তাহলে আপনার বিপদ, আই, জি, ওয়াই-এর ঘাঁটি খোঁজার কথা, সব মিথ্যে! আমি যেন দিশাহারা।
তোর মতো একটা গবেটকে যারা হিগিন্সকে আগলাবার জন্যে পাঠিয়েছে তাদের বুদ্ধিকেও বলিহারি! পেরীন যেন গায়ে থুতু দেবার মতো করে বললে, এই পঞ্চাশ হাজার বর্গমাইল ধুধু বরফের রাজ্যে আই. জি. ওয়াই.-এর একটা কুঁড়ের মতো আস্তানা খুঁজে বার করা খড়ের গাদায় ছুঁচ খুঁজে বার করার চেয়ে যে শক্ত সে হুঁশটুকুও তোর হয়নি। কিন্তু আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। প্লেন বোধহয় এতক্ষণে চালু হয়ে এসেছে। তোর কবরের ব্যবস্থা করে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে এবার।
সত্যি একলাই ফিরে যাবেন। আমি যেন সমস্ত ব্যাপারটা এখনও বিশ্বাস করতে পেরে ভ্যাবাচ্যাকা—ওরা যখন আমার কথা জিজ্ঞাসা করবে?
আমায় জিজ্ঞেস করবে কে? পেরীন ঘেঁকিয়ে উঠল, আমার সঙ্গে তোকে আসতে কেউ দেখেছে! তুই যে নেই এ-গোলমালে তা কেউ খেয়ালই করবে না। খেয়াল পরে কোনও সময়ে অবশ্য হবে, কিন্তু তখন প্লেন উত্তর মেরু পেরিয়ে বোধহয় প্রশান্ত মহাসাগরের নাগাল পেয়েছে। তুই তখন সব খোঁজাখুঁজির বাইরে।
এই ফাটলেই তাহলে ফেলে দেবেন বলছেন! হতাশ করুণ সুরে বলে ফাটলটা আর একবার দেখবার জন্যই যেন পেরীনের দিকে পিছু ফিরলাম।
সেই মুহূর্তে পেরীন বুনো মোষের মতো পেছন থেকে সজোরে ঠেলা দিলে।
তৈরিই ছিলাম। তবু হাত বাড়িয়ে ধরে না ফেললে পেরীন সেই হাঁ করা পাতালে বোধহয় তলিয়েই যেত।
ধরে-ফেলা তার হাতটা ফাটলের পাড়ে বরফের একটা ধাঁজে লাগিয়ে দিয়ে বললাম, শক্ত করে ধরুন, সেনর পেরীন। আপনার যা দু-মনি বালির বস্তার মতো লাশ তাতে আগেই যদি বরফের পাড় ধসে না যায় তা হলে মিনিট পাঁচেক অন্তত টিকে থাকতে পারবেন।
প্রাণপণে দু-হাতে বরফের খাঁজটা ধরে অতল ফাটলের ওপর ঝুলতে ঝুলতে পেরীন ভয়ে কাঁপা ধরা গলায় কোনও রকমে বললে, আমি—আমি
হ্যাঁ, আপনি আমার জন্য ভাল সমাধিরই ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু আমার মতো সামান্য একটা পোকামাকড়ের পক্ষে এমন সমাধি একটু বেমানান নয়? বরফের পিরামিডটা আনার কবরেরই মান রাখবে।
আমি আর ধরে থাকতে পারছি না। এবার একটু দম পেয়ে পেরীন আর্তনাদ করে উঠল, আমায় বাঁচাও। এবার আমি তোমাকে অনেক অনেক টাকা দেব। এত টাকা তুমি ভাবতে পারো না।
সত্যি বলছেন? আমি যেন একটু দোমনা, কিন্তু টাকার আমার ভাবনা কী। আপনার পকেটেই যেকটা কাগজ চুরি করে রেখেছেন সেগুলো পেলেই তো আমি টাকা রাখবার জায়গা পাব না।
পাড়ের ধার থেকে ঝুঁকে পেরীনের পার্কা থেকে শুরু করে সাতপুরু জামার তলায় হাত চালিয়ে তার শার্টের ভেতরের পকেট থেকে খামে-ভরা কাগজগুলো বার করে নিয়ে বললাম, কিছু মনে করবেন না। কখন আপনি এফাটলে তলিয়ে যান কিছু ঠিক নেই তো, তাই এগুলো আগেই বার করে নিলাম।
