চশমা হারিয়ে গেছে! আমরা সহানুভূতিতে কাতর হয়ে উঠলাম। কখন, কোথায় হারাল?
হারিয়েছে এই ঘরেই। শিবুই যেন ঘনাদার মুখপাত্র, কিন্তু সে আর পাবার নয়।
বললেই হল পাবার নয়! আমরা বিরক্ত শিবুর ওপর, আমরা এখুনি খুঁজে বার করছি।
উঁহু! শিবুই রুখে দাঁড়াল যেন, খোঁজাখুঁজির ঘনাদা কি কিছু বাকি রেখেছেন। মিছিমিছি ঘরদোর হাঁটকে আর জ্বালিও না!
তা হলে? শিবুর নিষেধ চট করে শিরোধার্য করে নিলাম আমরা, ঘনাদার চশমার ব্যবস্থা তো করতে হয় এখুনি।
আই-ক্লিনিকে চলুন, ঘনাদা! শিশিরের অনুবোধ।
আই-ক্লিনিকে কেন? গৌরের প্রতিবাদ, এখানেই চোখের ডাক্তার ডাকছি।
গৌর বেরিয়ে যায় যেন তখুনি।
দাঁড়াও। ঘনাদাই থামালেন তাকে, চোখের ডাক্তার ডাকিয়ে লাভ নেই।
কেন? আমরা বিমূঢ়, চোখের ডাক্তার একটা চশমার ব্যবস্থা করতে পারবে না আপনার! আপনার তো রিডিং গ্লাস, যাকে বলে পড়ার চশমা দরকার!
না। ঘনাদা গম্ভীরভাবে জানালেন।
তা হলে বাইফোক্যাল? শিবুর জিজ্ঞাসা। না। ঘনাদার সংক্ষিপ্ত জবাব।
তা হলে অ্যাসটিগম্যাটিক লেনস? চক্ষুবিদ্যা সম্বন্ধে চূড়ান্ত জ্ঞান জাহির করলাম।
না। ঘনাদা তা-ও নাকচ করে দিয়ে বললেন, প্রেসবাইওপিয়ার সঙ্গে আমার চোখ ডাইক্রোম্যাটিকা ফোটেরিস নয়, স্কোটেরিস।
অ্যাঁ! ঘনাদার চোখের দিকে তাকিয়ে আমাদের সকলের চোখই তখন ছানাবড়া।
কিন্তু দেখলে অমন ভয়ংকর তত মনে হয় না! শিবু যেন ভয়ে ভয়ে বললে।
একটু শুধু বাঁকাবাঁকা লাগে! শিশির বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করলে।
হ্যাঁ, দেখে অতটা বিদঘুটে বলে বোঝা যায় না, গৌরের যেন ঘনাদাকে সান্ত্বনা।
দেখে তোমরা কী বুঝবে! ঘনাদার গলায় ঝাঁজ, লন্ডন প্যারিস বের্লিন ভিয়েনাই হার মেনেছে নিদান দিতে। শেষে টাইওয়ানের এক হাতুড়ে ডাক্তার চিং সুন রোগ ধরে ওই আজব চশমা নিজেই বানিয়ে দেন।
সেই চশমা আপনি হারালেন! আমাদের সম্মিলিত হাহাকার।
হ্যাঁ, হারিয়েছি। তবে আগেই হারানো উচিত ছিল। ঘনাদা যেন অনুশোচনায় দগ্ধ।
আমরা সবাই এবার হাঁ। তক্তপোশের ওপর ভাল জায়গাটা আগেই দখল করে শিবুই কোনও রকমে ঢোঁক গিলে বলে ফেললে, কেন, চশমাটা অপয়া বুঝি?
অপয়া! ঘনাদাকে যেন অনেকদূর পর্যন্ত অতীত দৃষ্টি চালাতে হল, তা অপয়াও লতে পারো। ও-চশমা আগে হারালে, একশো বছরের ওপর যা লুপ্ত বলেই জানা ছিল, দুনিয়ার সবচেয়ে দামি সেই একটা বিরল প্রাণীর জাতকে প্রথম খুঁজে বার করে তার ধ্বংসের সহায় স্নার মনস্তাপে নিজেকে ধিক্কার দিতে হত না।
তক্তপোশের ওপরেই বসে থাকলেও আমাদের সকলের মাথাই তখন ঘুরতে শুরু করেছে।
দাঁড়ান। দাঁড়ান। শিশির প্রথম নিজেকে একটু সামলে নিয়ে আবেদন জানালে, ব্যাপারটা একটু গুছিয়ে নিই মাথায়। একশো বছরের ওপর লুপ্ত বলে জানা? তার মানে অন্তত একশো বছর সে প্রাণীর খোঁজ কেউ কোথাও পায়নি?
