বিকেলে এসে জমায়েত হবার পরই তাই শিবু গেছে সরেজমিনে তদারক করে একেবারে হালের অবস্থা জেনে আসতে, যাতে আমরা গিয়ে নাটকটা জমিয়ে তুলতে পারি।
কে কোন ভূমিকা নেবে তা-ও ঠিক করা হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে নিজের নিজের সংলাপ।
যেমন শিশির গিয়ে বিরক্তির সঙ্গে বলবে, জ্বালাতন করে যত আজেবাজে লোক। নীচে কে একটা চিনেম্যান গোছের চেহারার লোক এসে দাস সাহেবকে চাই বলে ঝামেলা লাগিয়েছিল। দিয়েছি দুর করে তাড়িয়ে!
আমরা তার আগেই জমায়েত হয়ে বসব ঘনাদার তক্তপোশে, মেস সংক্রান্ত একটা গুরুতর বিষয়ে যেন পরামর্শ নেওয়ার জন্যে।
আমি হাঁ হাঁ করে উঠব শিশিরের কথায়, আরে করেছ কী? না জেনে শুনে তাড়িয়ে দিলে কী বলে?
না, তাড়াব না! শিশির আমার উপরই খাপ্পা হবে, ঘনাদা এখানে নিরিবিলিতে অজ্ঞাতবাসে আছেন। যাকে তাকে ওঁর ঠিকানা জানতে দিলে আর রক্ষে আছে। দিনরাত ওঁকে অতিষ্ঠ করে ছাড়বে না? আজ চিনেম্যান, কাল জাপানি, পরশু ভিয়েতনামি, তার পর দিন মাওরি, তারপর পেরুভিয়ান…
শিশির গোটা প্রশান্ত মহাসাগরটাই পার হয়ে যাচ্ছে দেখে তাকে থামিয়ে আমায়। বলতে হবে, আরে থামো, থামো। তোমায় আর ভূগোলের বিদ্যে জাহির করতে হবে না। কিন্তু যাকে তাড়ালে সে যে ঘনাদার জানা লোক। দরকারি কী ব্যাপারে সকালে চিঠি দিয়ে গেছে বিকেলে উত্তর নিতে আসবে বলে। আমিই তো চিঠিটা ঘনাদাকে দিয়ে গেছি সকালে।
তা এত কথা শিশির জানবে কী করে? গৌর এবার শিশিরের পক্ষ নেবে, আমাদের কাউকে কিছু বলেছ তুমি ঘুণাক্ষরে?
এবার আমায় ক্ষুণ্ণ হতে হবে, জানাব আবার কী? শিশিরের অতটা মাতব্বরি করবার তো দরকার ছিল না। লোকটাকে দাঁড় করিয়ে ওপরে এসে খবর নিয়ে গেলেই তো পারত। উনি একেবারে ঘনাদার এতবড় পাহারাদার হয়ে উঠতে গেলেন কেন? এখন কী কেলেঙ্কারি হল দেখো দিকি!
কেলেঙ্কারি বলে কেলেঙ্কারি! শিবু আমার কথাতেই সায় দেবে, জরুরি কোনও চিঠি নিশ্চয়! চিনেম্যানের মতো চেহারা বলছে শিশির। সত্যিই ভিয়েটনাম কি ভিয়েটক-এর কেউ প্রাণের দায়ে ঘনাদার পরামর্শ নিতে এসেছিল কিনা কে জানে!
শিশির এবার কাঁচুমাচু মুখ করে ঘনাদাকে জিজ্ঞাসা করবে, সত্যি জরুরি নাকি, ঘনাদা?
