কিন্তু সেই দামি কাগজগুলো? আমাদের বিমূঢ় জিজ্ঞাসা।
আসল কাগজ তো ছিল আমার পকেটে! ঘনাদা ঈষৎ দন্ত বিকাশ করলেন, মি. হিগিনসের অ্যাটাচিতে যা ছিল তা ফাঁকি।
কিন্তু ও-অমূল্য কাগজে ছিল কী? আমি কৌতূহল চাপতে পারলাম না।
স্পেস রকেটের নতুন নকশা। শিবু আঁচ করলে।
নিউট্রন বোমার অঙ্ক। গৌরের কল্পনা।
উঁহু, আধুনিক ক-টা ছবি! শিশিরের মন্তব্য।
না, ঘনাদা আমাদের সংশষ মোচন করলেন, ছিল লেজের-এর নতুন কূট কৌশল।
লেজের-এর! আমরা হতভম্ব।
হ্যাঁ, ঘনাদা সদয় হয়ে ব্যাখ্যা করলেন, এল. এ. এস. ই. আর.। মানে, লাইট অ্যাম্পলিফিকেশন বাই স্টিমুলেটেড এমিসন অফ রেডিয়েশন। সংক্ষেপে ইংরেজি আদ্যক্ষরগুলো নিয়ে লেজের, একারটা খাটো। আর বর্গীয় জ-টা জানতি পার নার মতো। আজগুবি বিজ্ঞান কাহিনীর লেখকরাও যা কল্পনা করতে পারেনি, লেজের এযুগের মাত্র সেদিনের, ১৯৬০ সালের, সেই যুগান্তকারী আবিষ্কার ও উদ্ভাবন। এ এমন তীব্র তীক্ষ্ণ আলোর রেখা যে দশ মাইল দূরে ফেললেও কয়েক ফুট মাত্র ছড়ায়। এ আলো দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে সুর্যের লক্ষ লক্ষ গুণ উত্তাপ সৃষ্টি করা যায়। এ আলোর রেখা মারফত বেতারের চেয়ে ভালভাবে মানুষের কণ্ঠ আর যে-কোনও ছবি পাঠান যায়। একটা এ-আলোর রেখা এই ভারতবর্ষে এই মুহূর্তে যেখানে যত টেলিফোনের আলাপ হচ্ছে সব বইতে পারে। প্রথম যেলেজের যন্ত্র তৈরি হয় তাতে চুনির ভেতর দিয়ে শুধু একটি রঙের লাল আলোই বার হত। আর্গন, ক্রিপ্টন গোছের গ্যাস ব্যবহারের কৌশলে এখন অন্তত ষাট-সত্তর রঙের লেজের আলো বার করবার উপায় উদ্ভাবিত হয়েছে। সেই আশ্চর্য উদ্ভাবনের খসড়া নিয়েই মি. হিগিন্স বিলেত থেকে আমেরিকায় যাচ্ছিলেন। এ অমূল্য কাগজ চুরি যাবার ভয়েই সঙ্গে থাকতে হয়েছিল আমায়।
কিন্তু এ আশ্চর্য উদ্ভাবনের কৌশল শুধু ওই কটা কাগজেই লেখা থাকবে কেন? গৌরের বেয়াড়া প্রশ্ন, সঙ্গে করে তা নিয়ে যাবারই বা দরকার কী? টপ সিক্রেট ডাকেই তো তা পাঠাবার কথা।
ঘনাদার কাছে কোনও উত্তর আর পাওয়া গেল না। বনোয়ারি তখন রামভুজের সদ্য ভাজা গরম অমলেটের প্লেট নিয়ে হাজির হয়েছে।
ঘনাদা তারই ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন।
গলা ব্যথার লঞ্জেসও রয়েছে, ঘনাদা। শিশির জানাল।
ঘনাদার ভর্তি গাল থেকে যে অস্পষ্ট আওয়াজ বেরুল, তা মনে করিয়ে দেওয়ায় খুশির, না ধরে ফেলায় বিরক্তির ঠিক বোঝা গেল না।
চোখ

হিজিবিজি আবোল তাবোল নয়।
ওপরে যা দেখা যাচ্ছে ওই আঁকড়ি বিকড়ি ধাঁধাটিই কষ্ট করে খাড়া করেছিলাম সকলে মিলে মাথা খাটিয়ে।
খামের ভিতর ভরতে ভরতে ভেবেছিলাম আচমকা এই বিদঘুটে প্যাঁচেই ঘনাদাকে কাবু করা যাবে।
কিন্তু আমাদের এমন সাজানো ফন্দিটা ঘনাদা এক মোক্ষম চালে ভেস্তে দেবেন ভাবতে পারিনি।
শিবু ভগ্নদূতের মতো এসে সেই চাঞ্চল্যকর সংবাদটি দিলে। না, পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রথমটা আমরা সবাই সামান্য একটু বিমূঢ় হলেও উদাসীন! কী পাওয়া যাচ্ছে না? জিজ্ঞাসা করলে শিশির।
পাওয়া যাচ্ছে না কাকে? ঘনাদাকে? গৌরের প্রশ্নে একটু কৌতুকের আভাস।
না, ঘনাদা বহাল তবিয়তেই আছেন তাঁর টঙের ঘরে, কিন্তু শিবু একটু থেমে, আমাদের বেশ কয়েক মুহূর্ত উদ্বিগ্ন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলিয়ে রেখে তারপর বললে, পাওয়া যাচ্ছে না তাঁর চশমা!
