খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই উঠতে যাচ্ছি এমন সময় ছাদের কড়িকাঠগুলোকেই যেন উদ্দেশ করে সে বললে, আমার কাছে ভাল চূরণ আছে। একেবারে লকড়ি হজম পখর হজম। কারুর দরকার হলে দিতে পারি।
দরকার কারুর অবশ্য হল না, কিন্তু তাঁর তেতলার ঘরে উঠবার সিঁড়িতে ঘনাদার বিদ্যাসাগরি চটির যেরকম আওয়াজ শুনলাম, তাতেই বোঝা গেল আমাদের শনি-রবির আসরের দফারফা।
শুধু সেই শনি-রবিই নয়, সেই থেকে সব কটা ছুটির দিনই আমাদের মাঠে মারা যাচ্ছে।
তোড়জোড় করে ঘনাদাকে তাঁর মৌরসি আরামকেদারায় যদি বা কোনও দিন এনে বসাই, শিশিরের সাগ্রহে ধরিয়ে দেওয়া সিগারেটের দুটো টান দিয়েই তিনি উঠে পড়েন।
কারণটা পিছন ফিরেই দেখতে পাই। শ্রীমান সুশীল চাকী ঠোঁটের সেই বাঁকা হাসিটি নিয়ে আমাদের আড্ডা ঘরে ঢুকছে।
উঠছেন কেন ঘনাদা? আমাদের কারুর না কারুর গলা থেকে আর্তনাদ বেরোয়।
ঘনাদার হয়ে সুশীল চাকীই মিছরির ছুরির মতো গলায় জবাব দেয়, আলজিরিয়া কি আইসল্যান্ড যেতে হবে বোধহয়!
আমরা যোবা হয়ে যাই রাগে দুঃখে মনের জ্বালায়।
ঘনাদা সুশীলের দিকে একবার অগ্নিদৃষ্টি হেনে সোজা তাঁর তেতলার ঘরে গিয়ে উঠেন।
এরপর তাঁর ধারে কাছে ঘেঁসে কার এত বড় বুকের পাটা।
এমনই করেই দিন যাচ্ছে। সুশীল চাকী যেন সত্যিকার শনি হয়েই বাহাত্তর নম্বরে ঢুকেছে। সে এ মেসে থাকতে ঘনাদাকে নিয়ে জমিয়ে বসবার আর কোনও আশা নেই।
শনিই তোক আর যা-ই হোক, নিজে থেকে মেস না ছাড়লে মেরে ধরে তো আর তাড়ানো যায় না। আমরা তাই হাল ছেড়ে দিয়ে মেস তুলে দেব কি না তা-ই ভাবতে শুরু করেছি।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা এই রকম মনমরা হয়েই আড্ডা ঘরে নেহাত আর কিছু করবার নেই বলে লুডো খেলতে বসেছিলাম। লুডো অবশ্য নামে। কার পাকা খুঁটি কে কেটে দিল তাতে ক্ষেপও নেই।
আসলে আমাদের মন পড়ে আছে তেতলার সিঁড়িতে। হতভাগা সুশীল চাকী এখনও মূর্তিমান অভিশাপের মতো দেখা দেয়নি। ঘনাদাও নামেননি তাঁর তেতলার টঙ থেকে।
সারাদিন কখনও ঝিরঝির কখনও মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। এমন একটা অপরূপ বাদলার সন্ধ্যায় সুশীল চাকী যদি বাইরে কোথাও ট্রাম বাস বন্ধ হয়ে আটকে পড়ে আর ঘনাদা যদি দৈবাৎ নেমে আসেন এই ক্ষীণ দুরাশায় এক ধামা মশলা-মুড়ি টেবিলের ওপর ধরে রেখেও আমরা লোভ সামলে আছি।
মনে মনে সবারই এক চিন্তা।
গৌরই মুখ ফুটে সেটা প্রকাশ করে ফেললে, বৃষ্টিটা খুব জোরে পড়ছে, কী বলিস? নির্ঘাত রাস্তাঘাটে জল দাঁড়িয়ছে!
হ্যাঁ, ট্রাম বাস কিছুই চলছে না। শিশির দু ছক্কা পঞ্জা ফেলেও আমার দু-দুটো কাটবার খুঁটিকে অকাতরে রেহাই দিয়ে বললে, একবার বাইরে বেরুলে এখন আর ফেরা অসম্ভব।
শিবু নিজের দান ফেলে গৌরেরই একটা খুঁটি চেলে দিয়ে বললে—সুশীল চাকী তখন বেরিয়ে গেল না ছাতা নিয়ে?
