এবার একটু না হেসে পারলাম না। বললাম, আমার চোখের দোষ সারাবেন? শুধু লন্ডন বেৰ্লিন নয়, ভিয়েনা পর্যন্ত হার মেনেছে, জানেন কি?
জানলাম। চিং সুনও হেসে বললেন, তবু ওস্তাদরা যেখানে হার মানে সেখানে হাতুড়েও কখনও কখনও বাজিমাত তো করে! আমায় সেইরকম হাতুড়ে মনে করুন না!
তা-ই করব।আমায় হাসি চেপেই বলতে হল, কিন্তু আমার চোখের দোষ আছে। বুঝলেন কী করে? এই আতস কাঁচ ব্যবহার করছি দেখে?
না, চোখের দিকে চেয়েই বোঝবার ক্ষমতা আমার আছে। আচ্ছা, আজকের মতো চলি। বলে ডক্টর চিং সুন চলে গেলেন।
আবার এলেন ঠিক পাঁচ দিন বাদেই অমনই সকালবেলা।
আমি ইতিমধ্যে বন্ধু লি পোর কাছে চিং সুন সম্বন্ধে যা জানবার জেনেছি। মানুষটা সত্যিই নাকি বেশ অদ্ভুত অসাধারণ। উত্তর চিনের বেশ বড় বংশের ছেলে। পুরুষানুক্রমে চিন সাম্রাজ্যে তাঁদের বংশের লোকেরা মান্দারিন অর্থাৎ রাজদরবারের বড় বড় কর্মচারীর কাজ করেছেন। চিনে কুয়োমিনটাং-এর আধিপত্যের পরই চিং সুন দেশ থেকে পালিয়ে জাপানের অধীন এই টাইওয়ানে আশ্রয় নেন। চোখের ডাক্তার হিসেবে তাঁর নাম আছে, কিন্তু চোখের ডাক্তারির বাইরে আরও অনেক কিছু তিনি করেন যা নাকি বেশ রহস্যময়। চিং সুনের ডাক্তারি ছাড়া আরও অনেক বিদ্যায় দখল আছে। যৌবনে ইউরোপে তিনি অনেক কাল নানা জায়গায় এই বিদ্যাচর্চায় কাটিয়েছেন। ধরন-ধারণ চালচলন একটু সন্দেহজনক হলেও চিং সুনের নানা বিষয়ে পাণ্ডিত্যের খ্যাতি টাইওয়ানের বাইরেও পৌঁছেছে। তাঁর সম্বন্ধে আরও কয়েকটা মজার গল্পও টাইওয়ানের অনেকে জানে।
পাণ্ডিত্য যে তাঁর আছে চিং সুনের রেখে যাওয়া খোদাই-করা হাড়গুলো আর ব্রোঞ্জের পাতটা দেখেই বুঝেছিলাম।
দেখা করতে আসার পর চি সুনকে সেই কথাই বললাম।
সেদিন সকালেও ওই বাইরের বাগানেই টেবিল পেতে বসে ছিলাম। বন্ধু লি পোকে রেখেছিলাম সঙ্গে। চিং সুনের বসবার উপযুক্ত একটা বাড়তি মজবুত আসন শুধু পাতিয়ে রেখেছিলাম আগে থাকতে।
চিং সুন এসে যথারীতি চিনে কায়দায় অভিবাদন জানিয়ে সে-আসনে বসবার আগেই জিজ্ঞাসা করলেন, কী বুঝলেন আমার জিনিসগুলো দেখে, মি. দাস!
