গলতিটা ধরে ফেলে শিশিরই তা শোধরালে চটপট।
সকালের খোলা টিনটা পুরোই ঘনাদার সামনে ধরে দিয়ে বললে, আর একটা খেয়ে দেখবেন নাকি?
বলছ? ঘনাদা অতিকষ্টে যেন নিজেকে মর্ত্যভূমিতে নামালেন।
শিশির ততক্ষণে একটা সিগারেট তাঁর আঙুলে ধরিয়ে দিয়ে লাইটারও বার করে ফেলেছে। ঘনাদার সিগারেট ধরানো পর্ব শেষ হবার পরও খানিক অপেক্ষা করতে হল আমাদের। পর পর তিনটি সুখটান দিয়ে আমাদের দিকে একটু যেন প্রসন্নভাবে চেয়ে তিনি বললেন, হ্যাঁ, কী যেন বলছিলাম! ও, ডক্টর চিং সুনের কথা।
না, বলছিলেন ওই চশমা আর ভোঁদড়ের কথা। আমাদের সবিনয়ে একটু শোধরাবার চেষ্টা করতে হল।
ও সবই এক। চিং সুন আর চশমা আর ভোঁদড় সব একসঙ্গে জড়ানো। ঘনাদা শিশিরের রাখা সিগারেটের টিনটা একেবারে কোলের কাছে টেনে নিয়ে শুরু করলেন, এখন টাইওয়ান বলেই সকলে যা জানে, তখন আমাদের মতো বাইরের লোকের কাছে তার নাম ছিল ফরমোজা দ্বীপ। ফরমোজা তখন জাপানের দখলে। তারা দ্বীপটির চিনে নাম টাইওয়ান সরকারিভাবে নিলেও চালু করতে পারেনি। এই ফরমোজা দ্বীপের এখনকার টাইপে, তখনকার টাইহোকু, শহরেই চিং সুনের সঙ্গে তামার আলাপ। চিনের লিপির কিছু অতি প্রাচীন নিদর্শন পেয়ে ওই টাইহোকুতেই তখন ও-হরফের আদি উৎপত্তি নিয়ে কাজ করবার চেষ্টা করছি।
ঘনাদা একটু থেমে চকিতে আমাদের ওপর যে-রকমভাবে চোখ বুলিয়ে নিলেন, তাতে কেমন একটা অস্বস্তিতেই বোধ হয় চাপা হাসিটা খুকখুকে কাশি হয়ে আর বেরুতে পারল না। ঘনাদা আবার ধরলেন, ওসব নিদর্শন হাড়ের ওপর খোদাই করা এক অতি প্রাচীন অজানা লিপি। ১৯০৩ সালে চিনের উত্তরের এক জায়গা খুঁড়ে ওই সব খোদাই করা হাড়ের টুকরো কিছু পাওয়া যায়। তাতে প্রায় দু হাজার পাঁচশো রকমের হরফ দেখা গেছল। কিন্তু পণ্ডিতেরা ছশোর বেশি অক্ষর তখনও চিনে উঠতে পারেননি। এইটুকু শুধু জানা গেছে যে খ্রিস্টপূর্ব ১৭৬৬ থেকে ১১২২ পর্যন্ত চিনের শাং বা য়িন বংশের রাজত্বকালেই সেগুলো খোদাই হয়। হাড়ের লেখাগুলো সাধারণ মানুষের ভাগ্য নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে তখনকার গণকদের মাথা-গুলোনো জবাব বলেই একদল পণ্ডিতের ধারণা। এই অদ্ভুত হরফগুলো নিয়ে মতভেদ থাকলেও সেগুলো চিনের যে চুয়ান লিপি পরে প্রবর্তিত হয় তার চেয়ে পুরোনো বলেই সকলে তখন মেনে নিয়েছেন।
লি পপা বলে আমার এক পণ্ডিত বন্ধুর বাড়িতে তখন আমি থাকি। বাড়িটা টাইপে শহরের এক প্রান্তে কিলাং নদীর ধারে। বাড়ির বাগানটা কিলাং নদীর পাড় পর্যন্ত নেমে গেছে। সেদিন সকালে সেই বাগানে একটা ক্যামফর লরেল মানে কপূর গাছের তলায় বসে একটা আতস কাঁচ নিয়ে ওই খোদাই করা হাড় পরীক্ষা করছি, এমন সময় ফোন্ডিং টেবিলটার ওপর একটা ছায়া পড়তে দেখে একটু অবাক হলাম। ফিরে তাকিয়ে প্রথম যেন পাথুরে প্রকাণ্ড একটা টিবিই দেখলাম মনে হল। তারপর বুঝলাম পাথুরে ঢিবি নয়, মানুষ।
