বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের উপমাই লোকে দেয় কিন্তু শুকনো খটখটে আকাশ থেকেও যে বর্ষণ কখনও কখনও হয় সেকথা মনে রাখে ক-জন।
এ রকম বর্ষণ এই আমাদের ভাগ্যেই সেদিন হয়েছে, একেবারে যাকে বলে অভাবিত।
অভাবিত ছাড়া আর কী বলা যায়। প্রাণান্ত সাধ্য-সাধনা করেও যাঁকে এতটুকু গলাতে পারিনি গত তিনমাস, নিজের তিনতলার টঙে যিনি প্রায় অবানসোগোচর হয়ে আছেন, উঠতে নামতে কচিৎ কদাচিৎ দেখা হলে যাঁর দৃষ্টিতে হাওয়ার মতো আমরা হঠাৎ স্বচ্ছ হয়ে যাই, দোতলার আড্ডা ঘর থেকে কখনও পাড়া কাঁপানো শোরগোল তুলে কখনও বা অনুকুল বাতাসে সদ্যভাজা হিঙের কচুরি কি চিংড়ির কাটলেটের সুবাস ছড়াবার ব্যবস্থা করেও যাঁকে একবার একটু কৌতূহলভরেও ওপরের ছাদ থেকে উঁকি দেওয়াতে পারিনি, সেই ঘনাদার হঠাৎ নিজে থেকে বিনা নিমন্ত্রণেই আড্ডাঘরে এসে সহাস্যবদনে নিজের আরাম-কেদারা দখল কে কল্পনা করতে পেরেছিল!
শুধু ঘরে ঢুকে বসা তো নয়, প্রায় কুঁ মেরে আমাদের আলোচনায় মাথা গলিয়ে দেওয়া।
অথচ আজ দুপুরবেলাতেই আমরা হার মেনে ফিরে এসেছি মুখ চুন করে। শিশির যেন বৃষ্টিতে নীচের ঘরে জল পড়ার সমস্যা মেটাতে ঘনাদার কুঠুরির সামনের ছাদটা তদারক করতে গেছল। সঙ্গে আমাকেও থাকতে হয়েছিল ব্যাপারটা সরব করবার জন্য।
ছাদটা তো অনেক জায়গায় দাগরাজি করতে হবে দেখছি! আমার গলাটা আশা করি রাস্তার ওপারের বাড়িতেও শোনা গেছল।
দাগরাজি! শিশির তার গলাটা গলি ছাড়িয়ে বড় রাস্তায় পৌছে দিয়েছিল, শুধু দাগরাজিতে কী হবে! সমস্ত ছাদ খুঁড়ে নতুন করে পেটাই করতে হবে।
ঘনাদার তাতে বড্ড অসুবিধে হবে না? আমি তারস্বরে জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
আকাশে অনেক উঁচুতে একটা চিল নিশ্চিন্ত মনে ভেসে চক্কর দিতে দিতে হঠাৎ ডানা নেড়ে তীরবেগে সরে পড়েছিল, কিন্তু খোলা দরজা দিয়ে তক্তপোশের ওপর আসীন ও খবরের কাগজে নিমগ্ন ঘনাদার বিন্দুমাত্র চাঞ্চল্য দেখা যায়নি।
ছাদের ফাটল দেখবার ছলে শিশির এবার ঘনাদার দরজার কাছে গিয়ে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগের জন্য নতুন সিগারেটের টিনটা খোলবার কসরত করেছিল।
আমাকে ও সেই সঙ্গে পাড়ার পাঁচজনকে শুনিয়ে বলেছিল, একেবারে তাজা মাল। খুললেই কী রকম শিস দেয় শোনো।
সিগারেটের টিন খোলার শিস না হোক, শিশিরের সরব বিজ্ঞাপন সারা বনমালি নস্কর লেনকেই সচকিত করে তুলেছিল, কিন্তু ঘনাদার মুখের সামনের খবরের কাগজটা একটু কাঁপেওনি।
ছাদ মেরামত সম্বন্ধে আরও কিছু আবোলতাবোল বকে আমাদের নেমেই যেতে হয়েছিল অগত্যা।
ঘনাদার এবারের ধনুকভাঙা পণ আর টলবার নয় বলেই তখন ধরে নিয়েছি।
ছোট্ট এক বাটি তেল তিন মাস ধরে এতদুর গড়াবে ভাবতেও পারিনি আমরা কেউ।
হাঁ, সামান্য এক বাটি তেল থেকেই বাহাত্তর নম্বরের ঠাণ্ডা লড়াই এবার শুরু।
