যি আর অনেকগুলো চাঁদ আকাশে ঘুরে যায়। পাহাড় জঙ্গল ফুরিয়ে গিয়ে চারদিকে লাল কাঁকর আর বালি ধুধু করে…
থাম! বলে ধমকে আমার ঠিকানা জানবার চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে ফিংক এবার জিজ্ঞাসা করলে, সবে তো কাল এসেছিস, ঠিকাদারও কাউকে জানিস না। তবে
এখানকার কাজের খবর পেলি কেমন করে? তুই পড়তে জানিস?
ইচ্ছে করেই বললাম, হাঁ, বোয়ানা।
জবাব শুনে ফিংকের মুখখানাই প্রথমে হাঁ। তারপর যেন নিজের অজান্তেই তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, পড়তে জানিস তুই?
খুব জানি, বোয়ানা! যেন সবিনয়ে জানালাম, মাটিতে থাবার দাগ পড়ে বলে দিতে পারি সিম্বাটা মন্দা না মাদি, বুড়ো না জোয়ান, পেট ভরে খেয়েছে না খাবার খুঁজছে..
