ডক্টর ক্যামেরনের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই অবশ্য সেদিনের খবরের কাগজে বড় বড় হরফে সংবাদটা পেলাম। একেবারে প্রথম পাতাতেই দুকলম শিরোনাম দিয়ে খবরটা ছাপানোএকশো বছর বাদে বিলুপ্ত সাগর-ভোঁদড়ের খোঁজ। বি: প্রাণীটির বংশরক্ষায় সরকারি সংরক্ষণ আইন প্রয়োগ।
নিজের অজান্তে যে অন্যায়ের সহায় হয়েছি তার জন্যে মনে মনে আফশোস থাকলেও ওইটুকু সান্ত্বনা মনের মধ্যে নিয়ে ফিরেছি যে পৃথিবীর এই একটি অমূল্য প্রাণী অন্তত মানুষের নির্মমতায় আর লোপ পাবে না।
ঘনাদা চুপ করলেন। মুখে যেটা ফোটাবার চেষ্টা করলেন সেটা নিঃস্বার্থ কর্মবীরের অনাসক্তিই বোধ হয়। শিশিরের সিগারেটের টিনটা কিন্তু তখন তাঁর কোলের কাছ থেকে ফতুয়ার পকেটে ঢুকেছে।
সেই পকেট থেকেই যেন হঠাৎ হাতে ঠেকায় আমাদের সেই খামটি বার করে তিনি খানিকক্ষণ সেটা উলটে পালটে দেখে বেশ অবাক।
এই বোধহয় তোমাদের সেই চিঠি। ঘনাদা বেশ মনমরা ভাবেই বললেন সেটা শিশিরের হাতেই এগিয়ে দিয়ে, চশমা ছাড়া তো আর পড়তে পারব না। ওটা নিয়েই যাও তোমরা।
চিঠি নিয়ে আর আমাদের মাথা তোলবার অবস্থা নেই। সুড়সুড় করে বিনা বাক্যব্যয়ে সবাই নীচে নেমে এলাম।
নেমে এসেই আমাদের আহাম্মকির প্রমাণস্বরূপ চিঠিটা যখন কুচি কুচি করে ছিড়ছি তখন গৌরকে ডিকশনারি পেড়ে নিয়ে বসতে দেখে আমরা অবাক।
কী, ব্যাপার কী? জিজ্ঞাসা করলাম, লিপিতত্ত্বে হার মেনে আবার শব্দতত্ত্ব কেন?
এই যে বলছি! গৌর অভিধানের পাতা উলটে বললে, ঘনাদার চোখের রোগগুলো মনে আছে? প্রেসবাইওপিয়া আর ডাইক্রোম্যাটিক ভিশন। ওগুলোর মানে শুনবে? প্রেসবাইওপিয়া হল চালশে আর ডাইক্রোম্যাটিক দৃষ্টি বলে রংকানদের।
আমাদের হাঁ-করা মুখের ওপর গৌর ডিকশনারিটা বন্ধ করল।
ছাতা
বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের এমন দুর্দিন বুঝি আগে কখনও আসেনি।
কী হয়েছে? কারুর অসুখ-বিসুখ?
বালাই ষাট! বাহাত্তর নম্বরে ওসব জ্বালা নেই! শত্তুরেরও ও-সব যেন না হয়।
তাহলে কি অবস্থা খারাপ? চাকরি-বাকরি সব গেছে? মেস চলছে না?
উহুঁ, সে সব কিছু নয়! ভালমন্দ পাঁচজনের শুভেচ্ছায় হিংসেয় মেসের লক্ষ্মী আমাদের অচলা।
তবে হয়েছেটা কী, যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে তাহলে বলতে হয়, হয়েছে আমাদের আহাম্মকির সাজা!
তাতেও না বুঝলে, আর একটু ব্যাখ্যা করে হিতোপদেশের গল্প বলতে হয়।
সেই যে, কে যেন, কোথায়, কাকে যেন কখন, কীভাবে, কেমন করে…
যাক গে! সে গল্প তো সকলেই জানে। সুতরাং দুবার করে বলার মানে হয় না।
আমাদের দুঃখের কথাই বলি।
সাত নম্বর সিট ভর্তি হওয়া থেকেই আমাদের দুঃসময় শুরু। কী কুক্ষণে যে ওই সিটে নতুন বোর্ডার নেবার কুমতি হয়েছিল!
