কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম, বড্ড পরিশ্রম হয়েছে, না? একটু জিরিয়ে নিন! কেন যে মিছিমিছি ছোটাছুটিটা করলেন?
বিরাট থাবার মতো হাত দিয়ে খপ করে আমার হাতটা ধরে ফেলে প্রাণপণে টানবার চেষ্টা করে তিনি হিংস্র উল্লাসে এবার বলে উঠলেন, এইবার?
তাঁর হাতটাই তাঁর মাথার ওপর টেনে রেখে বললাম, এবার মাথা ঠাণ্ডা করে যা বলছি শুনুন। কাল নয়, আজই আমি চলে যাচ্ছি। কারণ সুড়ঙ্গপথ কাল আর খোলা থাকবে না। গত দুবছর ধরে বছরে মাত্র দুটি দিন ও সুড়ঙ্গপথ শুকনো থাকে। এখুনি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে রওনা হতে না পারলে ওই সুড়ঙ্গে জলের তোড়ে ড়ুবে মরতে হবে।
মিথ্যা কথা! আমার হাতটা হয়রান হয়ে ছেড়ে দিয়ে বোথা গর্জে উঠলেন, তুই! তুই এসবের কী জানিস?
আমি কিছু জানি না। তবে ড. সাপিরো দুবছরে যা জেনেছেন তা-ই বলছি!
ড. সাপিরা! বোথার ফ্যাকাশে মুখ এবার দেখবার মতো।
হ্যাঁ, যাঁর সহকারি হয়ে এসে এখানে সোনার সন্ধান পেয়ে লোভে একেবারে পিশাচ হয়ে উঠেছিলেন।
পকেট থেকে একটা দড়ি বার করে আচমকা বোথার হাত দুটো ধরে ফেলে পিছমোড়া করে বাঁধতে বাঁধতে তারপর বললাম, যাঁকে এমনই করে পিছোড়া করে বেঁধে রেখে সোনার নমুনা নিয়ে একা সুড়ঙ্গপথে পালিয়ে গেছলেন।
কে? কে এসব কথা বলেছে? বোথার গলায় আর যেন তেজ নেই। হাতের বাঁধন খোলবার চেষ্টা করতেও তিনি ভুলে গেছেন।
কে আর বলতে পারে। ড, সাপিরো ছাড়া! হেসে বললাম, আপনার সঙ্গে দেখা হবার আগের দিনই ওই মথ-এর খবর পেয়ে তাঁকে আমি এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে গেছি। তারপর আপনার জন্যই তাঁবু পেতে অপেক্ষা করছিলাম।
আমার জন্য?
হ্যাঁ, আপনি যে সোনার নমুনা নিয়ে দেশে গিয়েছিলেন যাচাই করাতে, তারপর এই কুবেরের ভাণ্ডার ঠিকমতো চিনতে না পেরে এক বছর যে এই অঞ্চলে পাগলের মতো ঘোরাঘুরি করেছেন, সবই আমার জানা। আমার ওপর সন্দিগ্ধ নজর রেখে আমায় একবার বাজিয়ে নিতে আপনি আসবেনই আমি জানতাম। তাই অপেক্ষা করে ছিলাম ড. সাপিয়োকে যা করেছেন তার উপযুক্ত শাস্তি আপনাকে দেবার জন্যে। তবে শাস্তি আর এমন কী! যে সোনার জন্য আপনি সব করতে পারেন, সেই সোনার রাজ্যেই আপনাকে রেখে গেলাম। আশ মিটিয়ে এখন বালি কাঁকর হেঁকে সোনা বার করুন। পিছমোড়া করে যে বাঁধন দিয়েছি ওই ওখানকার পাথরের ধারে ঘণ্টা দুয়েক ঘসলেই সেটা ছিঁড়ে যাবে। ততক্ষণে আমি অবশ্য সুড়ঙ্গপথে অনেক দূর চলে গেছি! আপনার কিন্তু বেরুবার আর তখন সময় থাকবে না।
কথাগুলো বলে চলে যাবার জন্য পা বাড়াতেই বোথা হাঁকুপাকু করে কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়ে প্রায় ককিয়ে উঠলেন, কিন্তু আমার ডায়েরি নেই। হিসেবে ভুল হলে এক বছর বাদে আমি বার হব কী করে?