তেলটা যে সরষের তা আর বোধহয় বলতে হবে না। তখন তার আকাল সবে দেখা দিয়েছে। একেবারে হা তেল! জো তেল! বলে আর্তনাদ না উঠক, তেল। আনতে অনেকের বাড়িরই কড়া পড়ে যেতে শুরু করেছে, দোকানের কিউ দেওয়া লম্বা লাইনের কৃপায়।
সে মাসটায় মেসের ম্যানেজারি ছিল গৌরের ঘাড়ে। অতি কষ্টে মাসখানেকের মতো তেল কোথা থেকে সে জোগাড় করে এনেছে।
তিন হপ্তা না যেতেই ঠাকুর রামভুজের কাছে তেল বাড়ন্ত শুনে একেবারে খাদ্ধা।
ধমক খেয়ে রামভুজ আমতা আমতা করে জানিয়েছে যে তার কোনও কসুর নেই। বড়বাবুকে রোজ এক বাটি করে মাখবার তেল না দিতে হলে সে পুরো মাসটা নিশ্চয়ই চালিয়ে দিতে পারত।
আমরা একটা ফোঁটার জন্য মাথা খুঁড়ে মরছি, আর বড়বাবু রোজ বাটি বাটি তেল মাখছেন! বলে দেবে যে মাখবার তেল এখন থেকে নিজেই যেন জোগাড় করেন!
মেজাজ যত গরমই হোক তালে ভুল করবার ছেলে গৌর নয়। দোতলার সিঁড়ির ধারে দাঁড়িয়ে, কথাগুলো চাপা গলাতেই বলেছে।
তেতলার ঘরে সে আওয়াজ পৌছোবার কথা নয়। তবু সেদিন সন্ধে থেকেই ঘনাদা আমাদের ত্যাগ করেছেন। তাঁর সে আত্ম-নির্বাসন পর্বই চলে এসেছে আজ পর্যন্ত।
তারপর হঠাৎ যেন ভেলকিবাজিতে কোথা থেকে কী হয়ে গেল!
কার্যকারণ সূত্ৰ সন্ধান করতে গেলে গৌরের রেনকোটটাই মূল বলে ধরতে হয় বোধহয়। গৌরের একটা রেনকোট যদি না থাকত…
না, তা যদি বলি তা তা হলে রেনকোটটাই বা কেন, কার্যকারণ শৃঙ্খল খুঁজতে আরও বহুদুর তো যাওয়া উচিত।
বাংলাদেশে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল নামে দুটি অতুলনীয় টিম যদি না থাকত, বছরের পর বছর তাদের রেষারেষির পাল্লায় সারা দেশ যদি উত্তেজনার দোলায় না দুলত, লিগের হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতায় আগুপিছু হতে হতে দুই যদি একই পয়েন্টের কোঠায় এসে না দাঁড়াত, চ্যারিটি ম্যাচের সাতরাজার ধন মানিকের মতো দুর্লভ টিকিট শিশির ও গৌর দুজনেই যদি বহুজন্মের পুণ্যফলে না পেয়ে যেত, আর বৃষ্টির হুমকি দেওয়া এক বিকেলে দুজনে দুটি রেনকোট নিয়ে খেলার মাঠে গিয়ে উপস্থিত না হত, তা হলে গৌরের রেনকোটও হারাত না আর আমরাও ঘনাদার অভাবের দুঃখ ভুলতে রেনকোট উদ্ধারের উপায় ভেবেই সন্ধেটা জমাবার চেষ্টা করতাম না।
তব রেনকোট দিয়েই শুরু করা যাক।
গৌর সেদিন তার রেনকোটটা হারিয়ে এসেছিল। হারিয়েছিল মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের চ্যারিটি ম্যাচের খেলা দেখতে গিয়ে। মোহনবাগান এক গোল দিতেই উদ্বাহু হয়ে সে নৃত্য শুরু করেছিল, শিশিরের দিকে ক্ষণে ক্ষণে বিদ্ধপবাণ হানতে হানতে। ইস্টবেঙ্গল কয়েক মিনিট বাদেই সে-গোল শোধ করে দিতেই শিশিরের অসভ্যতায় বিরক্ত হয়ে অন্য জায়গায় সরে বসেছিল। শিশিরের সত্যিই বাড়াবাড়ি। ইস্টবেঙ্গল না হয় কেঁদে ককিয়ে একটা গোল শোধ করেই ফেলেছে, তাতে অমন হাত-পা ছোঁড়বার আর গাঁক-গাঁক করে চেঁচাবার কী আছে!