একথার উত্তর না দিয়ে সবাই তখন আমরা কান খাড়া করে ফেলেছি। ঘনাদার চটির আওয়াজই পাওয়া যাচ্ছে না সিড়িতে?
হ্যাঁ, ঘনাদাই তো নামছেন!
চট করে মশলা-মুড়ি এক এক মুঠো মুখে দিয়ে আমরা সুড়োয় যেন তন্ময় হয়ে
গেলাম।
কিন্তু ঘনাদার পায়ের আওয়াজ নীচে পর্যন্ত নামবার আগেই মশলা-মুড়ির গ্রাস আমাদের গলায় যেন আটকে গেল। ঘনাদার আগেই ভিজে ছাতাটা বারান্দায় শুকোতে দিয়ে ঘরে ঢুকল স্বয়ং সুশীল চাকী।
সেই বাঁকা হাসি নিয়ে টেবিলের কাছে এসে দাঁড়িয়ে পরমানন্দে মুড়ির ধামায় হাত ড়ুবিয়ে বললে, আরে ছোঃ! লুডো খেলছেন আপনারা! এ তো নাবালকের খেলা! গোঁফ কামাবার পর কেউ এ-খেলা খেলে!
ভিজে বেড়ালের মতো যে এ মেসে ঢুকেছিল সেই মুখচোরা সুশীল চাকী যে এক মাসেই মুখফোড় মাতব্বর হয়ে উঠেছে তা বোধ হয় আর বলে বোঝাতে হবে না।
খেলায় যেন তন্ময় হয়ে আমরা তার কথাটা গায়েই মাখলাম না। লুডোর ছকের ওপর ঝুঁকে পড়েও আমরা তখন কান রেখেছি সেই বাইরে। ঘনাদা নামতে নামতে থামলেন টের পেলাম। তারপর আমাদের সব আশা চুরমার করে তাঁর পায়ের শব্দ নীচে নেমে মিলিয়ে গেল।
সুশীল চাকীকে এরপর যদি আমরা চাঁদা করে চাঁটি লাগাতাম খুব অন্যায় হত কি?
কিন্তু তা আর পারলাম কই? তার বদলে মুড়ির ধামাতেই হাত লাগাতে হল। সুশীল যে-রেটে হাত আর মুখ চালাচ্ছে তাতে আমাদের সাহায্য ছাড়াই ধামা খালি হয়ে এল বলে।
তুচ্ছ মুড়ি-মশলার প্রতি আমাদের হঠাৎ এই উৎসাহে সুশীল বেশ একটু ক্ষুণ্ণ। বললে, খেলা ছেড়ে দিলেন যে!
আপনি বসে থাকবেন আর আমরা খেলতে পারি! হাতে এক মুঠো আর গালে এক গ্রাস নিয়ে কোনওরকমে জানালাম।
শুন্যপ্রায় ধামাটা আমাদের চারজনের হাতের নাগাল থেকে চট করে সরিয়ে নিয়ে সুশীল বললে, কেন পারেন না! আমি তো খেলি না। শুধু দেখি!
ওঃ, দেখেন! খেলা শুধু দেখেন আর মশলা-মুড়ি সামনে থাকলে খান! শিশিরের কথাগুলো দাঁতে দাঁতে চিপটে যেন চাবুক হয়ে বেরুল।
সুশীল চাকীর তাতে ভ্রক্ষেপ নেই।
খাওয়া আর হল কই! ধামাটা উবুড় করে তবু অম্লানবদনে সে বললে, দাঁতে একটু সুড়সুড়ি না লাগতেই তো ফুরিয়ে গেল! আর এক ধামা আনান!
আনাচ্ছি। শিবু হাত বাড়িয়ে দিলে, একটা আধুলি ছাড়ুন দেখি?
আধুলি! সুশীল চাকী প্রথমে হেসেই খুন। তারপর বললে, আমার মন্তর কী জানেন? আজ ধার কাল নগদ। ট্রাম ভাড়ার বেশি একটি ফুটো পয়সা নিয়ে কখনও বেরোই না। আর আমি বার করব আধুলি আপনাদের ভূত ভোজন করাবার জন্যে! আপনাদের ওই ঘনাদা যাতে এসে ভাগ বসাতে পারেন!