বার হবেন না। আর এক বছর না হয় এইখানেই থাকবেন। ড. সাপিরো দু বছর এইখানে কাটিয়েছেন আপনারই শয়তানিতে।
না, না, বোথা যেন ড়ুকরে উঠলেন, আমি সোনা চাই না, কিছু চাই না, আমায়। শুধু এখান থেকে বেরুতে দাও।
বেশ, বেরুতেই পারবেন। আমি হেসে বললাম, কিন্তু এক বছরের আগে তো হয় না। ও শাস্তি আপনার পাওনা। এক বছর বাদেই যাতে বার হতে পারেন তার ব্যবস্থা করছি।
কী ব্যবস্থা? বোথা হতাশভাবে জিজ্ঞাসা করলেন।
এই ছাতাটা দেখছেন? ছাতাটা খুলে ধরে বললাম, আর ওই পাহাড়ের দেওয়ালের পুব দিকের মাথাটা দেখুন।
আমি যেন তাঁর সঙ্গে নির্মম পরিহাস করছি এইভাবে বোথা একবার ছাতাটা আর একবার পাহাড়ের মাথার দিকে চাইলেন।
হেসে আবার বললাম, ভয় নেই, আপনার সঙ্গে ঠাট্টা করছি না। এ পাহাড়ের ভেতর দিকটা এমন খাড়া যে ওঠা অসাধ্য, কিন্তু বাইরের দিকটা ঢালু। সেখান দিয়ে উঠে ওই পুব দিকের মাথা থেকে এই খোলা ছাতাটা নীচে ফেলব। সেই ছাতায় বাঁধা থাকবে বছর হিসেব করবার নির্ভুল জ্যান্ত ঘড়ি।
বছর হিসেব করবার জ্যান্ত ঘড়ি! বোথা হতভম্ব।
হ্যাঁ, লিম্যাক্স ফ্ল্যাভাস-খোলসহীন এক জাতের শামুক। পৃথিবীতে প্রলয় হতে পারে, তবু ওই প্রাণীটি বছরে একবার ঠিক পয়লা কি দোসরা আগস্ট ডিম পাড়বেই। ছাতা থেকে খুলে নিয়ে ওই শামুকের ওপর নজর রাখবেন। তারিখ ভুল আর হবে না।
বোথা যত বড় শয়তানই হোক, তাকে যা কথা দিয়েছিলাম তা রেখেছিলাম। কুড়ি বছর আগে পাহাড়ের চূড়া থেকে লিম্যাক্স ফ্ল্যাভাস বেঁধে সেই যে নিজের ছাতাটা মরা আগ্নেয়গিরির তলায় ফেলে দিয়েছিলাম তারপর আর ছাতা কিনিনি।
কথা শেষ করেই ঘনাদা শিশিরের সিগারেটের টিনটা অন্যমনস্কভাবে হাতে নিয়ে বারান্দার দিকে পা বাড়ালেন।
চাকী ফাঁক পেয়ে পেছন থেকে চিৎকার করে উঠল, নিজের তো নেই, আজ কার ছাতা তাহলে দান করে এলেন শুনি?
জানি না। ঘনাদা তেতলার সিঁড়িতে উঠতে উঠতে বলে গেলেন।
তারপর হুলুস্থুল ব্যাপার। চাকী সঙ্গে সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে আর্তনাদ করে উঠল, আমার ছাতা! আমার ছাতা এখানে শুকোতে দিয়েছিলাম!
সবাই মিলে তাকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে গেলাম।
ওঃ, আপনার ছাতাটাই গেছে বুঝি? কার যে কখন কী যাবে কিছু ঠিক নেই। এখানে।
তার মানে?চাকী চিড়বিড়িয়ে উঠল, যে যারটা যখন খুশি নিয়ে যাবে! আবার দান করেও আসবে!
দুঃখের সঙ্গে জানালাম, এ মেসে ও-ই নিয়ম!
চাকী দুমাসের অগ্রিম টাকা রিফান্ড নিয়ে মেস ছেড়ে গেছে।
জল
কীসে যে কী হয় কিছুই বলা যায় না।
