সুরটা কেমন ভাল লাগল না। একটু সন্দিগ্ধ হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম, পুলিশ কি করপোরেশনের লোক আসবে, মানে?
না। শিবু আমায় আশ্বাস দিলে, শিশির ভুল করছে। এলে প্রথমে অ্যাম্বুলেন্সই আসবে।
অ্যাম্বুলেন্স! আমি বিমূঢ় আর সেই সঙ্গে একটু বিরক্তও বটে, আম্বুলেন্স এখানে আসছে কোথা থেকে!
কোথা থেকে আর! শিশির ব্যাখ্যা করলে, খোদ স্বাস্থ্যদপ্তর থেকে।
শিবু ব্যাখ্যাটা বিশদ করলে, গৌরকে ধরে নিয়ে গিয়ে ছোঁয়াচে রোগের হাসপাতালে নজরবন্দী করে রাখবার জন্যই অ্যাম্বুলেন্স আসবে। এরকম একটা সাংঘাতিক রুগিকে তো বাইরে রাখা নিরাপদ নয়।
একটা নয়, দুটো অ্যাম্বুলেন্সই তা হলে আসা উচিত। গৌরই মন্তব্য করলে, একটা যদি আমার জন্য হয় তা হলে আরেকটা এ-ইস্তাহার যাঁর মাথা থেকে বেরুচ্ছে তাঁর জন্য। সে-অ্যাম্বুলেন্স অবশ্য মেন্টাল হসপিটাল থেকেই আসবে।
এবার যে হাসির রোলটা উঠল তাতে যোগ দিতে পারলাম না। সংসারের ওপর আমি তখন বীতশ্রদ্ধ! সত্যিকার গুণের আদর যেখানে নেই, পরোপকারের নিঃস্বার্থ চেষ্টা যেখানে উপহাসের বিষয়, সে স্থান ত্যাগ করাই উচিত কিনা ভাবছি এমন সময় একটু যেন হন্তদন্ত হয়েই ঘনাদার প্রবেশ।
বিমূঢ়তার ধাক্কায় হাসির রোল থামতে না থামতেই শিশিরের ছেড়ে ওঠা আরামকেদারায় গা এলিয়ে দিয়ে নিজে থেকেই সাগ্রহে জিজ্ঞেস করলেন, কী, হাসি কীসের?
আমার তো বটেই, যারা এতক্ষণ হেসে ঘরের কড়িকাঠ কাঁপাচ্ছিল তাদেরও মুখের হাঁ আর বুজতে চায় না।
শিশিরই সবার আগে নিজেকে সামলে বললে, আজ্ঞে, হাসিটা কিছু নয়। আসলে আমরা একটা সমস্যা নিয়ে ভাবছি।
কী সমস্যা! ঘনাদা ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলেন সমস্যা ধরতে নয়, শিশিরের সিগারেটের জন্য। যথারীতি তাঁর মধ্যমা ও তর্জনীর মধ্যে সিগারেট স্থাপন করে লাইটার দিয়ে ধরিয়ে দিয়ে শিশির বললে, সমস্যা একটা বর্ষাতির।
ও, বর্ষাতির! বলে ঘনাদার অবজ্ঞাসূচক নাসিকাধ্বনিই আশা করেছিলাম— তার বদলে বেশ উৎসাহ ভরে তিনি বললেন, হ্যাঁ, বর্ষাতি একটা সমস্যা বটে। বিশেষ করে যদি ফুটন্ত জলের বৃষ্টি হয়। সেবার সেই হাওয়াই দ্বীপে কিলোইয়া ইকি মানে ছোট কিনলাইয়া আগ্নেয়গিরি হঠাৎ জেগে ওঠায় যা হয়েছিল!
ঘনাদার হল কী! এ যে মেঘ না চাইতেই জল! ফুটন্ত বৃষ্টি থেকেই গল্পের বন্যা বয়ে যেত বোধহয়, কিন্তু গৌর নেহাত বেরসিকের মতো বাগড়া দিলে।
সে বৃষ্টির কথা হচ্ছে না। আমার বর্ষাতিটা খেলার মাঠে হারিয়েছে…
গৌরকে কথাটা আর শেষ করতে হল না। ঘনাদা হারিয়ে পর্যন্ত শুনেই বলে উঠলেন, তা হারিয়ে যাবার কথা যদি বলো একটা বর্ষাতি হারানো তো কিছু নয়, সেবার নিউ গিনির কারাম্বা গাঁয়ে পুকপুক মানে কুমির শিকারে বেরিয়েছি…
রেনকোট হারিয়ে গৌরের আজ মাথার ঠিক নেই বোধহয়। ঘনাদাকে বাধা দেবারই তার যেন বেয়াড়া জেদ চেপে গেছে।
কুমিরের কথা আসছে কোথা থেকে! প্রায় যেন ধমকেই সে ঘনাদাকে থামিয়ে দিলে, শুনছেন বর্ষাতিটা ভুলে খেলার মাঠে ফেলে এসেছি। সেটা উদ্ধার করা যায় কিনা তা-ই সবাই ভাবছি। খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন..