সাত নম্বর সিট ছিল সেই বিখ্যাত বাপি দত্তের—আমাদের মাস কয়েক যে বিগড়ি হাঁসে অরুচি ধরিয়ে শেষে নিজেই বিগড়ে জন্মের মতো মেস ছেড়ে গেছে। বাপি দত্ত আমাদের বাংলা ভাষায় অনেকগুলো নতুন নতুন গালমন্দ শাপমন্যির শব্দ শিখিয়ে চলে যাবার পর ও সিটটা খালিই পড়ে ছিল অনেকদিন। ভেবেছিলাম যেমন আছে, থাক। বাইরের কাউকে আর আমাদের মধ্যে ঢোকাব না।
কিন্তু নিজেদের কপাল দোষে সেই আহাম্মকিই করে ফেললাম।
যাকে-তাকে হট করে ঢুকতে দিইনি। বলতে গেলে বেশ দেখেশুনে বাজিয়েই বোডার নিয়েছিলাম। বাপি দত্তের মতো গোঁয়ারগগাবিন্দ নয়। চেহারায় কথাবার্তায় বেশ নিরীহ ভালমানুষই মনে হয়েছিল। নামেও যেমন ব্যবহারেও তেমনই সুশীল ভেবেছিলাম।
কিন্তু সেই কেঁচোই যে কেউটে হয়ে দাঁড়াবে কে জানত!
প্রথম কয়েকটা দিন সুশীলের স্বরূপ বুঝতেই পারিনি। রোগাপটকা ছোট্টখাট্ট মানুষ, চোখে ঠুলির মতো মোটা কালো ফ্রেমের চশমাটাই যা নজরে পড়ে। সারাক্ষণ মুখ বুজেই থাকে। বিশেষ কারুর সঙ্গে আলাপ-টালাপের চেষ্টা করে না। আমরা সুশীল চাকীকে গ্রাহের মধ্যেই ধরিনি তাই।
ক-দিন বাদে প্রথম কুটুস কামড়টিতেই তাই হকচকিয়ে গেলাম।
সেদিনও শনিবারের সকাল। ঘনাদা আমাদের সঙ্গেই কৃপা করে খাবার ঘরে খেতে বসেছেন। আমাদের ঠাকুর রামভুজ যথারীতি রুই মাছের কালিয়ার জামবাটিটা তাঁর পাতের কাছেই নামিয়ে দিচ্ছে, এমন সময় খুক খুক হাসির শব্দে চমকে উঠলাম।
হাসে কে?
হপ্তার আর পাঁচদিন যা-ই করি, শনি-রবিবারে ঘনাদার কোনও ব্যাপারে হাসা তো কুষ্ঠিতে লেখেনি। হাসির বদলে নেহাত নিরুপায় হলে কাশি একটু-আধটু শোনা যায় বটে!
সন্ত্রস্ত হয়ে এ ওর মুখের দিকে তাকালাম। এমন বেয়াক্কেলে বেয়াদবি কার পক্ষে করা সম্ভব?
ঘনাদার কালিয়ার বাটিও তখন একটুখানি কাত হয়ে থমকে গিয়েছে। আমাদের মুখগুলোর ওপর তাঁর চোখের দৃষ্টি যেন সার্চলাইট বুলিয়ে গেল।
সে-সার্চলাইট যেখানে গিয়ে থামল আমাদের সকলের চোখ সেখানে পৌঁছে একসঙ্গে ছানাবড়া। শ্রীমান সুশীল থালার উপর মাথা নিচু করে নিবিষ্ট মনে খেয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার এঁটো ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসির ঝিলিক তখনও মেলায়নি।
যাকে বলা যায় সংকটজনক মুহূর্ত। আমরা সবাই রুদ্ধশ্বসে অপেক্ষা করছি কী হয় কী হয় ভেবে।
ফাঁড়াটা সে যাত্রা অবশ্য কেটে গেল। ঘনাদা একটা নাসিকাধ্বনি করে তাঁর জামবাটিতে মনোযোগ দিলেন। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
ব্যাপারটা ওইখানেই চুকে গেলে ভাবনার কিছু ছিল না। কিন্তু সুশীল চাকীকে তখনও আমাদের চিনতে বাকি।
