ওরাং পেণ্ডেক জীবিত কি মৃত একটা পেলে বিজ্ঞানের জগতে হুলুস্থুল পড়ে যাবে সত্যি, কিন্তু যে-অঞ্চলে ও-প্রাণীটিকে পাওয়া সম্ভব সেখানে প্রাণ হাতে নিয়ে ছাড়া তখন যাওয়া যেত না। বিশ-বাইশ বছর আগের কথা। ওলন্দাজেরা তখনও সুমাত্রার রাজা। বুকিত বরিসান, অর্থাৎ সুমাত্রার পর্বতমালার কাছাকাছি অধিকাংশ জায়গাই, তখন দুর্গম বিপদসংকুল। বাঘ হাতি গণ্ডার সাপ তো আছেই। তারপর দুর্দান্ত সব জংলি জাত, যাদের হাতে বিদেশি কারুর নিস্তার নেই।
আমার ও-অঞ্চলে যাবার বছরখানেক আগেই বিখ্যাত নৃতাত্ত্বিক ড. সাপিয়রা ওই অঞ্চলেই নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তিনি ওরাং পেণ্ডেক খুঁজতে ওখানে গেছলেন কি না কেউ জানে না, তবে সেই মহাযুদ্ধের সময়েও ইউরোপের বৈজ্ঞানিক মহলে তাঁর এই অন্তর্ধান নিয়ে বেশ একটু সাড়া পড়েছিল। রথ দেখার সঙ্গে কলা বেচার মতো আমার সুমাত্রার যাওয়ার পেছনে ওরাং পেণ্ডেক খোঁজার সঙ্গে ড. সাপিরোর সন্ধান করার অগিদও ছিল। তার কারণ এই অভিযানে যাবার আগে ড. সাপিয়রা আমায় গোপনে একটি পার্সেল পাঠিয়ে এমন একটি চিঠি লিখেছিলেন যা অগ্রাহা করা আমার পক্ষে অসম্ভব।
নানা জায়গায় খোঁজ করতে করতে তখন রাকান নদী যেখান থেকে বেরিয়েছে সেই পাহাড়ি জঙ্গলে ক-দিনের জন্যে ডেরা বেঁধে আছি। সঙ্গে শুধু তাঁবু বইবার দুজন গায়ো অনুচর। শ্রাবণ মাসের প্রায় মাঝামাঝি। সুমাত্রায় সর্বত্রই সারা বছর যেমন বৃষ্টি আর তেমনই গরম। এই অঞ্চলে শুধু এই সময় মাস দুয়েক গরম থাকলেও বৃষ্টি থাকে না।
রাত তখন বেশি নয়। আলো নিবিয়ে তাঁবুর বাইরে বসে জোনাকির বাহার দেখছি। সুমাত্রার এই জোনাকির তুলনা নেই। রাত্রের আকাশে ঝাঁক বেঁধে তারা যেন রাশি রাশি উড়ন্ত ফুলঝুরি ছড়িয়ে ছড়িয়ে যায়।
হঠাৎ পেছনে দড়ি-দড়া ছিঁড়ে তাঁবুর ওপর কী একটা পড়ে যাবার শব্দ পেলাম।
চমকে উঠে দাঁড়ালাম। সুমাত্রার দু-শিঙওয়ালা গণ্ডারই তাঁবুর ওপর পড়ল নাকি!
টর্চটা জ্বেলে দেখলাম, গণ্ডার নয়, তবে প্রায় সেই রকমই বিশাল যা চেহারার একটি মানুষ! এদেশি কেউ নয়। সাদা চামড়ার সাহেব।
আমার টর্চের আলোয় অত্যন্ত অপরাধীর মতো কুণ্ঠিতভাবে হেঁড়া তাঁবুর ওপর থেকে দাঁড়িয়ে উঠে তিনি বললেন, মাপ করবেন। আপনার তাঁবুটা বোধহয় ছিঁড়ে ফেলেছি।
তা বেশ করেছেন! কিন্তু আপনি কে, আর এখানে আমার তাঁবুর ওপর কী করে ঝাঁপ দিয়ে পড়লেন জানতে পারি?
