কিন্তু চশমা হারালে খুঁজে না হয় না-ই পাওয়া গেল, নতুন চশমা কি আর হতে পারে না? অন্ধকারে আমি একটু আশার আলো দেখাবার চেষ্টা করলাম।
হ্যাঁ, আমরা নতুন চশমা কিনে দেব ঘনাদাকে! শিশির উৎসাহ প্রকাশ করলে আমার প্রস্তাবে।
আজই নিয়ে যাচ্ছি চশমার দোকানে! গৌরের মধ্যেও উৎসাহটা সংক্রামিত। তাতেও ভরসা কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে না। শিবুই মাথা নাড়লে, চশমা যাঁর এমন সময় বুঝে হারায় তাঁকে নতুন চশমা গছানো কি যাবে?
তবু হাল ছাড়ব কেন! গৌর হার মানতে প্রস্তুত নয় দেখা গেল। শিশির ও আমি তারই দলে।
কিন্তু যাবার ছুতো তো একটা চাই। শিবু আবার বাগড়া দিলে, গিয়েই চশমার কথা তুললে পত্রপাঠ বিদায়।
তা হলে…তা হলে…ওই শনিবারের বাজারের ফর্দ! গৌরই সমস্যাটার সমাধান করে ফেললে, আমরা যেন ফর্দটা সংশোধন করাতেই যাচ্ছি।
ঘনাদার তেতলার ঘরে এ-বিবরণটা টেনে তোলবার আগে ঘনাদার চশমা হারানোতে কেন আমরা এতখানি বিচলিত একটু বুঝিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
এবারে ঘনাদাকে তাতাবার যে-ফন্দিটি সবাই মিলে বার করেছিলাম তা প্রায় নিখুঁত। সেই ফন্দিরই প্রথম ধাপ স্বরূপ একটি চিঠি সকাল সাতটা বাজতে না বাজতেই ঘনাদার টঙের ঘর থেকে গড়গড়ার আওয়াজ পাওয়া মাত্রই দিয়ে এসেছি।
চিঠিটি তৈরি করতে বেশ কিছু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।
খামে বন্ধ চিঠি। ওপরে ইংরেজিতে পরিষ্কার ভাবে টাইপ করা নাম-ঠিকানা—মি. ঘনশ্যাম দাস, ৭২ নং বনমালি নস্কর লেন, কলিকাতা। কিন্তু খামটা ছিঁড়ে ভেতরের চিঠিটা বার করে খুললেই চক্ষুস্থির যাতে হয় তারই ব্যবস্থা। চিঠিটার নমুনা একেবারে প্রথমেই দেওয়া আছে।
এ চিঠির মশলা সংগ্রহ করতে গৌর আর আমাকে তিন দিন ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে গিয়ে ঘণ্টা তিনেক করে ভারী ভারী সব কেতাব ঘাঁটতেও হয়েছে। তারপর রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর আমার ঘরের দরজা বন্ধ করে শিবু ও শিশিরকে নিয়ে চারজনে মিলে চাইনিজ ইঙ্ক দিয়ে বাজার চষে কিনে আনা পাতলা লম্বা পার্চমেন্ট কাগজে মুনশিয়ানা করেছি। মুনশিয়ানা অদ্ভুত আজগুবি সব হরফ নিয়ে। কিছু হরফ প্রাচীন মিশরীয় লিপি থেকে নেওয়া, কিছু প্রাচীন হাবসি, কিছু আমাদের ভারতবর্ষেরই ব্রাহ্মী ও খবরাষ্ঠি থেকে। এরই মধ্যে অন্য অজানা হরফও বাদ যায়নি। এই হরেক রকম অক্ষর এলোপাথাড়ি মিলিয়ে যে-খিচুড়িটি তারপর কাগজে তোলা হয়েছে তা যে-কোনও প্রাচীন লিপিবিশারদ পণ্ডিতচূড়ামণির মাথা ঘুরিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট।
চিঠিটা ডাকে নয়, যেন হাতেই কেউ দিয়ে গেছে বিকেলে জবাব নিয়ে যাবার জন্য। ঘনাদাকে সরলভাবে কিছুই যেন না জেনে চিঠিটা দিয়ে এসেছি ওই কথা বলে।
তারপর ঘনাদা কখন কৌতূহলভরে চিঠিটা খোলেন তারই অপেক্ষায় তাঁর ওপর নজর রাখা চলছে। আধঘণ্টা অন্তর অন্তর কেউ না কেউ কোনও-না-কোনও ছুতোয়
