গ্রীনল্যান্ডের এই বরফের প্রান্তরে ঠিক তুষারপাত যাকে বলে তা খুব কমই হয়। সাদা ঢেউ খেলানো শূন্যতার ওপর দিয়ে সারাক্ষণ অসহ্য একটা গোঙানি ভোলা ঝোড়ো হাওয়া এলোমেলো ভাবে বয়, আর তাতে একটু ফুটলেই কালিয়ে-দেওয়া বরফের অগুনতি ছুঁচ যেন সূক্ষ্ম খ্যাপা ভোমরার ঝাঁকের মতো উড়ে বেড়ায়।
এইভাবে কয়েক পা আরও এগিয়েই সামনের সেই ফাটলটা দেখতে পেলাম। বরফের প্রান্তর দুফাঁক করে কত হাজার ফুট অতলে যে নেমে গেছে তার ঠিক নেই। ওপরেই ফাটলটা এদিক থেকে ওদিক প্রায় চোদ্দ ফুট চওড়া।
আমার পেছনে পেরীনও যে এসে দাঁড়িয়েছে অরোরা বোরিয়ালিসের ভুতুড়ে আলোর ফেলা ছায়া দেখেই বুঝলাম।
পেছন না ফিরেই জিজ্ঞাসা করলেন, এবার কী করবেন, সেনর পেরীন? এ ক্রেভ্যাস কতদূর লম্বা কিছু তো বোঝবার উপায় নেই। অথচ এটা পার না হলে তো আপনি যে নুনাটাক দেখাচ্ছেন সেখানে পৌঁছোনো যাবে না। এই দু-মনি পোশাক নিয়ে পারবেন লাফ দিয়ে পার হতে?
লাফ দেবার দরকার হবে না। স্নো মাস্ক এর ভেতর দিয়েই সেনর পেরীনের জলদগম্ভীর গলা শোনা গেল, এখান থেকেই ফিরে যাব ভাবছি, আর একলাই ফিরব।
একলাই ফিরবেন! যেন কথাটা ঠাট্টা মনে করেই গ্রাহ্য না করে হেসে উঠে নিচু হয়ে তার দিকে পিছন ফিরে বসে অতল ফাটলটা ভাল করে পরীক্ষা করতে করতে বললাম, কী ভয়ংকর ফাটল দেখেছেন। মনে হয় সোজা আট হাজার ফুট সেই পাতালে নেমে গেছে।
হ্যাঁ। পেছন থেকে আমার প্রায় ঘাড়ের ওপরে পেরীনের বাজখাঁই গলা শোনা গেল এবার, একটা কেলে গুবরে পোকার পক্ষে গোরটা একটু বেশি জমকালো হয়ে যাচ্ছে। সাড়ে আট হাজার ফুট বরফের পিরামিড মিশরের ফারাওরাও ভাবতে পারেনি।
যেন রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়ে এবার উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আপনার হঠাৎ এ-রকম ঠাট্টার মানে তো বুঝতে পারছি না, সেনর পেরীন। আপনার প্রাণ সংশয় বলে সাহায্য করবার জন্য আমায় ডেকে নিয়ে এলেন। তখন গোপনে বললেন যে এস. এ. এস.-এর এই ট্র্যান্স-পোলার ফ্লাইটের জেট হঠাৎ বিকল হয়ে এভাবে আইসক্যাপের ওপর নামার পেছনে ভয়ংকর ষড়যন্ত্র রয়েছে। প্লেনটা প্রায় নিরাপদেই নামলেও প্রথম ধাক্কায় আপনার পাশের সিটের ভদ্রলোক মি. হিগিন্সের হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক নয়। আপনাকে ঘায়েল করতে গিয়েই শত্রুরা সামান্য ভুলে নাকি মি. হিগিন্সকে জখম করে বসেছে। শত্রুরা প্লেনের ভেতরেই যাত্রী না কর্মচারী সেজে আছে আপনি বুঝতে পারেননি বলেই তাদের ভয়ে আপনি প্লেন ছেড়ে পালাবার এই ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়েছেন। এখানে আই, জি, ওয়াই.-এর বৈজ্ঞানিকদের একটা ঘাঁটি বসেছে বলে আপনার জানা আছে। প্লেন সামান্য যেটুকু জখম হয়েছে তা সারাবার ফাঁকে আপনি আমার সাহায্য চেয়েছেন সেই ঘাঁটি খুঁজে বার করবার জন্য। সীমাহীন তুষারের এই ধুধু জনমনিষ্যিহীন তেপান্তরে সে অজানা ঘাঁটি খুঁজে না পাওয়ার মানে যে কী তা বুঝেও জেনেশুনে এত বড় বিপদ ঘাড়ে নিয়ে আপনার সঙ্গী হয়েছি, আর আপনি কিনা এ-রকম বিশ্রী ঠাট্টা করছেন!
