চাপা রাগে তোতলা হয়ে যাবার ভয়ে যখন একথার জবাব দিতে দ্বিধা করছি ঠিক সেই মুহূর্তে নীচের সিঁড়িতে ও কার পায়ের আওয়াজ?
হ্যাঁ, ঘনাদারই! ঘনাদার পায়ের আওয়াজ নীচে থেকে বারান্দায় এসে থামল।
তারপর? সে আওয়াজ কি আবার তেতলার দিকেই উঠবে?
না, ঘনাদা সশরীরে ঘরের ভেতরেই ঢুকলেন। কিন্তু এবার? শ্রীমান সুশীল চাকীকে কোনও মন্তর পড়ে যদি অদৃশ্য করে দিতে পারতাম!
কিন্তু তার দরকার হল না। এ আরেক ঘনাদা যেন! সুশীল চাকীর মতো তুচ্ছ। একটা মশা কি মাছি যাঁর নজরেই পড়ে না।
ঘরে ঢুকে তাঁর আরাম-কেদারাটিতে নিজে থেকে বিনা অনুরোধে গা এলিয়ে দিয়ে বললেন, একটু ভিজে গেলাম হে!
ঘনাদার জামাকাপড়ে জলের ছিটেফোঁটা থাক বা না থাক, আমরা শশব্যস্ত হয়ে উঠলাম।
অ্যাঁ! ভিজে গেলেন!
ঠাকুর, শিগগির গরম গরম চা এক কেটলি।
একটা অ্যাসপিরিন খেয়ে নেবেন?
শিশিরের বাড়িয়ে ধরা টিন থেকে সিগারেট তুলে নিতে নিতে ঘনাদা আমাদের আপ্যায়নে খুশি হয়ে কী বলতে যাচ্ছেন এমন সময়ে আবার সুশীলের সেই ভিমরুলের হুল!
একটা অ্যাম্বুলেন্স ডাকলে হত না? আপনার জন্যেই ডাকাতে বোধ হয় হবে! বলতে পারলে খুশি হতাম। তার বদলে অতিকষ্টে নিজেকে সামলে বললাম, অ্যাম্বুলেন্স? কেন?
বাঃ, বৃষ্টিতে এ রকম ভিজলে হাসপাতাল ছাড়া গতি আছে! হাড় জ্বালানো সেই বাঁকা হাসির সঙ্গে সুশীল চাকী সহানুভূতি জানালে, কী গেরো এখন দেখুন তো! শুধু একটা ছাতা যদি নিতেন!
নিয়েছিলাম। একজনকে দান করতে হল।
আমরা সবিস্ময়ে ঘনাদার দিকে তাকালাম। না, স্বপ্ন নয় সত্যি? ঘনাদা খেপে উঠে। তেতলায় রওনা হননি। নির্বিকার ভাবে সুশীল চাকীর কথার জবাব দিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছাড়ছেন!
ছাতা আপনি দান করে এলেন! সুশীলের দাঁতে তখনও বিষ আহা কী দয়ার শরীর! নিজের ছাতা পরকে দিয়ে ভিজে আসা..
নিজের ছাতা নয়।ঘনাদার সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদে সুশীলের সঙ্গে আমরাও হতভম্ব।
নিজের ছাতা নয়, মানে? এবার সুশীলের গলায় বিষের চেয়ে বিস্ময়ই বেশি, সেই সঙ্গে কেমন একটু সন্দিগ্ধ ভাব।
মানে নিজের ছাতা আমার নেই। বুকিত বরিসানের সিংগালান টাণ্ডিকাট থেকে বিশ বছর আগে একটা লিম্যাক্স ফ্ল্যাভাস বেঁধে ফেলে দেবার পর আর ছাতা কিনিনি।
সুশীল ভ্যাবাচাকা খেয়ে যতক্ষণে মুখের হাঁ বন্ধ করেছে তার আগেই আমরা ঘনাদাকে ঘিরে বসে গেছি।
ছাতাটা তাহলে ফেলে দিতেই হল? গৌর উসকে দেবার ত্রুটি করলে না।
সিগন্যাল ডাউন না কী বললেন! শিশির বোকা সাজল ঘনাদার উৎসাহ বাড়াতে, তাই রেলের লাইনেই ফেলতে হল বুঝি ছাতাটা?
