কিন্তু, চাকীকে মুখিয়ে থাকতে দেখেও গৌর আমাদের সকলের হয়ে প্রশ্নটা করেই ফেলল, ওই বোম্বে মেরি না কী বললেন, ওই মথ ড. সাপিরোর পোষা বুঝি?
বোম্বে মেরি নয়, বম্বি মোরি। আর পোষা-টোষা কেন হবে! ঘনাদা ধৈর্য ধরেই বোঝালেন, মেয়ে-মথের গায়ে এমন একটা গন্ধ থাকে পুরুষ-মথ সাত মাইল দূর থেকেও যা পেয়ে ছুটে আসে। ওই কাঁচের বাটিতে মেয়ে-মথের সেই গন্ধ জমানো ছিল। ও-গন্ধ এমন যে তার একটি অণু-ই ঠিক বিশেষ জাতের পুরুষ-মথকে টেনে আনবে। ড. সাপিয়রা আমায় তাঁর শেষ পার্সেলে এই রেশমি মথের গন্ধ-জমানো আঁটা শিশি পাঠিয়ে চিঠিতে তার ব্যবহার লিখে জানিয়েছিলেন। সুমাত্রায় জংলিদের হাতে কোথাও বন্দী হবার ভয়ই তাঁর ছিল। তাই কোথায় আছেন জানাবার এমন ফন্দি তিনি করেছিলেন যা জংলিরা ধরতে পারবে না। বছরখানেক তাঁর খবর না পেলে ওই গন্ধসার নিয়ে সুমাত্রায় তিনি আমায় খুঁজে দেখতে অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর নিজের সঙ্গে সেই জন্য শুধু রেশমি পোকার গুটি নিয়েছিলেন বেশি করে, যা ফেটে ওই বম্বিস্ মোরি বার হবে।
বোম্বাই বাহাদুরি তো খুব শুনলাম, এখন আমার—ঘনাদা একটু থামতেই চোখ মুখ পাকিয়ে চাকী তাঁকে চেপে ধরবার চেষ্টা করলে।
কিন্তু তার কথা আর শেষ করতে হল না।
তারপর সেই পাহাড়ও পেলাম, সেই সুড়ঙ্গপথও—ঘনাদা গলার জোরেই চাকীকে চেপে দিয়ে শুরু করলেন, জলের শুধু একটু ঝিরঝিরে ধারা তলায় থাকলেও সে আঁকাবাঁকা সুড়ঙ্গপথ যেমন অন্ধকার তেমনই পেছল। কোনও রকমে পা টিপে টিপে দেওয়াল হাতড়াতে হাতড়াতে সে সুড়ঙ্গ পার হতেই এক দিন এক রাত লেগে গেল। অন্ধকারে ওইরকম সুড়ঙ্গে বেশিক্ষণ থাকলে মানুষের মেজাজ বোধ হয় বিগড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। বোথার সঙ্গে অন্ধকারে একবার ঠোকাঠুকি হওয়ার পর তিনি তো খিঁচিয়েই উঠলেন, একটা টর্চ সঙ্গে নিতে পারলেন না। তার বদলে কী সব ছাতা পুঁটলি আজেবাজে জিনিস নিয়ে চলেছেন।
টর্চ তো আপনিও নিতে পারতেন!অন্ধকারে অদৃশ্য বোথার উদ্দেশেই ঝাঁঝিয়ে বললাম, পথ হারিয়ে তো সেদিন আমার তাঁবুতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, সঙ্গের মালপত্র সব খোয়া গেছে। কিন্তু ওই কী সব সসপ্যান ঝাঁঝরি হাতা গোছের সরঞ্জাম তো ঠিক সঙ্গে আছে দেখছি। ওখানে যজ্ঞির রান্না রাঁধবেন নাকি?
