ডেকে গিয়ে পৌঁছোবার পরই রক্তটা মাথায় উঠে গেল এক মুহূর্তে। গোটা আষ্টেক সাগর-ভোঁদড় সেখানে ডেকের পাটাতনের ওপর পড়ে আছে। প্রায় সব কটাই মরা। একটা দুটোর উজ্জ্বল মোলায়েম গা শুধু তখনও মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে উঠছে। সুলুপের ধারে আমায় যেখানে দাঁড় করিয়েছে তার পেছনেই বিরাট জালটা জল থেকে তোলা হলেও তখনও ফ্রেমে টাঙানো।
চোখে যে তখন চারিদিক লাল দেখছি তা বুঝতে না দিয়ে মুখে হাসি টেনে গদগদ হয়ে বললাম, বাঃ! চমৎকার ক্যামেরার কাজ তো! চিনে ভাষাটা কিছু জানি বলে অহংকার ছিল। এখন দেখছি অনেক কিছুই আমার শিখতে বাকি। আপনার চিনে ভাষায় অন্তত ক্যামেরা মানে ভোঁদড় ধরা জাল, কেমন?
ঠিক ধরেছেন! চিং সুন আমার বাহাদুরিতে যেন অবাক।
আর কৃতজ্ঞতা মানে বেইমানি, সামনে হাত বাড়িয়ে বন্ধুত্ব মানে পিঠে চোরাগোপ্তা, আর মানুষের চেহারা মানে শয়তানের মুখোশ!
চিং সুনের চালকুমড়ো মুখের টেরা চোখদুটো তখন তার মাল্লার হাতের ছুরির মতোই চকচক করছে।
মুখে কিন্তু মোলায়েম হাসিটি বজায় রেখে তিনি বললেন, আমাদের ভাষাটা এত তাড়াতাড়ি রপ্ত করেছেন দেখে আপনার মাথাটাই যে বাঁধিয়ে রাখতে ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু হাতে আমার সময় বড় কম। সাগর-ভোঁদড়ের খবর জানাজানি হয়ে যাবার আগেই এ তল্লাটের যতদূর সম্ভব সব ভোঁদড় সাবাড় করে দেশে ফিরে যেতে হবে। তাই অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লোহার শেকলে হাত-পা বেঁধে আপনাকে এইখানেই সমুদ্রের জলে ফেলে দিয়ে যেতে হচ্ছে। একটা ভরসা আপনাকে দিচ্ছি। এখানে হাঙর-টাঙরদের উৎপাত নেই বললেই হয়। সুতরাং সমুদ্রের তলায় শুধু মাছেরাই আপনার হাড়মাস খুবলে খাবে!
ভরসাটুকুর জন্য ধন্যবাদ, চিং সুন! যেন কৃতার্থ হয়ে বললাম, কিন্তু এখানকার সাগর-ভোঁদড় সাবাড় করে নিয়ে যাওয়া বোধ হয় আপনার ভাগ্যে নেই। আপনার শয়তানিটা আঁচ করতে পারিনি সত্যি, কিন্তু সাগর-ভোঁদড় যে এখনও টিকে আছে আর এতদিন মানুষের চোখ এড়িয়ে থাকার দরুন কিছু বংশ বৃদ্ধি যে করতে পেরেছে এ খবর আর বেশিদিন চাপা থাকবে না বুঝে সানফ্রানসিসকোতে নেমেই আমার বন্ধু সামুদ্রিক প্রাণিতত্ত্ববিদ ডক্টর ক্যামেরনের সঙ্গে দেখা করে এসেছি। কী তাঁকে করতে হবে তা-ও বলে এসেছি সব। এখান থেকে কিছু দূরে বিবি ক্রিকের মুখে তিনি তাঁর লোকজন নিয়ে তখন থেকেই পাহারায় আছেন। ইতিমধ্যে সাগর-ভোঁদড়ের একটা-দুটো পাল দেখেও ফেলেছেন বলে বিশ্বাস করি। এ-পাল দেখবার পরেই ক্যালিফোর্নিয়া ও আমেরিকার ফেডারেল সরকারকে জানিয়ে এ-প্রাণীটিকে রক্ষা করবার ব্যবস্থা যা করবার তিনি হয়তো করেই ফেলেছেন ইতিমধ্যে। সুতরাং আপনার শয়তানি মতলব সিদ্ধ হবার কোনও আশাই তো দেখছি না।
