মোহনবাগান তারপর আর একটা গোল দিয়ে ফেলতেই নাচতে নাচতে গৌর শিশিরের কাছেই ফিরে এসেছিল। কিন্তু শিশিরের মনটা এমন ছোট ভাবতে পারেনি। মোহনবাগান জিতেছে বলে জায়গা ছেড়েই কি না সরে পড়েছে! খুশি না হয় নাই হলি, কিন্তু গৌরের ভাল ভাল শানানো কথাগুলো তো শুনতে পারতিস! সেটুকু খেলোয়াড়ি উদারতা—যাকে বলে স্পাের্টিং স্পিরিট—যদি না থাকে তা হলে খেলা দেখতে আসা কেন?
এরপর শিশির কোথায় গিয়ে লুকিয়ে বসেছে গৌর খুঁজে বার নিশ্চয়ই করত। তা-ই করবেই ঠিক করেছিল। হাজার হোক বন্ধুত্বের খাতিরে তাকে একটু উপদেশ দেওয়াও তো দরকার। সেই সঙ্গে ইস্টবেঙ্গল যে হারবে এ আর এমন বেশি কথা কী! বলে একটু সান্ত্বনা।
কিন্তু এর মধ্যে মেঘ নেই, জল নেই, হঠাৎ বজ্রাঘাত!
ইস্টবেঙ্গল কোথা থেকে ঝপ করে আবার একটা গোল দিয়ে বসল।
এ যে অফসাইড গোল সে-বিষয়ে অবশ্য সন্দেহ নেই। কিন্তু সে-তর্ক করতে গেলে তো শিশিরের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ধেই-নৃত্য করতে করতে সে যে এই দিকেই এখন আসবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
খেলা শেষ হতে তখনও মিনিট কয়েক বাকি। গৌর তবু আগেই চলে এসেছে মাঠ থেকে।
মাঠ থেকে ট্রামের লাইন পর্যন্ত আসতে আসতেই বৃষ্টি।
রেনকোটটা সম্বন্ধে খেয়াল হয়েছে সেই তখন। কিন্তু তাতে আর লাভ কী!
একেবারে সপসপে হয়ে ভিজে বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের দোতলায় আড্ডাঘরে পা দিয়েই শিশিরকে দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলেছে, কী রকম আক্কেল তোর! আমার ওয়াটারপ্রুফটা নিয়ে চলে এলি?
তোর ওয়াটারপ্রুফ! শিশির তাজ্জব, তোর ওয়াটারপ্রুফ আমি নিতে যাব কেন? আমার কি দুটো ওয়াটারপ্রুফ লাগে?
বাঃ, তোর পাশেই তো রাখা ছিল! গৌরের গলাটা আর তেমন কড়া নয়।
তার পাশে তো তুইও ছিলি! শিশিরের একটু যেন বাঁকা জবাব, মোহনবাগান গোল খেতেই গ্যালারির ফাঁকে গলে পড়েছিলি নাকি!
বাহাত্তর নম্বরও খেলার মাঠের মতো কাদা হয়ে ওঠবার ভয়ে ওয়াটারপ্রুফ রহস্যের সমাধানে আমাদেরও যোগ দিতে হয়েছে এবার।
ব্যাপারটা কী বুঝে নিয়ে নিজের নিজের মতামত ও পরামর্শ জানিয়েছি।
শিবু দার্শনিক মন্তব্য করেছে, খেলার মাঠে ওয়াটারপ্রুফ কখনও হারায় না। হারায়, আবার পাওয়া যায়।
কী রকম? গৌরের বদলে আমরাই অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছি।
কী রকম আবার? শিবু গম্ভীর ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, ওই মাঠেই পাওয়া যায় একটু ধৈর্য ধরে থাকলে। রংটা, মাপটা হয়তো মিলবে না, কিন্তু পাওয়া যাবেই।
তার মানে আর কারুর ফেলে যাওয়া ওয়াটারপ্রুফ! তা-ই আমি নেব? গৌর জামা নিংড়াতে নিংড়াতে চোখ পাকিয়ে বলেছে।
ওই সব তুচ্ছ আত্মপর ভেদ খেলার মাঠে নেই। শিবু যেন বাণী দিয়েছে, কেউ হারাবে, কেউ পাবে, এই ওখানকার দস্তুর। হারিয়ে এসেও আফশোস করবে না, পেয়ে গেলেও নিতে কোনও সংকোচ করবে না। এক হিসেবে ওটা ওয়াটারপ্রুফ বদলাবদলিরই বাজার। নিজেরটায় অরুচি ধরলে ইচ্ছে করেই কেউ কেউ ফেলে আসে বলে আমার বিশ্বাস। নিজেরটা হারালে পরেরটা নিতে তো আর বিবেকে বাধবে না!