সুড়ঙ্গপথে বোথার একটু মেজাজই শুধু দেখেছিলাম। সেখান থেকে ভেতরে গিয়ে পৌঁছোবার পর তাঁর একেবারে মারমূর্তি।
অপরাধের মধ্যে আমি শুধু বলেছিলাম, আপনি তো এখন ড. সাপিয়োর খোঁজেই ঘুরবেন, আমি তাহলে সোনাদানা যা পাই ততদিনে বাগিয়ে ফেলি।
সোনাদানা! বোথা প্রথমে চমকে উঠে কেমন হতভম্ব হয়ে গেলেন।
বললাম, হ্যাঁ, কুবেরের গুপ্ত ভাঁড়ারের মতো এখানে যে সোনার ছড়াছড়ি মনে হচ্ছে। বালি কাঁকর চালাচালি করে যা বার করবার জন্যে ওই সব প্যান-ট্যান অত কষ্ট করে বয়ে এনেছেন। ওগুলো আমাকেই দিয়ে যান।
তোকে দিয়ে যাব! মরা আগ্নেয়গিরি যেন বোথার ভেতর দিয়েই জ্বলে উঠল, কালা গুবরে পোকা! তোকে দেবার জন্যই এগুলো বয়ে এনেছি।
বাঃ, আমায় দেবেন না! আমি যেন কাঁদো কাঁদোআমি তাহলে কী করতে এখানে এলাম?
শোন তাহলে, আরশোলা, তোকে সঙ্গে এনেছি অন্তত বছর-ভোর এখানে কয়েদ রাখতে। কালই এখান থেকে পালাবার শেষ দিন। আজই না পারি, সোনা জোগাড় করে কাল আমি তোকে ফেলে চলে যাব। বছরভোর যদি টিকে থাকিস আর দিন গুনতে ভুল না করিস, তাহলে আর বছরে আবার এখান থেকে বেরুতে পারবি। ততদিনে এ জায়গায় সোনা তোলবার দখল আমি সুমাত্রার সরকারের কাছে পাকা করে ফেলেছি। তোর জন্যই এ-পাহাড়টা চিনতে পেরেছি বলে তোকে এই প্রাণে বাঁচবার সুবিধেটুকু দিলাম, নইলে তোর মতো ছারপোকাকে এখানে টিপে মেরে যাওয়াই আমার উচিত ছিল।
খুব মন দিয়ে কথাগুলো শুনে কাতর ভাবে বললাম, কিন্তু আমি যে আপনাকেই এখানে এক বছর বন্দী রাখবার ফন্দি এঁটে এলাম। রিখ দেওয়া আপনার ডায়েরিটা সরিয়ে ফেললাম যাতে দিনের হিসেব রাখতে আপনার অসুবিধে হয়..
তুই! তুই আমার ডায়েরি চুরি করেছিস! বোথার মুখ দিয়ে তখন ফেনা উঠছে।
নিজের ঝোলাটা পাগলের মতো খুঁজতে খুঁজতে সে বললে, ডায়েরি যদি না পাই তাহলে তোর হাত-পা আমি একটা একটা করে ছিঁড়ব, তোকে পা বেঁধে ওপর থেকে ঝুলিয়ে আগুনে ঝলসাব। কালা কেন্নো, তোকে…
আহা, সামলে সামলে! বোথাকে ঠাণ্ডা করবার চেষ্টা করলাম, এক বছর এখানে থেকে আরও সব ভাল ভাল শাস্তি কল্পনা করবার অঢেল সময় পাবেন। তারপর বেরিয়ে এসে আমায় খবর দেবেন। তখন আপনার সঙ্গে না হয় আপনার দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন কি জোহান্নেসবার্গে যাব। অন্য কোথাও কালা আদমির ওপর এ এমন সুবিচার করবার সুবিধে তো আর পাবেন না। আপনি যে আসল ওলন্দাজ নন, দক্ষিণ আফ্রিকার–
বোথার ঝোলা খোঁজা তখন শেষ হয়েছে।
আমার ডায়েরি তুই-তুই বলে রাগে তোতলাতে তোতলাতে তিনি খ্যাপা হাতির মতো আমার দিকে তেড়ে এলেন।
আরে! আরে মারবেন নাকি! বলে ছুটে খানিকটা নীচে নেমে গেলাম। তারপর চলল শিকার আর শিকারীর খেলা। তিনি আমাকে ধরার জন্যে তেড়ে আসেন, আমি একটু ছুটে পালাই বা চট করে সরে গিয়ে তাকে পাশ কাটাই।
হাতের কাছে পেয়েও ধরতে না পেরে বোথা তখন রাগে উন্মাদ হয়ে গেছে। কিন্তু উন্মাদের দম আর কতক্ষণ থাকে। বিশাল শরীর নিয়ে আমার পেছনে ছুটে ছুটে ঘণ্টাখানেক বাদে হাপরের মতো হাঁফাতে হাঁফাতে তিনি ক্লান্তিতেই লুটিয়ে পড়লেন।
