এই বলে আর্কি লঞ্চ থেকে লাফ দিয়ে তীরে নেমে যায়। লঞ্চটাকেও আর বেশিক্ষণ সেখানে দেখা যায়নি। সন্ধে হবার আগেই সে সাগর দ্বীপের পথে মাঝ দরিয়ায়।
ঘনাদা তাঁর কাহিনী শেষ করে যথারীতি শিশিরের সিগারেটের কৌটোটা পকেটে রেখে তাঁর টঙের ঘরের দিকে রওনা হচ্ছিলেন। একটা বাধা দিয়ে ন্যাকা সেজে বললাম, আচ্ছা আর্কিকে কেমন যেন চেনা-চেনা লাগছে।
তাই নাকি? ঘনাদা যেতে যেতে বলে গেলেন, তা–সে আর আশ্চর্য কী? আর্কির মতো মানুষের তো পথে-ঘাটে ছড়াছড়ি।
এ জবাব পাবার পর কারও মুখে আর কোনও কথা ফোটে!
আমরা এ ওর মুখের দিকে চেয়ে একেবারে চুপ।
শিবুই প্রথম যেন জিভের সাড় ফিরে পেয়ে জানতে চাইল, কী, মৌ-কা-সা-বি-স-এর হদিস কিছু মিলল! কী বুঝছ! এক, না বহুবচন?
ঘনাদা নিত্য নতুন (গল্পগ্রন্থ)
ঘনাদা কুলপি খান না
ঘনাদা বললেন, না।
আমরাও সবাই হাঁ।
ঠাণ্ডা গরম কোনও রকম লড়াই চলছে না, বাইরে সাদা মেঘের হ্যান্ডবিল হড়ানো শরতের আকাশ যেন পুজোর বাজারের মতো প্রসন্ন, কদিন ধরে আমাদের বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের আবহাওয়াও তাই।
এই গোলমেলে সময়েও শিবু ট্রেনে করে প্রথমে গড়িয়াহাট, তারপর সোনারপুর, শেষে ক্যানিং পর্যন্ত ধাওয়া করে চিংডি, ভেটকি, এমনকী গাঙের ইলিশ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। সরষের তেলের অভাবটা বাদাম তেলে সরষের গুঁড়ো মিশিয়ে টের পেতে দেওয়া হয়নি। শিশির একটা করে নতুন সিগারেটের টিন একদিন অন্তর খুলে আর হিসেব রাখছে না, ঘনাদা দুবেলা আমাদের আড্ডাঘরে নিজে থেকে হাজিরে দিয়ে এ-পর্যন্ত গালগল্পের দু-চারটে মাত্র ফুলঝুরি ছাড়লেও, তুবড়ি পটকার আশায় আমরা সমানে জল-উঁচু জল-নিচু মেপে তাঁর সঙ্গে তাল দিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ তাহলে ঘনাদার এমন ঘাড় বাঁকাবার কারণ কী?
আর বেঁকে দাঁড়ালেন কীসে? শহরের সেরা আইসক্রিমে!
অনেক ভেবেচিন্তে এ-আইসক্রিমের ব্যবস্থা করেছিলাম। পাড়ার বিখ্যাত তেলেভাজার ওপর আর ভরসা নেই। সরষের তেল যখন মহাজনের গোডাউনে নারকেল তেলের টিনে অজ্ঞাতবাস করছে, তখন তেলেভাজা খেতে মোবিল না সায়ানাইড কী পেটে যাবে ঠিক কী? বড় রাস্তার রেস্তোরাঁর চপ কাটলেটও চোখ বুজে আর মুখে ফেলবার নয়। সামনেই কাঠের আড়ত। আর কিছু না হোক সেখানকার করাতের গুঁড়ো এ বাজারে কাজে লাগতেও তো পারে।
অনেক বিচার-বিবেচনা করে তাই শহরের সেরা কোম্পানির কুলপি মানে আইসক্রিম আনিয়েছিলাম আজ বিকেলে।
এ কুলপিতে ছিটেফোঁটার বদলে গল্পের একটা বড় চাঁই যদি জমে এই আশা। বনোয়ারি বড় ট্রেতে আইসক্রিমের প্লেটগুলো সাজিয়ে আনতেই ঘনাদার চোখে একটু ঝিলিক দেবে ভেবেছিলাম।
তা তো নয়ই। একসঙ্গে দু-দুটো টুটি্যুটি সমেত সবচেয়ে বড় প্লেটটা তাঁর দিকে এগিয়ে দিতেই ঘনাদা যেন রবিবর্মার ছবির বিশ্বামিত্রের মতো মেনকার কোলে শকুন্তলাকে দেখে শিউরে উঠে নিষেধের হাত তুলে মুখ ফেরালেন।
সে কী ঘনাদা! শিশির অবাক হয়ে বললে, আইসক্রিম খাবেন না?