চিং সুনের মাংসের পাহাড় আমার এই কথার মধ্যেই প্রায় আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠল। মুখ থেকে যেন আগুনের হলকা বার করে চিং সুন বললেন, হতভাগা কেলে আরশোলা! তুই লুকিয়ে লুকিয়ে এই চালাকি করেছিস! তোকে আমি নিজের হাতেই আরশোলার মতো আজ টিপে মারব।
আমার ওপর ধস নামা পাহাড়ের চুড়োর মতে ঝাঁপিয়ে পড়ে চিং সুন আমার গলাটা টিপে ধরলেন।
ছুরি হাতে মাল্লাটা আচমকা সেই দশমনি লাশের ভার সইতে পারবে কেন? চিং সুন সচাপ্টে তার ওপর গিয়ে পড়বার পর দুজনে জড়াজড়ি করে ডেকের ওপর পড়ল লুটিয়ে। ছোরাটা তখন ঝনঝনিয়ে ছিটকে চলে গেছে ডেকের রেলিং-এর ধারে।
সেটা কুড়িয়ে নিয়ে লাফ দিয়ে, টাঙানো জালটার ফ্রেমের মাথাতেই উঠতে হল। ছোরাটা জালের মধ্যে গলিয়ে তারই বাঁট ধরে ঝুলে পড়লাম এবার। ধারালো ছোরায় জালটা ফর্দা ফাঁই করে কেটে একেবারে সমুদ্রের জলেই গিয়ে পড়লাম ঝাঁপিয়ে। সেখান থেকে ড়ুবসাঁতারে সুলুপের হালের কাছে।
ওপরে ভ্যাবাচাকা খাওয়া মাঝি-মাল্লারা তখন সামলে উঠে হইচই শুরু করেছে। সুলুপের দুধারের রেলিং থেকে ঝুঁকে চেষ্টাও করছে আমায় খোঁজবার।
ছোরাটা সত্যি যেমন ধারালো তেমনই মজবুত। কখনও ভ্রু ড্রাইভার, কখনও বাটালির মতো সেটা কাজে লাগিয়ে কয়েকটা ইসকুপ নাট বল্ট খুলে হালটাকে অকেজো করে দিতে বেশিক্ষণ লাগল না। এবার অন্য কাজটাও সারলাম। আবার ড়ুবসাঁতার দিয়ে তারপর সাগর-ভোঁদড়ের আস্তানা সেই ড়ুবো পাহাড়ের জাগা চুডোর ধারেই গিয়ে উঠলাম। তার একটা খাঁজের আড়াল থেকে সুলুপটার ওপর নজর রাখা সোজা।
খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। আমায় খুঁজতে সুলুপ ঘোরাতে যেতেই হালের অবস্থাটা ধরা পড়ল। তা নিয়ে চেঁচামেচি হাঁকাহাঁকি খানিক হতে-না-হতেই সুসুপের ওপরে একেবারে হুলুস্থুল কাণ্ড। সুলুপের গ্যাফটপ পালে আগুন লেগে গেছে। তার সব ঝুলোনো দড়িদড়া থেকে ধোঁয়ার রাশ উঠেছে কুণ্ডলী পাকিয়ে।
হাল বিকল করবার পর তাই বেয়ে একটু উঠে এই কাজই সেরেছিলাম। পালের ঝোলানো কটা দড়িদড়ায় লাইটার থেকে একটু করে পেট্রল লাগিয়ে ধরিয়ে দিয়েছিলাম আগুন। কেবিনে বন্দী অবস্থায় পিস্তলটা না পেলেও এই লাইটারটিই কেবিন ট্রাঙ্কের মধ্যে পাই। বিশেষ কিছু না ভেবেই সেটা পকেটে রেখেছিলাম। সেটা যে এমন কাজে লাগবে তখন ভাবতে পারিনি।
চিং সুন আর তার দুশমন মাঝি-মাল্লারা তাদের বেহাল জ্বলন্ত সুলুপ নিয়ে কী তারপর করেছে ঠিক জানি না। যা-ই করুক, তাদের ভোঁদড় শিকারের আশায় যে চিরকালের মতো ছাই পড়েছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। আমার তখন আসল জরুরি খবরের জন্যই বেশি আগ্রহ। সুলুপের ওই অবস্থা দেখেই আমি তাই সাঁতরে তীরে গিয়ে উঠি। সেখান থেকে সোজা সানফ্রানসিসকোতে ডক্টর ক্যামেরনের কাছে।
