ধরা পড়ার লজ্জাটা আর একটু রগড়ে বুঝিয়ে দিলেন ঘনাদা। রামটানের ধোঁয়ায় ঘরের হাওয়া ঘোলাটে করে বলতে শুরু করলেন, হাসি শেষ করে ডক্টর চিং সুন একেবারে যেন লজ্জায় মরে গিয়ে বললেন, আমার এখন নাক খত দেওয়াই উচিত, মি. দাস!
দোহাই ও-চেষ্টা আর করবেন না, আমার হয়ে বন্ধু লি পো-ই তাঁকে ঠাট্টা করলেন, একে আমাদের খাঁদা চিনে নাক। মাটিতে ঘসলে ওর আর চিহ্ন থাকবে না।
চিং সুন এ-ঠাট্টায় আর একবার দাঁত বার করে হেসে বললেন, তাহলে প্রায়শ্চিত্তটা অন্যভাবেই করি। করি, আপনার চোখের দোষ সারাবার এক জোড়া চশমা বানিয়ে দিয়ে।
সে-চশমায় চোখের দোষ যদি না সারে? চিং সুনের মিথ্যে বড়াই থামাবার জন্যই বললাম।
চিং সুন কিন্তু ভড়কালেন না। একটু যেন ভেবে নিয়ে বললেন, না যদি সারে তাহলে দু-দুটো সাগর-ভোঁদড়ের লোমওয়ালা চামড়া জরিমানা দেব। আপনার বন্ধু লি পো আমার সে-চামড়া দেখেছে। সে-দুটো লি পোর কাছে আজই জামিন রেখে যাচ্ছি।
সাগর-ভোঁদড়ের চামড়া!মুখে কিছু বুঝতে না দিলেও মনে মনে তখন রীতিমতো অবাক হয়েছি। তবু বাইরে তাচ্ছিল্য দেখিয়ে বললাম, চামড়া আসল না নকল?
আসল কি নকল ও-জিনিসের জহুরি হলেই বুঝবেন। চিং সুন চটপট জবাব দিলেন, আজই তো সে দুটো এনে জামিন রাখছি।
সেদিন বিকেলে সত্যিই চিং সুন যে দুটি সাগর ভোঁদড়ের ফ্যর নিয়ে এলেন তা দেখে চোখের পলক আর যেন পড়তে চায় না। আসল সাগর-ভোঁদড়ের লোমওয়ালা চামড়া—মখমল আর সাটিন তার কাছে কোমলতা আর উজ্জ্বলতায় লজ্জা পায়।
এ ফ্যর আপনি পেলেন কোথায়? না জিজ্ঞেস করে পারলাম না।
এ আমাদের পরিবারেরই পুরোনো সম্পদ। বললেন চিং সুন, চোদ্দ পুরুষ ধরে আমরা চিনের মান্দারিন ছিলাম। মান্দারিনদের নেশা আর বড়াই ছিল এই সাগর-ভোঁদড়ের ফ্যর সংগ্রহ করা। দুনিয়ার সবচেয়ে চড়া দাম তাঁরাই দিতেন এ-জিনিসের। আমাদের পরিবারের এ-জিনিস আরও অনেক ছিল। আমি শুধু দুটি মাত্র নিয়ে আসতে পেরেছি। এখন বলুন এই জামিন যথেষ্ট কি?
হ্যাঁ যথেষ্ট নয়, আশাতীত। এবার হেসে বলতেই হল, কিন্তু নেহাত নিঃস্বার্থভাবে আমার চশমা তৈরির এতখানি ঝুঁকি নিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না!
না, স্বার্থ একটু আছে বই কী! চিং সুন স্বীকার করলেন হেসে, আমার চশমায় যদি আপনার চোখের দোষ সত্যি সারে তাহলে আপনাকেও একটা কথা রাখতে হবে আমার।
কী কথা? সন্দিগ্ধ হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম। এমন কিছু নয়, আমাকে জ্যান্ত সাগর-ভোঁদড় দেখাতে হবে আপনাকে।
জ্যান্ত সাগর-ভোঁদড় দেখাব আমি! চোখ কপালে তুলে বললাম, এরকম আজগুবি আবদারের কোনও মানে হয়? আঠারোশো ত্রিশ সালের পর জ্যান্ত সাগর-ভোঁদড় পৃথিবীর কেউ দেখেনি।
কেউ দেখেনি বলেই তো আপনার কাছে এসেছি! চিং সুন খোলাখুলিভাবে বলে ফেললেন, ধাপ্পা দেবার ছলে আপনার সঙ্গে গায়ে পড়ে আলাপ করেছি কি মিছিমিছি? আপনার অনেক খবরই জেনেছি, মি. দাস। আর বছরে ক্যালিফোর্নিয়ার সান পাবলো উপসাগরে আপনি মাঝারি তিমি শিকারের নামে ছোট একটা সুলুপ নিয়ে কয়েক মাস ঘুরেছেন, অথচ একটাও তিমি ধরেননি। সমুদ্রের ও অঞ্চলে আপনি শখ করে হাওয়া খেতে গেছলেন বলে তো মনে হয় না!