আচ্ছা, ঠাট্টা আর করব না তাহলে। অরোরা বোরিয়ালিসের ভুতুড়ে আলোর রং-বেরঙের মায়া-পর্দা দোলানো সেই গাদা তুষারের অসীম মহাশ্মশানে ছুঁচ-ফোটানো হাওয়ার অবিরাম গোঙানি ছাপিয়ে যেন সাক্ষাৎ যমদূতের মতো পেরীনের বুক কাঁপানো হাসি শোনা গেল। তারপর হাসি থামিয়ে সে চাপা গর্জন করে বললে, শোন তাহলে, হতভাগা। বরফের পিরামিডের তলায় কবর দেবার আগে তোকে সত্যি কথাগুলো শুনিয়ে দি। তুই আমায় চিনতিস না, কিন্তু তুই যে হিগিন্সকে পাহারা দেবার জন্য এ-প্লেনে যাচ্ছিস তা আমি জানতাম। এ-জেট প্লেন যে হঠাৎ বিকল হয়ে এই আইসক্যাপের ওপর নেমেছে সে আমাদেরই কারসাজিতে। এ-প্লেনের ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার আমাদের হাতের মুঠোয়। তারই কৌশলে প্লেনের ইঞ্জিন হঠাৎ বিগড়ে গেছে।
কিন্তু প্লেনের ইঞ্জিন বিগড়ে দিয়ে এই জনমানবহীন বরফের রাজ্যে নামতে বাধ্য করায় লাভটা কী? আমি যেন হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
লাভটা এখনও বুঝতে পারিসনি? পেরীন হায়নার হাসি হেসে বললে, লাভ এক ঢিলে দু-পাখি সাবাড় করা। প্লেনটা বেকায়দায় নামাবার সময় সামান্য যেটুকু ঝাঁকুনি লেগেছে তারই সুযোগ নিয়ে পাশে থেকে মাথায় ঘা দিয়ে বুড়ো হিগিন্সকে বেহুঁশ করেছি। তারপর গোলমালের মধ্যে তার অ্যাটাচিটাই তুলে নিয়ে টয়লেটে গিয়ে ঢুকেছি। সেখানে যা দরকার বার করে নিয়ে তার জায়গায় অন্য কাগজপত্র রেখে অ্যাটাচিটা আবার যথাস্থানে রেখে দিয়েছি। ফ্লাইট অফিসার আর ইঞ্জিনিয়াররা তখন প্লেন থেকে নেমে বাইরে মেরামতের কাজে লেগেছে। এবার তোর একটা ব্যবস্থা না করলে নয়। বাইরের পোশাকগুলো এয়ার ব্যাগে ভরাট ছিল। আর-একবার টয়লেটে গিয়ে সেগুলো পরে ফেলেছি। প্লেনের ভেতরে যেখানে সত্তর ডিগ্রি তাপ বাইরে সেখানে মাইনাস সত্তর। ওই গোলমাল না হলে অফিসাররা কেউ বাধা দিত। একজন স্টুয়ার্ডেস চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু পোশাক দেখিয়ে তাকে বুঝিয়ে নীচে নেমেছি। তুই যে আগেই নীচে নেমেছিস তা দেখেছি। নীচে তোকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে এই আজগুবি বিপদের কাহিনী শুনিয়েছি। এত সহজে আহাম্মকের মতো তুই এ-ফাঁদে পা দিবি তা সত্যি আশা করিনি। তখন রাজি না হলে অন্য উপায়ে তোকে সাবাড় করবার ব্যবস্থা করতে হত।