গৌরকে আর এগুতে হল না। ঘনাদার যেন কুটো পেলেই আঁকড়ে ধরবার অবস্থা। বিজ্ঞাপনের ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়লেন প্রায় চোখ কান বুজে—
বিজ্ঞাপন বড় গোলমেলে জিনিস হে। খবরের কাগজের একটা বিজ্ঞাপন থেকেই বেচুয়ানাল্যান্ডে অত বড় একটা চক্রান্ত সেদিন ধরা পড়েছিল।
গৌর এবারও বাদ সাধবার উপক্রম করছিল। দুদিক থেকে দুপায়ে শিবু আর শিশিরের কড়া ঠোক্কর খেয়ে তাকে থামতে হল।
গৌর থামলেও আর এক উপদ্রব আচম্বিতে দেখা দিল আড্ডা ঘরের দোরগোড়ায়। আমাদের বনোয়ারি। কাঁচুমাচু মুখে সে তার বার্তাটুকু জানাল—
বড়াবাবুকে একজনা নীচে বোলাইছে।
গৌরকে সামলাবার পর এমন ঘাটের কাছে এসে ভরাড়ুবি হতে আর আমরা দিই। পাছে ঘনাদা এই ফাঁকে ফসকে যান এই ভয়ে বনোয়ারিকে ধমক দিতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু তার দরকার হল না।
ঘনাদা একবার বনোয়ারির দিকে কেমন একটু সন্ত্রস্তভাবে চেয়ে নিজেই গল্পের দড়ি ধরে যেন বেপরোয়া ঝুলে পড়লেন।
কী বলছিলাম? বিজ্ঞাপন? হ্যাঁ, বড় অদ্ভুত বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল জোহান্নেসবার্গের এক কাগজে। জোহান্নেসবার্গ কোথায় জানো তো? দক্ষিণ আফ্রিকায় ট্রান্সলের সব চেয়ে বড় শহর। শহর গড়ে উঠেছে সোনার খনির কল্যাণে। হিরেও আছে। শহরের দক্ষিণেই যে নিচু পাহাড়ের সার চলে গেছে তা সোনায় ঠাসা বলা যায়। শহরের নামটাও ওই সোনার সন্ধান থেকেই এসেছে। ১৮৮৬-তে জোহান্নেস রিসসিক বলে একজন ওলন্দাজ ছিলেন জরিপ বিভাগের কর্তা। তাঁর আমলেই সোনার খোঁজ ওখানে মেলে। তাঁর নামেই তাই শহর বসানো হয়।
মাটিতে যেখানে সোনা সেখানে মানুষের মনে সিসের বিষ। গায়ের চামড়া ধলা না হলে সে-দেশের মানুষ জন্তুজানোয়ারেরও অধম বলে গণ্য। ধলাদের রাজত্বে কালা আদমির মানুষদের মানুষ হয়ে বাঁচবার অধিকার নেই। তারা শুধু আছে ধলাদের খেতখামারে গোরু বলদের মতো খাটতে, খনির তলা থেকে ইদুরছুঁচোর মতো ধলাদের জন্য সোনা হিরে তুলতে। ধলাদের ছায়া মাড়ালেও কালাদের সাজা পেতে হয়। তাদের শহরের বাইরে ছাগলের খোঁয়াড়ের অধম বস্তিতে থাকার ব্যবস্থা। ধলাদের বাসে ট্রামে তারা চড়তে পারে না, ধলাদের দোকানে রেস্তোরাঁয় ঢুকতে তো নয়ই। ধলাদের জন্য আলাদা করে রাখা পার্কের বেঞ্চিতে শুধু হেলান দেওয়ার জন্য কালা মানুষকে হাজতে যেতে হয়েছে এমন দৃষ্টান্তেরও অভাব নেই।