আমার হাত অবশ হয়ে আসছে। পেরীনের এবার প্রায় ড়ুকরে কান্না। আপনাকে দিব্যি গেলে বলছি, নিজে থেকে আমি ধরা দেব, সব ষড়যন্ত্রের কথা কবুল করে যারা যারা এর ভেতর আছে ধরিয়ে দেব। আমায় বাঁচান।
দেখুন দিকি! বড় ফাঁপরেই যেন পড়লাম। আট হাজার ফুট ফাটলে নামিয়ে দিচ্ছিলেন, এখন আবার তুই থেকে আপনিতে তুলে লজ্জা দিচ্ছেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রের কথা জানাবার জন্য আপনাকে বাঁচাবার দরকারই নেই যে! আপনার মতো নিরেট আহাম্মক বেইমানকে যারা এ শয়তানি কাজ হাসিল করতে নিয়েছিল তাদের বুদ্ধিকে বলিহারি। আপনি কি ভাবেন ষড়যন্ত্রের কথা জানতে আমাদের কিছু বাকি আছে? হিগিন্সকে আগলাতে নয়, আপনার ওপর নজর রাখবার জন্যই আপনার পেছনের সিটে জায়গা নিয়ে চলেছি। ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার আপনাদের হাতের মুঠোয় বলে ইঞ্জিন বিগড়ে দিয়ে এই বরফের শ্মশানে প্লেন নামাবার ব্যবস্থা করেনি। সে যাকে বলে ডাবল এজেন্ট, মানে আমাদেরই চর। আপনাদের দলের লোক সেজে এতদিন আপনাদের ধোঁকা দিয়েছে। এ অমূল্য কাগজ চুরির ষড়যন্ত্রের কথা জানা থাকলেও হাতেনাতে ধরবার জন্যেই যেন আপনারই সুবিধে করতে প্লেন এখানে নামানো হয়েছে। ঘটে যদি আপনার একটু বুদ্ধি থাকত তাহলে আমায় প্লেনের বাইরে এই সব পোশাকে দেখেই আপনার সন্দেহ হত। সাধারণ প্লেনের যাত্রী হয়ে গ্রিনল্যান্ডের ওপর ঘোরাফেরার পোশাক কেউ সঙ্গে রাখে না। এ আইসক্যাপে আই. জি. ওয়াই. এর ঘাঁটি যে এখন ধারেকাছে নেই তা আমি জানি। আপনার মিথ্যে ধাপ্পা অত সহজে বিশ্বাস করে যে আপনার সঙ্গে এসেছি সে শুধু আপনার দৌড় দেখবার জন্য। মি. হিগিনও আপনার চোরা মারে অজ্ঞান হননি। এই রকম কিছু হতে পারে আন্দাজ করেই তাঁর গায়ে বুলেট প্রুফ বর্ম আঁটা, আর মাথায় শক্ত ইস্পাতের আঁটো টুপির ওপর পরচুলা লাগানো। তিনি শুধু অজ্ঞান হবার ভান করে ছিলেন। কিন্তু আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আপনার হাত দুটো অসাড় হয়ে এসেছে বুঝতে পারছি। ভাবছি এত কষ্ট যার জন্য করলেন সেটা থেকে আপনাকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। এ-ক্রেভ্যাস কত গভীর জানি না। যতই হোক, তলায় গিয়ে খামটা খুঁজে নিতে পারবেন।
লেফাফাটা তারপর সেই ফাটলের মধ্যেই ফেলে দিলাম।
অ্যাঁ। ওই অমূল্য কাগজগুলো ফেলে দিলেন! আমাদের সকলের চোখই ছানাবড়া।
হ্যাঁ, ঘনাদা নির্বিকার, ফেলে দিতে ওই অবস্থাতেও পেরীনও প্রায় আর্তনাদ করে উঠেছিল। তাকে অবশ্য শেষ পর্যন্ত ফাটল থেকে তুলে প্লেনে নিয়ে গিয়ে হাতকড়া পরাবার ব্যবস্থা করেছিলাম।