হ্যাঁ, শেষ সে-প্রাণী দেখা ১৮৩০-এ। ঘনাদা ব্যাখ্যা করলেন, তারপর পৃথিবী থেকে যেন একেবারে লোপাট!
সে-বিরল প্রাণী আবার পৃথিবীর সবচেয়ে দামি! গৌর চক্ষু বিস্ফারিত করে আমাদের মনে করিয়ে দিলে।
দামি কী রকম শুনবে? ঘনাদা অনুকম্পাভরে বোঝালেন, সেই প্রায় দেড়শো বছর আগেই সে প্রাণীর একটি ফ্যর অর্থাৎ লোমওয়ালা চামড়ার দাম ছিল নিদেন পক্ষে আট থেকে ন-হাজার টাকা!
বলেন কী? শিবু হাঁ হয়ে বললে, উত্তর মেরুর রুপোলি খেকশিয়াল কি রাশিয়ার দুধে আরমিন মানে ভাম নাকি।
বোধহয় কারাকুল ভেড়া! গৌর ঘনাদার কাছে শোনা গল্প থেকেই বিদ্যে জাহির করলে।
না, ভ্যল্পেস ইয়াগোপস অর্থাৎ মেরুর শেয়াল কি ম্যসটেলা আরমেনিকা মানে রুশ খটাশ নয়। ওভিস স্টিয়াটোপিনা মানে যাকে কারাকুল ভেড়া বলে তা-ও না। ঘনাদা আমাদের কুপোকাত করে বললেন, এ সব প্রাণী তো লুপ্ত বলে মনে করার কারণ হয়নি কখনও, তা ছাড়া ওদের ফ্যর-এর দামও অত নয়।
তা হলে প্রাণীটা কী? ধরা গলায় জিজ্ঞাসা করতে হল এবার।
ল্যাট্যাক্স লট্রিস! ঘনাদা মোলায়েম গলায় বললেন, মানে সমদ্রের ভোঁদড!
সমুদ্রের ভোঁদড়! কয়েকটা ঢোঁক গিলে জিজ্ঞেস করতে হল, তার অত দাম? এ-ভোঁদড় আবার লুপ্তও হয়ে গিয়েছিল?
হ্যাঁ। ঘনাদা আমাদের দিকে করুণাভরে চেয়ে বললেন, সমুদ্রের এই ভোঁদড়ের লোমওয়ালা চামড়ার লোভে মানুষ নির্মম পিশাচের মতো তা শিকার করেছে একদিন। হাজার হাজার পেন্ট মানে ওই নোমওয়ালা চামড়া শুধু চিনদেশেই চালান গেছে সেখানকার মান্দারিনদের জন্য। রাশিয়া সেদিন আলাস্কা আর ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তরে যে উপনিবেশ বসিয়েছে এই সামুদ্রিক ভোঁদড়ের প্রলোভনই তার জন্য অনেকটা দায়ী। স্পেনের নাবিকরাও ওই অঞ্চলটা চষে বেড়িয়েছে তাদের পালতোলা সুলুপে এই ভোঁদড়ের খোঁজে। এ-ভোঁদড়ের পেল্ট-এর মতো এমন উজ্জ্বল ঘন আর টেকসই এ-জাতের জিনিস আর হয় না। তার সবচেয়ে কদর ছিল চিন সাম্রাজ্যের মান্দারিনদের কাছে। মানুষ তাই এমন লুব্ধ নৃশংসভাবে এ-প্রাণীটি শিকার করেছে যে তার অস্তিত্বই মুছে গেছে পৃথিবী থেকে। অন্তত ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের পর এ-প্রাণীর সন্ধান আর কেউ পায়নি।
এই ভোঁদড় আপনি খুঁজে বার করেছেন আবার?
খুঁজে বার করেছেন বলে আপনার আফশোস?
তখন চশমা হারালে এ-ভোঁদড় আর খুঁজে পেতেন না?
আমাদের প্রশ্নবাণ শেষ হবার পর ঘনাদার কিন্তু আর সাড়াশব্দ নেই। হাতের সিগারেটের শেষটুকু দরজা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার যেন তিনি উদাস হয়ে গেলেন কোনও শূন্যতার ধ্যানে।