রেলের লাইন নয়, সিংগালান টাণ্ডিকাট! ঘনাদা করুণাভরে সকলের দিকে চেয়ে বললেন, সুমাত্রার একপেশে শিরদাঁড়ার মতো যে-পর্বতমালার নাম বুকিত বরিসান তারই এক বিশাল আগ্নেয়গিরির চুড়ো।
ওঃ, আগ্নেয়গিরি! শিবু এতক্ষণে বুঝদারের ভঙ্গিতে বললে, ওই ছাতা ফেলেই আগ্নেয়গিরির আগুন নিবিয়ে ফেললেন বুঝি??
অন্য দিন হলে এরকম বেয়াদবিতে সব ভেস্তে যেত। কিন্তু ঘনাদা তখন একেবারে মাটির মানুষ।
স্নেহের হাসি হেসে বললেন, না, আগুন নেবাবার দরকার ছিল না। সেটা মরা আগ্নেয়গিরি। ছাতা ফেলেছিলাম…
এতক্ষণে জিভের সাড় ফিরে পেয়ে শ্রীমান চাকী কড়া গলায় জানতে চাইলে, তার আগে একটা কথা বলুন দিকি..
ছাতায় কী যেন একটা বেঁধেছিলেন বললেন? সুশীল চাকীর কথাটাকে তাড়াতাড়ি চাপা দিলাম!
লিম্যাক্স ফ্ল্যাভাস! ঘনাদা যেন চাকীকেই উদ্দেশ করে ওই বিদঘুটে শব্দের পটকাটি ছাড়লেন।
প্রথমে চমকে উঠে চাকী তারপর মুখ চোখ লাল করে বললে, আমায় যদি কিছু বলবার থাকে তো বাংলায় বলবেন।
ওর বাংলা হয় না। ঘনাদার নির্বিকার জবাব, খোলসহীন এক জাতের শামুক দেখেছ কখনও? ভিজে স্যাঁতসেঁতে জায়গায় বড় পাথর কি কাটা গাছের গুঁড়ির তলায় থাকে। ও হল সেই বস্তু। ।
যে বস্তুই হোক ও-সব প্রাণিতত্ত্বের বিদ্যে আপনার কাছে শিখতে আসিনি। আমি জানতে চাই…
চাকীর কথাটাকে আবার চটপট সাইড লাইনে শানটিং করে দিতে হল। ব্যস্ত হয়ে উজবুকের মতো জিজ্ঞাসা করলাম, ওখানে ওইরকম ছাতায় শামুক বেঁধে ফেলতেই বুঝি গেছলেন?
না, গেছলাম ওরাং পেকে খুঁজতে!
চাকী কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঘনাদা তাকে আর সে সুযোগ দিলেন না। আমাদের প্রশ্নটা নিজেই অনুমান করে নিয়ে বলে চললেন, ওরাংওটাং-এর নাম শুনেছ, চিড়িয়াখানাতে দেখেও থাকবে। ওরাংওটাং ওই সুমাত্রা আর বোর্নিও ছাড়া কোথাও পাওয়া যায় না। পৃথিবীতে এখনও যে-চার জাতের এপ বা নরবানর আছে, তার দুটির বাস আফ্রিকায় আর দুটির যাকে ইন্দোনেশিয়া বলে সেই সুদূর দক্ষিণ-পূর্ব প্রাচ্যে। আফ্রিকায় পাওয়া যায় শিম্পাজি আর গোরিলা, আর এই ইন্দোনেশিয়ায় ওরাংওটাং আর গিবন বা উকু। এ চারটি ছাড়া আর কোনও জীবন্ত এপ পৃথিবীতে এখনও পাওয়া যায়নি। কিন্তু অনেক বৈজ্ঞানিকের ধারণা মানুষের এপ জাতীয় অন্য সুদুর জ্ঞাতি এখনও পৃথিবীর কোথাও না কোথাও লুকিয়ে আছে। যেমন আমাদের হিমালয়ের দুর্গম তুষার রাজ্যে ইয়েতি আর সুমাত্রার গহন পাহাড়ি জঙ্গলে ওরাং পেন্ডেক।
ইয়েতির মতো ওরাং পেণ্ডেকও প্রাণী হিসেবে প্রায় লুপ্ত হয়ে এসেছে। জ্যান্ত বা মরা একটা নমুনা কেউ এখনও পায়নি, কিন্তু তারা যে এখনও আছে তার প্রমাণ অজস্র। সুমাত্রার গায়ো, লামপঙ, জাম্বি প্রভৃতি জংলি জাতিদের কাছে ওরাং পেণ্ডেকের বর্ণনা এখনও শোনা যায়। একশো বছর আগেও সুমাত্রার তখনকার প্রভু ওলন্দাজেরা অনেকে এ প্রাণী চাক্ষুষ দেখেছেন বলেছেন।
