চিং সুন যে কত বড় কপট শয়তান তা যখন ধরতে পারলাম তখন আমি নিরুপায়ভাবে তারই হাতের মুঠোয়। তার আগে হাতুড়ে হোক বা না-হোক, তা দেওয়া চশমায় সত্যি আমি টাইওয়ানেই নতুন চোখ পেয়েছি। নিজের কড়ার রাখতে তারই সঙ্গে তারপর এসেছি সানফ্রানসিসকোয়। সেখানে তার সুলুপে উঠে ভোঁদড়ের খোঁজে রওনা হবার সময়েই মনে অবশ্য একটু খটকা লেগেছিল। সুলুপের মাঝি-মাল্লা সব চিনে। চেহারাগুলো কেমন দুশমনের মতো। সে খটকাকে তব আমল দিইনি। মাঝি-মাল্লার চেহারা নিরীহ ভালমানুষের মতো হবে কেন এই কথাই নিজেকে বুঝিয়েছি। চিং সুনও অবশ্য তাঁর অমায়িক ব্যবহারে সব ভুলিয়ে দিয়েছেন। আমি যেন তাঁর গুরুঠাকুর এমনই তদবির করেছেন আমার। ক-দিন উত্তরমুখো পাড়ি দিয়ে তারপর এক জায়গায় এসে সুলুপের নোঙর ফেলতে নির্দেশ দিয়েছি সন্ধ্যাবেলা। সেটা মস্টেরয় উপদ্বীপের কূল। সেখানেই ক-দিন কাছাকাছি সুলুপ নিয়ে ঘোরাঘুরির পর একদিন সকালে সাগর-ভোঁদড়ের দেখা পেলাম। সেদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে চশমাটা প্রথমে খুঁজে পাইনি। সত্যিই চশমাটা তখন হারালে সাগর-ভোঁদড়ও খুঁজে পেতাম না, আর চিরকাল মনের মধ্যে এতবড় একটা আফশোসও পুষে রাখতে হত না।
ঘনাদা যেন সেই পুরোনো আফশোসেই একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে চুপ করলেন।
সাগর-ভোঁদড়ের দেখা পেয়েও আফশোস কেন ঘনাদা? আমাদের একটু উসকে দিতে হল, চিং সুন বেইমানি করলে বুঝি?
বেইমানি শুধু নয়, শয়তানি! ঘনাদা সেকথা স্মরণ করেই যেন উত্তেজিত, চশমা খানিক বাদে বাকসের তলাতেই খুঁজে পেলাম। সে-চশমা পরে ডেকে গিয়ে দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গেই সেই আশাতীত দৃশ্য দেখতে পেলাম। গোটা কুড়ি সাগর-ভোঁদড়ের ছোট একটা পাল। তীর থেকে কয়েকশো গজ দূরে সমুদ্রের জলের ওপর একটা ড়ুবো পাহাড় খানিকটা মাথা তুলে জেগে আছে, তার চারধারে কেল্প মানে বাদামি রঙের বড় বড় সামুদ্রিক আগাছার আধডোবা জঙ্গলে ভোঁদড়ের পাল রঙে রং মিলিয়ে প্রায় অদৃশ্য হয়েই চরে বেড়াচ্ছে।
আনন্দে উত্তেজনায় প্রায় চিৎকার করেই ডাকলাম, চিং সুন!
চিং সুন কাছেই ছিলেন। ছুটে এসে অস্থির ভাবে বললেন, কী! কোথায়?