অ্যাঁ! আমাদের সবাইকার কণ্ঠেই এক আর্তনাদ।
চশমা পাওয়া যাচ্ছে না কী রকম! আমি সন্দিগ্ধ বিস্ময়ে বললাম তারপর, চিঠিটা দিয়ে আসবার সময়ই তো চোখে চশমা দেখলাম।
চোখে তো চশমা দেখেছ, কিন্তু চোখে চশমা দিয়ে করছিলেন কী! গৌরের জেরা—তোমার দেওয়া চিঠিটা পড়েছেন তোমার সামনে?
না। আমায় স্বীকার করতে হল চিন্তিত ভাবে, তখন শনিবারের বাজারের ফর্দটা দেখছিলেন। আমায় চি
খে দিয়ে যেতে বললেন। তারপর থেকেই চশমা উধাও! শিবু করুণ স্বরে জানাল, আমি সেই অবিশ্বাস্য কাহিনীই শুনে আসছি।
কিন্তু চশমা যাবে কোথায়? আমি উত্তেজিত হয়ে উঠলাম, ঘনাদা তো ঘর থেকে বাইরে আসেননি। চশমা ঘরেই আছে নিশ্চয়। ঘনাদা খুঁজেছেন?
তন্ন তন্ন করে। শিবু মুখের একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করে জানাল, অন্তত ঘনাদার উক্তি তা-ই।
বেশ, আমরা গিয়ে খুঁজছি চলল। গৌর উৎসাহভরে উঠে দাঁড়াল।
তিষ্ঠ বন্ধু। শিবু বাধা দিলে, কোনও লাভ নেই। আমি কি ঘনাদাকে ওইটুকু সাহায্যও করতে চাইনি মনে করেছ! কিন্তু ঘনাদা তাতে নারাজ। যা গেছে তার জন্যে ঘরদোর তছনছ করা উনি পছন্দ করেন না।
পছন্দ করেন না! শিশিরের মুখে অবিশ্বাসের বিস্ময়, ওঁর ঘরে আছে কী যে তছনছ হবে! দুটো তোবড়ানো চটাওঠা টিনের তোরঙ্গ, একটা আলনা আর শেলফের তাকে টিকে তামাক ছাড়া ক-টা আমাদেরই দেওয়া টুকিটাকি! এ-ছাড়া তো শুধু তক্তপোশের বিছানা, কটা টুল আর গড়গড়াটা। তছনছ হবেটা কী?
জানি না! শিবু দীর্ঘনিশ্বাস ফেললে, কিন্তু খুঁজে দেখবার নাম করতেই প্রায় খাপ্পা হয়ে উঠলেন। বললেন, খুঁজবেটা কী? আমার চশমা আমি নিজে খুঁজতে কিছু বাকি রেখেছি! কী ও পাবার নয়।
তার মানে ও-চশমা এখন আর ঘনাদা খুঁজে পাবেন না! গৌর হতাশ স্বরে বললে, চশমা না পেলে আর ও-চিঠি পড়া হবে না। আর যদি চিঠি না পড়া হয় তা হলে…
তা হলে এত তোড়জোড় ফন্দিফিকির খাটুনি হয়রানি সবই মাটি! শিশির গৌরের অসমাপ্ত আক্ষেপটা পূরণ করে দিলে।