কিন্তু একেবারে যেন থাবড়া দিয়ে বসিয়ে দিয়ে ঘনাদা নিজেই নিতান্ত অবজ্ঞার সুরে বললেন, কত আর! শ-দুই ফুট উঁচু হবে বড় জোর। সঙ্গে সঙ্গে ঘনাদা উঠে পড়েন আর কী!
আমি এবার হতাশ, কিন্তু প্রথম হেঁকা যে দিয়েছিল সেই শিশিরই মলম লাগিয়ে নরমে-গরমে এমন বাজিমাত করবে কে ভেবেছিল!
হঠাৎ খুক খুক করে দুবার কেশে নিয়ে শিশির বললে, গলাটা কেমন খুসখুস করছে। যা ডেঙ্গুর মরম চলছে। গলার জন্য একটা কিছু খেলে হয়।
আমার ঘরে থ্রোট প্যাস্টিল আছে। আনাব নাকি, ঘনাদা?
ঘনাদা প্রায় উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। আবার আরাম-কেদারায় একটু সোজা হয়ে বসে বললেন, তা থাকে যদি আনাও।
আর ভাবছি—শিশির এখন রাস্তা পেয়ে গেছে বোঝা গেল। দু-গ্রাসে নিজের প্লেটের আইসক্রিমটা সাবাড় করে মুখচোখের কাহিল অবস্থাতেই করুণ সুরে বললে, এসব বরফ-টরফ এখন না খাওয়াই ভাল। বাজারের কিছুতে তো বিশ্বাস নেই। রামভুজকে না হয় ক-টা অমলেট ভাজতেই বলি।
বলো। ঘনাদা এবার আরাম-কেদারায় গা এলিয়ে দিলেন যেন নির্লিপ্তভাবে। সেই সঙ্গে ককাপ গরম কফি! গৌর ফরমাশ করলে।
ঘনাদার মুখ থেকে আষাঢ়ের মেঘগুলো সরছে বলেই মনে হল। হঠাৎ আবার শিশিরের বেয়াড়া খোঁচা।
ঠাণ্ডাটা আপনার সয় না, না ঘনাদা? ঘাটে লাগতে লাগতে নৌকো বুঝি বানচাল হয়ে যায়। কিন্তু বিপরীতেই হিত হয়ে গেল যেন ফুসমন্তরে।
ঘনাদা তাঁর সেই পেটেন্ট নাসিকাধ্বনি ছেড়ে বললে, হ্যাঁ, তেমন আর সয় কই! শুনেছি দক্ষিণ মেরুর অভিযানে রাশিয়ানরা ভোস্টকে মাইনাস একশো পঁচিশ ডিগ্রি পেয়েছে। সেটা আমার দেখবার সৌভাগ্য এখনও হয়নি। তবে পারার থার্মোমিটার পাথর হয়ে জমে অচল হয়ে গেছল।
থার্মোমিটারের পারা জমে গেছল! স্বাভাবিক বিস্ময়ের সঙ্গে উসকানি দেবার জন্যও মুখব্যাদান করতে হল, কত ঠাণ্ডা তাহলে?
কত ঠাণ্ডা বুঝবেন কী করে! গৌর ধমক দিল, শুনছিস থার্মোমিটার জমে গেছল!
না, পারার থার্মোমিটার জমলেও ঠাণ্ডা মাপা যায়! ঘনাদার অনুকম্পা-অবজ্ঞার দৃষ্টি যত জোরালো আমাদের আশাও সেই অনুপাতে প্রবল, পারা জমে শক্ত হয়ে যায় ৩৮তে, তারপর অ্যালকোহল থার্মোগ্রাফ দরকার হয়। সে অ্যালকোহল থার্মোগ্রাফে তখন মাইনাস সত্তর।
মাইনাস সত্তর! গৌর বিনা চেষ্টাতেই চোখ কপালে তুলল, কোথায়?
দ্রাঘিমা ৪২.১২ পূর্ব-অক্ষাংশ উত্তর ৭২.৩৫।
বলা বাহুল্য ঘনাদার এই সরল সংক্ষিপ্ত সমাচারে আমরা সবাই অথই পাথারে।
শিবুই প্রথম সামলে উঠে দুবার ঢোক গিলে জিজ্ঞাসা করলে, উত্তর অক্ষাংশ বলছেন না? তার মানে আলাস্কা-টালাস্কা কি ল্যাপল্যান্ড-আইসল্যান্ড বুঝি?
না। গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পুবে সাড়ে-আট হাজার ফুট, যাকে আইস ক্যাপ বলে সেই বরফের একটা চাঁইয়ের ওপর।
সাড়ে-আট হাজার ফুট বরফের চাঁই। ঘনাদা গৌরের বেয়াদবির জবাব দিলেন বুঝে বিস্ফারিত নয়নে জিজ্ঞেস করলাম, সেখানে মানুষ থাকে?
না, থাকে না। প্রায় পঞ্চাশ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে মানুষের বসতি নেই বললেই হয়। জায়গাটা সুমেরুবৃত্তেরও চারশো মাইল উত্তরে। গ্রিনল্যান্ডের সবচেয়ে দক্ষিণের ঘাঁটি ফেয়ারওয়েল অন্তরীপ থেকে প্রায় হাজার মাইল। উত্তর মেরুও হাজার মাইলের কিছু বেশি। সেটা আই. জি. ওয়াই, মানে ইন্টারন্যাশন্যাল জিওলজিক্যাল ইয়ার বলে কয়েক মাসের জন্য এই বরফের শ্মশানে একটি বৈজ্ঞানিকের দল কাছাকাছি কোথায় একটা ঘাঁটি বসিয়ে একটা রাত কাটাতে এসেছে। এইটুকু শুধু জানতাম।
ঘনাদা ভাষণ থামিয়ে আমাদের মুখের ওপর একবার চোখ বুলোলেন। তাঁর ঠোঁটের বাঁকা হাসিটুকুর মানে না বুঝে আমি বেশ একটু অবাক।
গৌরই আমাদের মুখরক্ষা করলে। ভুরু কুঁচকে বললে, কয়েক মাস ধরে এক রাত কাটাচ্ছে, মানে ওখানে সেই ছ-মাস দিন, ছ-মাস রাত তাহলে?
ঠিক ধরেছ।ঘনাদা কিঞ্চিৎ প্রসন্ন হয়ে বললেন, তখন সেই রাত দুপুর চলছে। সূর্যের মুখ দেখা যায় না, শুধু একবার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আকাশটা একটু পরিষ্কার হয়। তবে মাঝে মাঝে উত্তর আকাশে যেন বৈদ্যুতিক আতসবাজির উৎসব লেগে যায়।
অরোরা বোরিয়ালিস! শিশির তার বিদ্যা জাহির করেই বোধহয় বিবাদ বাধালে।
হ্যাঁ, ওই বোরিয়ালিসের ভুতুড়ে আলোয় এক বিশাল সাসজির ওপর দিয়ে তখন দূরের এক নুনাটাক লক্ষ করে চলেছি।
দাঁড়ান। দাঁড়ান। শিশিরের বাহাদুরির খেসারত দিতে বাধ্য হয়েই অজ্ঞতা স্বীকার করে ঘনাদাকে থামাতে হল, ওসব শাস্ত্রীজি আর নুন-টুন আবার কী?
শাস্ত্রীজি নয়, সাসজি, আর নুন-টুন নয়, নুনাটাক। ঘনাদা কৃপা করে ব্যাখ্যা করলেন, সাসক্রজি হল ঢেউ খেলানো বরফের প্রান্তর আর নুনাটাক হল পাহাড় গোছের পাথুরে ঢিবি। প্রথম কথাটা রুশ ভাষার, দ্বিতীয়টা এস্কিমোদের থেকে পাওয়া। ওই কথাগুলোই এখানে চালু।
একটু থেমে আমাদের কুপোকাত অবস্থাটা উপভোগ করে ঘনাদা বলতে শুরু করলেন, গায়ে ভালুকের চেয়ে বোক্কড় পোশাক—পশমের পা-গেঞ্জি, হাত-গেঞ্জি, তার ওপর পশমের শার্ট পাজামা, পর-পর দু-জোড়া গরম মোজা, ভেতরে রেশমের লাইনিং দেওয়া পশমের পাকা, তার ওপর ক্যারিবো হরিণের নোমওয়ালা চামড়ার প্যান্ট আর বলগা হরিণের লোমশ চামড়ার বড় পার্কা আর মাথাঢাকা টুপি, পায়ে সিলের চামড়ার জুতো, দুহাতে পশমের দস্তানার ওপর বলগা হরিণের চামড়ার আর একটা দস্তানা, মুখে তুষার বাঁচাবার গগল্স-আঁটা মুখোশ—তা সত্ত্বেও মুখে গলায় যেখানে একটু ফাঁকা সেখানে যেন অসংখ্য অসাড় করা ছুঁচ ফুটছে।