কাগজের বাকস থেকে বার করে হাড়গুলো আর ব্রোঞ্জের পাতটা সামনের টেবিলের ওপরই সাজিয়ে রেখে দিয়েছিলাম। চিং সুন বসবার পর তারই একটা খোদাই করা হাড় তুলে নিয়ে গম্ভীর মুখে বললাম, বুঝলাম, আপনি সত্যি পণ্ডিত লোক।
তার মানে? বড় চালকুমড়োর মতো চিং সুনের গোল ভাবলেশহীন মুখেও যেন একটু বিদ্রুপের ঝিলিক খেলে গেল, প্রায় চার হাজার বছর আগেকার খোদাই করা হাড় আর ব্রোঞ্জের পাতে আমার পাণ্ডিত্যের কী প্রমাণ পেলেন! আমি ওগুলো তো
সংগ্রহ করেছি মাত্র।
না, ডক্টর চিং সুন, তাঁর হাঁড়ি-মুখের দিকে সোজা তাকিয়ে বললাম, ওগুলো আপনি জাল করেছেন। তবে সত্যিকার পাণ্ডিত্য না থাকলে যার-তার পক্ষে এরকম জাল করা সম্ভব নয়।
আমি জাল করেছি ওগুলো! চিং সুন যেন এখুনি ফেটে পড়বেন মনে হল, আপনাকে আমি…
আহাম্মক গাড়োল ভেবেছিলেন! চিং সুনকে থামিয়ে দিয়ে মাখনের মতো গলায় বললাম, শুনলাম, একবার এক জার্মান না পোলিশ নৃতত্ত্ববিদ এই টাইওয়ানের জংলি আদিবাসী চিন হোয়েনদের সম্বন্ধে গবেষণা করতে এলে তাঁকে বাঁদর নাচ নাচিয়েছিলেন এমনই বোকা বানিয়ে! আমাকেও তাই নাচাতে চেয়েছিলেন। আপনাকে সেই আনন্দটুকু দিতে পারলাম না বলে দুঃখিত। তবে আপনার জ্ঞান-বিদ্যার সত্যিই তারিফ করছি। হাড় খোদাইগুলো জাল করা এমন কিছু অবশ্য শক্ত নয়, কিন্তু ব্রোঞ্জের পাতে যা খোদাই করেছেন তাতে সত্যিই বাহাদুরি আছে! ব্রোঞ্জের পাতে খোদাই করা শব্দ হল তিনটে আর তার অক্ষর হল আঠারোটা। আঠারোটা হরফের তিনটে নিয়েছেন মিশরের প্রাচীন লিপি থেকে, ব্রাহ্মী থেকেও নিয়েছেন তিনটে, খরোষ্ঠী থেকে নিয়েছেন চারটে, প্রাচীন সিন্দজিরলি, ইথিওপিয় আর টেমা থেকে দুটো করে—আর একটা করে ফিনিশীয় আর সেবিয়ান থেকে। আপনার খোদাই করা অক্ষরগুলো এবার পর পর সাজিয়ে দেখা যাক। সব হরফগুলো এক একটা ইংরেজি অক্ষরের প্রতিরূপ। প্রাচীন লিপির প্রতিরূপের বদলে ইংরেজি অক্ষর বসিয়ে সাজালে সবসুদ্ধ লেখাটা দাঁড়ায় GHANASHAM DAS HOAXED. এ-লেখার প্রথম শব্দ ঘনশ্যামের জিটা নিয়েছেন মিশরি থেকে, এটা ব্রাহ্মী, এটা খরোষ্ঠী, এনটা মিশরি, এবার এটা সিন্দজিরলি, এসটা টেমা, এবার এচটা প্রাচীন ইথিওপিয়ান, এটা ব্রাহ্মী, এমটা মিশরি। দ্বিতীয় শব্দ দাস-এর ডিটা টেমা, এটা ফিনিশীয়, এসটা খরোষ্ঠী। তৃতীয় শব্দ হোসড়-এর এটা খরোষ্ঠী, ওটাও তা-ই। এটা প্রাচীন ইথিওপিয়ান, এটা ব্রাহ্মী, ইটা সিন্দজিরলি আর ডিটা সেবিয়ান। তা এত কষ্টই যদি করলেন ঘনশ্যামের ওয়াইটা বাদ দিলেন কেন? এ সব লিপিতে না থাকলেও সিরিলিক-এই ওয়াই পেতেন।
আমার কথা শুনতে শুনতে চিং সুনের মুখখানা আষাঢ়ের মেঘের মতো থমথমে হয়ে এসেছিল। ঝড় উঠে বাজের কড়াকড় শুরু হয় বুঝি। কিন্তু তার বদলে সেই চালকুমড়ো মুখে সে হঠাৎ গলা ছেড়ে হেসে উঠল।
ঘনাদা থেমে এতক্ষণের ছাই-জমা সিগারেটে একটা রামটান দিলেন।
আমরা কিন্তু টাইওয়ানের চিং সুনের মতো গলা ছেড়ে হাসতে পারলাম না। ঘনাদা প্রাচীন লিপির খিচুড়ির ব্যাখ্যান আরম্ভ করার পরই আমরা জিভ কেটে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছি কয়েকবার। এখন কেউ লাল কেউ বেগনি হয়ে সবাই আমরা অধোবদন। আমাদের অত ফন্দি খাটিয়ে লেখা চিঠির জারিজুরি সব অমন করে ভাঙবে যদি জানতাম!