হাওয়া খেতে যাইনি বলেই সাগর-ভোঁদড়ের সন্ধান পেয়েছি এ কথা প্রমাণ হয় কি? বিদ্রুপের সুরেই বললাম, আমি ওখানে রত্নদীপের মূল চেহারা দেখতে গেছলাম।
রত্নদীপের মূল চেহারা। চিং সুন একটু ভ্যাবাচাকা, সে আবার কী? ওখানে রত্নদীপ আবার কোথায়?
সত্যিকারের নয়, কল্পনার রত্নদীপা চিং সুনকে এবার বোঝালাম, আপনি তো ডাক্তারি ছাড়া অনেক কিছু নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন মনে হচ্ছে। আর. এল. স্টিভেনসনের নাম শুনেছেন আশা করি?
হ্যাঁ, শুনেছি। চিং সুন তখনও বেশ ধাঁধার মধ্যে, সেই বিখ্যাত লেখক তো যিনি ট্রেজার আইল্যান্ড লিখেছিলেন?
তাঁর সেই ট্রেজার আইল্যান্ড মানে কল্পনার রত্নদ্বীপের কথাই বলছি। চিং সুনকে গম্ভীর হয়ে বললাম, স্টিভেনসন আঠারোশো ঊনআশি খ্রিস্টাব্দে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে একটি জায়গায় কিছুদিন কাটান। স্পেনের নাবিকরা সে উপকূলের নাম দিয়েছিলেন প্যন্টা দে লস লোবোস ম্যারিনোজ অর্থাৎ সাগর-নেকড়ের স্থল-বিন্দু। ট্রেজার আইল্যান্ডে যে দ্বীপের বর্ণনা তিনি করেছেন, তার আদল ওইখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য থেকেই নেওয়া। আমি সেই জায়গাই দেখতে গেছলাম। কিন্তু সেখানে তো দু-জাতের সিল শুধু পাওয়া যায়, স্প্যানিয়ার্ডরা যার নাম দিয়েছিল সাগরনেকড়ে।
কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, মি. দাস এবার চিং সুন সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমার শর্তে চশমা নিতে রাজি কিনা তাই শুধু বলুন? চশমা ঠিক হলে সাগর-ভোঁদড় আমায় দেখাবেন কি না?
চশমা ঠিক না হলে সাগর-ভোঁদড় তো দেখতেই পাব না। এবার হেসে বললাম, আর দেখতে যদি পাই তাহলে আপনাকেই বা সে-দৃশ্যে বঞ্চিত করব কেন? কিন্তু একটা কথা বলে রাখছি। সাগর-ভোঁদড়ের সন্ধান যদি পাই তো শুধু চোখেই দেখবেন, ধরবার নামও করবেন না। এই বিরল প্রাণীর শেষ যে কটি প্রতিনিধি এখনও মানুষের চোখের আড়ালে লুকিয়ে টিকে আছে, তাদের মানুষের লোভর কাছে বলি দেওয়ার পাপের ভাগী আমি হব না কিছুতেই।
আমিই কি তা হতে চাই! চিং সুন প্রায় শিউরে উঠে বললেন, আমার শুধু একবার চোখে দেখার সাধ। ছেলেবেলা থেকে এই প্রাণীটি দেখবার জন্য আমি লালায়িত। আপনার কাছে এবার তাহলে স্বীকার করি সত্য কথাটা। এই সাগর-ভোঁদড় খোঁজবার জন্য আমি নিজে একটা সুলুপ পর্যন্ত কিনে ফেলেছি। সেই সুলুপ নিয়ে গত কয়েক বছর চষে বেড়িয়েছি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আলাস্কা পর্যন্ত ওই উপকূলের সমুদ্র। লাভ কিছু অবশ্য হয়নি, তবে আপনার খোঁজ খবরাখবর ওই সুলুপ নিয়ে ঘোরাঘুরির সময়েই পাই। আপনাকে কথা দিচ্ছি, সাগর-ভোঁদড় যদি দেখান তো ক্যামেরায় ছাড়া আর কিছুতে ধরব না।