আমায় পিছু ফিরতে দেখে মানুষটা একটু হেসে সামনে এগিয়ে এসে চিনে ধরনে কুর্নিশ করেও পরিষ্কার ইংরেজিতে বললে, মাপ করবেন মি. দাস। একটু বেয়াদবি করেই আপনার সঙ্গে আলাপ করতে এলাম।
আমি তখন লোকটার দিকে বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। এক উত্তর অঞ্চলের বাসিন্দা ছাড়া সাধারণত চিনেরা খুব লম্বা চওড়া হয় না। উত্তরের মাঞ্চুরিয়ার লোকদের হিসাবেও এ-মানুষটা কিন্তু অদ্ভুত ব্যতিক্রম। চিনে রং চেহারা নিয়ে এ যেন এক কাঠি দৈত্যবিশেষ।
তার চেহারাটা আমি লক্ষ করছি বুঝে লোকটি আবার হেসে বললে, আমার চেহারাটা দেখে ভুল বিচার করবেন না। প্রকৃতির খেয়ালে আমার এই চেহারাটাই আমার অভিশাপ দেখতে গুণ্ডা বদমাশ হলেও আমি নেহাত সামান্য চোখের ডাক্তার। তবে নিজের বেয়াড়া খেয়ালে পল্লবগ্রাহীর মতো বিজ্ঞানের এটা-সেটা নিয়ে একটু-আধটু চৰ্চা করি। নাম আমার চিং সুন।
ডক্টর চিং সুন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলছিলেন। তাঁকে বসতে দেবার মতো অন্য আসন সেখানে নেই। থাকলেও বিশেষ চেয়ার ছাড়া তাঁর ভার সইতে পারত কিনা সন্দেহ। ডক্টর চিং সুনের পরিচয় পেয়ে এবার আমিও দাঁড়িয়ে উঠে ভদ্রতা করে বললাম, আপনার সঙ্গে আলাপ করে খুশি হলাম। কিন্তু আমার এ-সৌভাগ্যের কারণটা জানতে পারি?
নিশ্চয়! নিশ্চয়! চিং সুন তাঁর ঢোলা জোব্বা ধরনের চিনে জামার ভেতর থেকে একটা জুতোর বাকস গোছের জিনিস আমার টেবিলের ওপর রেখে বললেন, আপনি চিনেয় আদি লিপি নিয়ে খোঁজখবর করছেন শুনে তখনকার ক-টা খোদাই করা হাড় আপনাকে দেখাতে নিয়ে এলাম। এগুলো আমাদের পরিবারেরই জিনিস। আমি পেপিং থেকে টাইওয়ানে চলে আসবার সময় এরকম কিছু পুরোনো জিনিস সঙ্গে নিয়ে আসি।
চিং সুন এবার পিচবোর্ডের বাকসটা খুলে যা বার করলেন তা আমি যা নিয়ে কাজ করছি সেই পুরোনো খোদাই করা ক-টা হাড়।
আগ্রহভরে হাড়গুলো একটু ওপর ওপর পরীক্ষা করে বললাম, এগুলো আশা করি আপনি দু-একদিনের জন্য রেখে যেতে পারবেন?
তা না হলে এনেছি কেন? চিং সুন সবিনয়ে বললেন, আমি দিন পাঁচেক বাদে এগুলোতে কী পেলেন জানতে আসব। ওই হাড়গুলোর তলায় একটা ব্ৰঞ্জের পাতও পাবেন। সেটা হাড়গুলোর চেয়েও প্রাচীন বলে জানি। তার হরফগুলো যদি পড়ে দিতে পারেন তাহলে চিরকাল আপনার কেনা হয়ে থাকব। না, শুধু তাই কেন, আপনার চোখের দোষ সারিয়ে দেব কৃতজ্ঞতায়।