একেবারে বাজারের সেরা কুলপিবরফ, শিবু পঞ্চমুখ হয়ে উঠল, ম্যাগলিটি থেকে স্পেশ্যাল অর্ডার দিয়ে আনানো। জিভে ঠেকতে না ঠেকতে প্রাণ মন জুড়িয়ে যায়। এ কুলপি খাবেন না।
না।ঘনাদার এই সংক্ষিপ্ত যুক্তাক্ষরবর্জিত প্রত্যাখ্যানেই আমরা একেবারে হাঁ।
গৌর তবু একবার ওকালতি করে দেখল, এ আর সেই মাটির হাঁড়ির ময়দা আটা টিনের খোলের নোংরা কুলপি নয়। দস্তুরমতো বৈদ্যুতিক যন্ত্রে তৈরি। হস্ত দ্বারা অস্পষ্ট। একটু শুধু চোখেই দেখুন না।
ভবি তবু তোলবার নয়। সামনে যেন নিমের পাঁচন ধরা হয়েছে এমনইভাবে মুখ বেঁকিয়ে ঘনাদা হাতের শুধু কনিষ্ঠা, অনামিকা ও মধ্যমা নেড়ে সরিয়ে নিয়ে যাবার ইঙ্গিত করলেন।
বরফ খেলে দাঁত কনকন করে বুঝি? মুখ ফসকে কথাটা বেরিয়ে যেতেই তটস্থ হয়ে উঠলাম। ঘনাদার বাঁধানো দাঁত ধরা পড়ার সে কেলেঙ্কারি তো ভোলবার নয়। তারপর থেকে সাবধানে সে-উল্লেখ আমরা এড়িয়েই যাই। আজ হঠাৎ আমার ভুলেই na ঘনাদা আরামকেদারা ছেড়ে উঠে পড়েন।
বেফাঁস কথাটা সামলাতে যাচ্ছি, হঠাৎ শিশির যেন আমার বেয়াদবির খেই ধরেই উলটো হাওয়া দিয়ে বসল।
না না, দাঁত কনকন নয়, ঘনাদা ওই পেল্লায় ম্যাগনাম সাইজ দেখেই ভয় পাচ্ছেন। বরফ তো নয়, যেন একজোড়া কোলবালিশ!
ঘনাদা আর অত বড় বরফ দেখেননি কখনও? শিবু শিশিরকে বকুনি দেওয়ার ছলে একটু খোঁচা লাগল।
দেখবেন না কেন? গৌর আর একটু ফুটিয়ে দিলে, বরফের দোকানে কাঠের গুঁড়ো মাখানো চাঁই দেখেছেন। তার বেশি তো কিছু নয়।
কেন? আমি সরল প্রতিবাদ জানালাম, দুনিয়া এসপার-ওসপার করে ঘনাদা একটা আইসবার্গও দেখেননি কখনও! এই তো সেবার সেই ছড়ির কল্যাণে দক্ষিণ মেরু থেকে বেঁচে ফেরবার পথে আইসবার্গের ওপরই পড়েছিলেন।
আকাশে আজ দু-চারটে হালকা সাদা মেঘ ছাড়া কিছু নেই। কালো মেঘগুলো সব ঘনাদার মুখেই এসে জমছে টের পাচ্ছিলাম। আমি শঙ্কিত হলেও গৌর কিন্তু তাতেও যেন ভ্রুক্ষেপ না করে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললে, হ্যাঁ, ওই আইসবার্গ পর্যন্তই বলতে পারো!
আইসবার্গটা বুঝি কিছুনা! ঘনাদার নাম বাঁচাতে আমাকেই কোমর বাঁধতে হল, সেটা কত বড় হবে, ঘনাদা?
উৎসুকভাবে ঘনাদার দিকে চোখ কপালে তোলবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে তাকালাম। আইসবার্গটা এভারেস্ট না ছাড়াক, আলপস কি অ্যান্ডিজকে লজ্জা দেবে-ই নিশ্চয়।