একবার ওপরে গিয়ে নাটকটা শুরু হল কি না দেখে আসছে।
প্রথমে গেছে গৌর যেন গতকালের খবরের কাগজটা ঘনাদার ঘরেই আছে কিনা খোঁজ করতে। একটা কর্মখালির বিজ্ঞাপন নাকি তার না দেখলেই নয়।
তখনও পর্যন্ত যাকে বলে অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। সব ঠাণ্ডা চুপচাপ। ঘনাদা কলকেতে টিকে সাজাচ্ছেন তন্ময় হয়ে।
গৌরকে দেখে একটু ভুরু কুঁচকেছেন অবশ্য। এমন অসময়ে গৌরের আবির্ভাবটা তো ঠিক স্বাভাবিক নয়।
গৌরকে তাড়াতাড়ি তাই কৈফিয়তটা দাখিল করতে হয়েছে, কালকের কাগজটা আপনার ঘরে নাকি? কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।
আমার ঘরটা কি লস্ট প্রপার্টি স্টোর? কোথাও যা খুঁজে পাওয়া যায় না এখানেই পাওয়া যাবে? ঘনাদা একটু যেন বাঁকা মন্তব্য করেছেন। কিন্তু সেটা এমন কিছু গ্রাহ্য করবার মতো মনে হয়নি গৌরের।
না, না, একটা বিজ্ঞাপন দেখবার ছিল কর্মখালির। বলে অজুহাত দেখিয়ে একটু যেন লজ্জিত হয়ে চলে এসেছে গৌর।
তারপর গেছে শিশির ঘণ্টাখানেক বাদে। তাকে অবশ্য একটু ঘুস নিয়েই যেতে হয়েছে। একেবারে নতুন একটা সিগারেটের টিন। দুষ্প্রাপ্য বিদেশি ব্র্যান্ড।
এই ব্র্যান্ডটা হঠাৎ পেয়ে গেলাম ঘনাদা! শিশির যেন খুশিতে ডগমগ হয়ে বলেছে, প্রসাদ না করে তো খেতে পারি না। আপনার সামনেই তাই খুলতে নিয়ে এলাম।
ঘনাদার মুখের উজ্জ্বলতাটা আশানুরূপ দেখা যায়নি। কয়েক ওয়াট যেন কম। সেটা অবশ্য এমন কিছু ধর্তব্য নয়।
শিশির ঢাকনির পাক দিয়ে এয়ারটাইট টিনের পর্দাটা কাটতে কাটতে আড়চোখে ঘনাদার দিকে লক্ষ রেখেছে। না, ভাবান্তর বিশেষ নেই। চিঠির প্রতিক্রিয়া কিছু বোঝা যায়নি। এখনও সেটা খামেই বন্দী আছে বোধহয়। সিগারেট একটা মুখে ও বাকি কয়েকটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে, দেবার মতো কোনও সংবাদ না নিয়েই শিশিরকে ফিরতে হয়েছে।
আমরা তখনও উতলা কিন্তু হইনি। মেওয়া ফলাতে গেলে সবুর করতে হয় এ আর কে না জানে! একটু শুধু ধৈর্য চাই।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে যে যার কাজকর্মে বেরিয়েছি। ফিরে এসে আমাদের আড্ডাঘরে জমায়েত হয়েছি এই বিকেলে। এইবার একটা কিছু যে হবে এ-বিষয়ে আমাদের সন্দেহ নেই তখন। ঘনাদার ঘরে যা ছেড়ে দিয়ে আসা হয়েছে তা একেবারে ব্রহ্মাস্ত্র। ও আর বিফল হবার নয়। বাদলার দিন, তাই সলতেটা ধরতে একটু বোধহয় দেরি হচ্ছে। কিন্তু একবার ধরলে আর দেখতে হবে না। এক সঙ্গে তুবড়ি পটকা ফাটবে।
সলতেটা ধরতে দেরি হওয়ার কারণটা মনে মনে এঁচে নিয়েছি। ঘনাদার তিন কুলে কোথাও কেউ আছে বলে তো এত দিন জানতে পারিনি। সত্যিকার চিঠিপত্র তাঁর নামে আর আসে কবে? দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর মৌজ করে গড়গড়ায় টান দিতে দিতে রসিয়ে রসিয়ে পড়বার জন্যই বোধহয় চিঠিটা তিনি মজুদ রেখেছেন ধরে নিয়েছি।