আমরাও উদ্বিগ্ন হয়ে চাইব ঘনাদার দিকে।
কী চিঠি, ঘনাদা! কার চিঠি! কই চিঠিটা গেল কোথায়? ইত্যাদি ব্যাকুল প্রশ্ন বর্ষিত হবে ঘনাদার উদ্দেশে।
ঘনাদা সে সব প্রশ্নবাণ কী অস্ত্রে কাটাবেন, চিঠিটা বেমালুম উড়িয়ে দেবেন না তার সৃষ্টিছাড়া ব্যাখ্যা খাড়া করবেন তা-ই দেখবার জন্যই এত কাঠখড় পোড়ানো।
আর ঘনাদা কিনা এক চশমা হারাবার প্যাঁচেই আমাদের সব চাল ভণ্ডুল করে দিচ্ছেন।
না, সেটি হতে দেওয়া চলবে না। গাঁটের পয়সা গচ্চা দিয়ে ঘনাদার চশমা কিনে দিতে হয় যদি তাতেও রাজি, কিন্তু ঘনাদাকে ওই প্যাঁচে বাজিমাত করতে দেওয়া হবে না।
সিড়ি থেকেই ঝগড়াটা তুমুল করে নিয়ে ছাদে উঠলাম।
লাঠালাঠিটা শিশির আর গৌরের মধ্যে জমে ভাল। তারা দুজনেই তাই এবারের মহড়া নিয়েছে।
কেন! এ শনিবার নয় কেন! সিঁড়ি থেকেই ঘনাদার কানে পৌঁছোবার মতো গৌরের চড়া গলা শোনা গেল, তোমার ইস্টবেঙ্গল লিগ পায়নি বলে আমাদের সবাইকে কি হবিষ্যি করতে হবে।
হবিষ্যি করবে কেন! শিশিরও হেঁড়ে গলা ছাড়ল, না-খেলা পয়েন্ট নিয়ে লিগ পেয়ে মোচ্ছব করো। কিন্তু এ-শনিবারে আর ওই পায়রার মাংস নয়। বুনো বাপি দত্ত হাঁসে অরুচি ধরিয়েছিল, এবার আকাশে পায়রা উড়তে দেখলেও গা বমি করিয়ে ছাড়বে তোমরা।
গলাবাজিটা ছাদে তুলে একেবারে ঘনাদার ঘরের ভেতর পৌছে দিলে দুজনে।
বলুন তো, ঘনাদা! গৌরই প্রথম ঘনাদাকে সালিসি মানলে, পায়রার মাংস কিছু খারাপ জিনিস! বলে কিনা এ-শনিবারে অন্য কিছু করো। আরে, অন্য কিছু পাচ্ছি। কোথায়? বাজারে তেল নেই, মাছ নেই, দুধ নেই, সন্দেশ পর্যন্ত বাতিল, তা নতুন কিছু জোটাব কোথা থেকে!
যাঁর উদ্দেশে এই অভিনয় সেই ঘনাদা তখন ইহজগতে নেই। মুখে তাঁর শিশিরের সকালে দেওয়া একটি সিগারেট জ্বলছে, মনটা যেন তারই ধোঁয়ার সঙ্গে উর্ধ্ব আকাশে গেছে ছড়িয়ে।
কিন্তু এমন নির্লিপ্ত নির্বিকার তাঁকে থাকতে দিলে তো চলবে না। শিশির শনিবারের বাজারের ফর্দটা তাঁর নাকের সামনে বাড়িয়ে ধরে বললে, তা বলে ভদ্রলোকের-এককথার মতো মেনুর যেন আর নড়চড় নেই। আর শনিবারে যা এবারেও তাই। ফর্দটা একবার দেখুন না।
নাকের কাছে ওরকম একটা লম্বা কাগজ ঝুলিয়ে রাখলে যোগী ঋষিরও ধ্যান ভঙ্গ হয়। ঘনাদাকে তুরীয়লোক থেকে একটু নামতে হল। কাগজটা বাঁ হাতে একটু সরিয়ে উদাসীনভাবে বললেন, ফর্দ আমি দেখেছি।
আপনার দেখা তো! শিশির ঘনাদার কথাটায় কোনও গুরুত্বই না দিয়ে যা একখানি ছাড়ল আমরা তাতে হাসি চাপতে কেশে অস্থির।
বললে, খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আপনি তো বিবাগী মানুষ। চোখ বুলিয়েই মঞ্জুর করে দিয়েছেন। এখন একবার ভাল করে দেখুন দেখি। এর নাম শনিবারের খ্যাঁট?
আমাদের সংক্রামক কাশির হিড়িকেই বোধহয় ভুরু কুঁচকে ঘনাদাকে ফর্দটা আবার নাকের কাছ থেকে সরিয়ে বলতে হল, ও ফর্দ আমায় দেখানো মিছে।
কেন? কেন? গৌর শিশির এবং আমি একসঙ্গে উৎকণ্ঠিত। কেন আর! শিবুই ঘনাদার হয়ে কৈফিয়ত দিলে, যেন আমাদের ওপর বিরক্ত হয়ে, ঘনাদার চশমা হারিয়ে গেছে।