শিবু আরও হয়তো ব্যাখ্যান করত। কিন্তু গৌর তার ভিজে জামাটা শিবুর মাথাতেই নিংড়ে বলেছে, থাক, থাক, আর মাথা খাটিয়ে কাজ নেই। যা ফুলকি ছাড়ছে, এঞ্জিনই না জ্বলে যায়।
শিবুকে তখনকার মতো ঠাণ্ডা করে গৌর নিজের ঘরে গেছে জামাকাপড় ছেড়ে আসতে। ইতিমধ্যে বনোয়ারি ঝাল-মুড়ির গামলা রেখে গেছে মাঝখানের টেবিলে।
তাই চিবোতে চিবোতে চোখে যত জল ঝরছে, বুদ্ধি তত যেন খুলে যাচ্ছে মাথায়।
গৌর ফিরে আসবারও যেন তখন আর তর সইছে না।
সে ঘরে এসে ঢোকবামাত্র তাই আশ্বাস দিলাম, কোনও ভাবনা নেই। রেনকোট ফেরতই পেয়ে গেছ মনে করতে পারো!
যে ভাবে কেউ কপাল কুঁচকে, কেউ বা মুখ বাঁকিয়ে হেসে তাকাল, তাতে একটু ক্ষুণ্ণ হবারই কথা।
কিন্তু হৃক্ষেপই করলাম না। আমার মুশকিল-আসানে মোক্ষম দাওয়াই-টা একবার শুনলে মুখের চেহারা যে বদলে যাবে সে বিষয়ে আমার তো সন্দেহ নেই।
শোনবার পর তা-ই হল! সবাই একেবারে যাকে বলে হতবাক।
শিবু চোখ দুটো প্রায় ছানাবড়া করে জিজ্ঞাসা করলে, কী বললে?
প্রস্তাবটা আর একবার শুনিয়ে দিতে হল একটু বিশদ ব্যাখ্যা সমেত।
এমন কিছু কঠিন ব্যাপার নয়। শুধু কিছু হ্যান্ডবিল ছাপিয়ে খেলার মাঠে গিয়ে গেটে গেটে বিলি করা। হ্যান্ডবিলে লেখা থাকবে—
সাবধান! সাবধান!
ক্রীড়ামোদী জনসাধারণের অবগতির হেতু জ্ঞাপন করা যাইতেছে যে গত ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান প্রতিযোগিতার দিনে খেলার মাঠে একটি বর্ষা-ত্রাণ পরিচ্ছদ অনবধানতায় ক্রীড়াভূমির কাষ্ঠাসনে পরিত্যক্ত হইয়াছে। উক্ত পরিচ্ছদের অধিকারী কঠিন চর্মরোগে আক্রান্ত। সুতরাং ভ্রমক্রমে কেহ যেন সেটি ব্যবহার না করেন। করিলে রোগ তদ্দেহে সংক্রামিত হওয়া অবধারিত। পরিচ্ছদটি পুরাতন সংবাদপত্রে সতর্কভাবে আচ্ছাদিত করিয়া নিম্নলিখিত ঠিকানায় বাহকের দ্বারা বা ডাকযোগে প্রেরণ করিয়া জনহিতৈষণার পরিচয় দিন।
খানিকক্ষণ ঘরে আর টুঁ শব্দ নেই।
শিবুই প্রথম বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বললে, হ্যাঁ, এতেই কাজ হবে, নির্ঘাত কাজ হবে।
শিবুর সমর্থনে সন্তুষ্ট হয়ে তার দিকে চেয়ে একটু প্রসন্ন হাসি হাসলাম।
শিশির আমার দিকে বিস্ময়ভরেই বোধহয় খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বললে, হ্যাঁ, কাজ ঠিক হবে, তবে পুলিশ না করপোরেশনের লোক, কারা আগে আসবে তা-ই ভাবছি।