আমার নাম বোথা, ভদ্রলোক আমতা আমতা করে জানালেন, আমি ড. সাপিয়োর খোঁজে…
ড. সাপিয়োর খোঁজে! দাঁড়ান। দাঁড়ান! বলে তাঁকে থামিয়ে আমি অনুচরদের ডেকে তাঁবুটা আবার খাটিয়ে আলো জ্বালার হুকুম দিলাম।
তাঁবু আবার খাড়া করে আলো জ্বেলে বোথার সমস্ত বিবরণই তারপর শুনলাম। বোথা আমার মতোই ড. সাপিয়োর খোঁজ করতে এই অঞ্চলের বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বললেন। মজার কথা এই যে, ড. সাপিরোর সঙ্গে তাঁর সহকারি হিসেবেই এ-অঞ্চলে তিনি এসেছিলেন। তারপর এক জায়গা থেকে চলে আসবার সময় দুজনের ছাড়াছাড়ি হয়। সেই থেকে ড. সাপিরোকে বোথা আর দেখেননি। ড. সাপিরোও হয়তো বোথাকে খুঁজে না পেয়ে একা একাই ইউরোপে ফিরে গেছেন মনে করে বোথা তাঁর দেশে ফিরে যান। কিন্তু সেখানে অনেকদিন অপেক্ষা করেও ড. সাপিয়োকে ফিরতে না দেখে আবার সুমাত্রায় এসেছেন খোঁজ করতে।
কিন্তু ড. সাপিয়োর সঙ্গে যেখানে আপনার ছাড়াছাড়ি হয় সে জায়গাটা খুঁজে দেখেছেন তো? আমি একটু অধৈর্যের সঙ্গেই জিজ্ঞাসা করলাম।
সে জায়গাটা পেলে তো খুঁজে দেখব। বোথা অসহায় ভাবে জানালেন।
তার মানে?
তার মানে সেটা সাধারণ কোনও জায়গা নয়, একটা মরা আগ্নেয়গিরির এমন একটা বিরাট গভীর গহ্বর ভেতর থেকে যার চারদিকের খাড়া পাহাড়ে ওঠা মানুষের অসাধ্য! বাইরে থেকে মাথা পর্যন্ত ওঠা গেলেও সেখান থেকে খাড়া ন হাজার ফুট নামা অসম্ভব। বছরের মাত্র ক-টি দিন একটা সংকীর্ণ আঁকাবাঁকা সুড়ঙ্গপথে সেখানে যাওয়া-আসা যায়।
বছরের মাত্র কটা দিন কেন?
কারণ সেটা একটা পাহাড়ি ঝরনার উৎসমুখ। সারা বছর সেখান দিয়ে প্রচণ্ড বেগে জলের ধারা বেরিয়ে আসে। আগস্ট মাসের প্রথম ক-টি দিন মাত্র সে সুড়ঙ্গপথ শুকনো থাকে।
আগস্টের তো আর দেরি নেই। এখনও সুড়ঙ্গপথ আপনি খুঁজে পাননি?
সে-পাহাড়টা না পেলে সুড়ঙ্গটা খুঁজব কী করে! বোথা হতাশ ভাবে বললেন, এখানে সমস্ত বুকিত বরিসনেই ও-রকম বহু মরা আগ্নেয়গিরি আছে বাইরে থেকে যা দেখতে একরকম। কোথায় কোনটা দিয়ে বেরিয়েছি তখন তাড়াহুড়োতে কি অত খেয়াল করেছি! ড. সাপিয়ো যে তার ভেতরে আটকে থাকতে পারেন তা-ও ভাবিনি। অবশ্য ড. সাপিয়রা সেখানেই আছেন কি না এখনও জানি না।
একটু হেসে বললাম, আপনার ভাবনা নেই। তিনি সেখানেই আটকে আছেন। আজই খবর পেয়েছি।
খবর পেয়েছেন! বোথা হতভম্ব হয়ে বললেন, কিন্তু তাঁর সঙ্গে রেডিয়ো-টেডিয়ো কিছু তো নেই!
রেডিয়োর চেয়ে নিশ্চিত খবরই তিনি পাঠিয়েছেন। ওই তাঁর খবর এল আবার।
বাতিটার কাছেই রাখা একটা ছোট কাঁচের বাটির ওপরে দুটো মথ পোকা ঘুর ঘুর করে পাখা নাড়ছিল। তারই একটা ধরে বোথাকে দেখালাম।
একবার মথটার আর একবার আমার মুখের দিকে যেভাবে বোথা তাকালেন, তাতে বুঝলাম, আমার মাথা কতখানি খারাপ, তিনি আন্দাজ করবার চেষ্টা করছেন।
হেসে তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বললাম, এটা কী মথ জানেন? রেশম যারা তৈরি করে সেই বম্বি মোরির চিনে শাখা। সুমাত্রার এই জঙ্গলে ও-মথ কোথাও নেই। সুতরাং নিশ্চিন্ত থাকুন। ড. সাপিয়রা যেখানে বন্দী সে-পাহাড় কাছেই আছে নিশ্চয়। কালই তা খুঁজে বার করব।