দেখতে পাচ্ছেন না? নিজেকে সামলে শান্ত গলাতেই বললাম।
কী দেখতে পাব! সাগর-ভোঁদড়? কোথায়? চিং সুনের গলায় সন্দেহ ও বিরক্তি। চিং সুনকে অবশ্য দোষ দেওয়া যায় না। সমুদ্রের নোনা জলের ঢেউয়ে শ্যাওলা ধরা পাহাড়ের গা আর বাদামি কেল্পের জঙ্গলের মধ্যে মিশে-থাকা সাগর-ভোঁদড় চিনে নেওয়া অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও বহু সাধনায় তৈরি করা পাকা চোখ না হলে অসম্ভব। চশমাটা না থাকলে পাকা চোখ নিয়েও আমি পারতাম না।
ধৈর্য ধরে চিং সুনকে এবার জায়গাটার আরও স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে
সাগর-ভোঁদড়গুলোকে দেখিয়ে দিলাম।
চিং সুনের নাচানাচি তখন দেখবার মতো। তাঁর সে ছেলেমানুষি সত্যিই ভালই লাগল।
ক্যামেরা। ক্যামেরা! বলে তিনি তখন হাঁকাহাঁকি করছেন।
হেসে বললাম, আপনি ক্যামেরা নিয়ে যত খুশি ছবি তুলুন আজ, কিন্তু মনে রাখবেন কাল আমাদের ফিরতেই হবে। আপনার সারা জীবনের সাধ যখন মিটেছে। তখন আর দেরি করবার কারণও নেই।
নিশ্চয়, নিশ্চয়! চিং সুন হাসিমুখে আশ্বাস দেবার পর নিজের মুভি ক্যামেরাটাও আনতে কেবিনে গেলাম। ক্যামেরাটা বার করতে যাচ্ছি বাকস থেকে, হঠাৎ ঘরটা একটু অন্ধকার হওয়ায় চমকে তাকিয়ে দেখি সুলুপের দুশমন চেহারার চিনে মাল্লাদের একজন কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে।
কেমন একটু সন্দেহ হওয়ায় উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলাম। তার আগেই দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে থেকে তাতে চাবি লাগাবার শব্দও পেলাম।
ব্যাপারটা বুঝতে আর দেরি হল না। চিং সুনের এ-রকম শয়তানির সম্ভাবনা যে একেবারে মাথায় আসেনি তার জন্য নিজেকে তখন ধিক্কার দিয়ে আর লাভ কী!
ব্যাকুলভাবে কেবিন ট্রাঙ্কটা হাতড়ে পিস্তলটা খুঁজলাম। পিস্তল সেখানে নেই। তা যে পাব না আগেই বোঝা উচিত ছিল। চিং সুন আটঘাঁট না বেঁধে তার এ শয়তানি ফন্দি আঁটেনি। খাঁচায় বন্দী বাঘের মতো নিষ্ফল আক্রোশে গজরানো ছাড়া আর কিছু করবার নেই। তবু ট্রাঙ্কটা হাতড়ে একটা কাজের জিনিস যে পেলাম এই ভাগ্য।
দুপুর পর্যন্ত সেইভাবেই কাটল। বাইরে থেকে সুলুপের ওপরকার যে সব আওয়াজ কানে আসছিল তার মানে বুঝে শরীরের রক্ত তখন ফুটছে। স্বয়ং চিং সুন-ই এসে বেলা বারোটা নাগাদ আমার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। সঙ্গে অবশ্য চকচকে ছুরি হাতে একজন চিনে মাল্লা।
চিং সুনের হাঁড়ি মুখের দু-পাটি দাঁতই তখন অমায়িক হাসিতে আকর্ণবিস্তৃত হয়ে বেরিয়ে আছে।
যেন লজ্জায় সংকোচে এতটুকু হয়ে তিনি বললেন, ছি! ছি! কী অন্যায় বলুন তো! কে হতভাগা এক মাল্লা আমার হুকুম না বুঝে আপনাকে এতক্ষণ কেবিনে বন্ধ করে রেখেছে। আমি কোথায় ক্যামেরার কাজ দেখাতে আপনাকে ডেকে আনতে বললাম, আর গাড়োলটা কিনা আপনার দরজা বন্ধ করে দিয়ে গেল!
তাতে আর কী হয়েছে। আমিও তাঁর বিনয়ে যেন গলে গিয়ে বললাম, কেবিনে খানিকক্ষণ তবু নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করা গেল। আপনার ক্যামেরার কাজ নির্বিয়ে সারা হয়েছে নিশ্চয়?
তা কতকটা হয়েছে আপনার আশীর্বাদে! চিং সুন সকৃতজ্ঞভাবে হেসে বললেন, আপনাকে তাই দেখাবার জন্যেই তো ডাকতে এসেছি। আসুন, আসুন।
সামনে চিং সুন আর পেছনে ছুরি হাতে সেই মাল্লার মাঝখানে ডেক পর্যন্ত যেতে হল।
