আর্কি যেন এ কথায় কৃতার্থ হয়ে গদগদ স্বরে বলে, আজ্ঞে আপনি খুশি হয়েছেন জেনে আমি ধন্য। আপনি আমাদের এ সুন্দরবনের বনে বাদাড়ে আঁছাড়ে-পাঁছাড়ে এত কষ্ট করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আর আপনাকে খুশি করব না। বাঃ! আরও শুনুন তাহলে।
আর্কি আবার তার টেপ-রেকর্ডটা চালিয়ে দেয়।
কিন্তু এ কী বার হচ্ছে ভেতর থেকে?
লঞ্চের মালিক প্রথমে চমকে যান, তারপর কেমন একটু অস্বস্তিতে যেন বেশ। অস্থির হয়ে পড়েন।
টেপ-রেকর্ডারে তখন আর এ অঞ্চলের লোকসঙ্গীত বাজছে না। তার বদলে লঞ্চের মালিকের নিজের দেশের ভাষাতেই শোনা যাচ্ছে, কোনও ভাবনা নেই, মি. হার্টন! লোকসঙ্গীত খোঁজার নামে সত্যিসত্যি যা আপনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন তারই সন্ধান আমার কাছে আপনি পাবেন। আপনার লোভ তো ওই এখানকার যেখানে সেখানে জন্মানো আগাছাতে। যাকে বৈজ্ঞানিক নামটার বদলে আমরা শুধু কচালিই বলতে পারি।
কিন্তু এই কচালির জন্য কেন আপনার এমন লালসা তাই একটু আপনার কাছে আগে জানতে ইচ্ছে করে। এ আগাছা যে এখন পৃথিবীর সাত রাজার ধনমানিক সেই হাইড্রোকার্বনে ভর্তি তা আপনি জানেন বুঝলাম। কিন্তু এ অমূল্য আগাছা তো আপনাদের অত বড় দেশের কোথাও পাওয়া যায় না। আপনাদের দেশ কেন, পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই এই কচালির কিছুকিছু পাওয়া যায়। যাও বা পাওয়া যায় তা আমাদের এই এখানকার মতো অজস্র নয়। তাহলে এই আগাছায় আপনাদের এত লোভ কেন! এখান থেকে এ কচালি তুলে নিয়ে চাষ করবেন নিজের দেশে? সে তো ন-মাস ছ-মাসের নয়, কিছু না থোক দশ-বিশ বছরের ব্যাপার
থামাও! থামাও তোমার রেকর্ডার।লঞ্চের মালিক এতক্ষণে আর ধৈর্য ধরতে না পেরে গর্জন করে ওঠেন, কী শোনাচ্ছ এসব আমাকে?
লঞ্চের মালিকের ধমকের সঙ্গে সঙ্গে আর্কি তার রেকর্ডার বন্ধ করে দিয়েছিল। এবার যেন ভয়ে ভয়ে মিনতি করে বলে, আপনার ভাল লাগছে না বুঝি! আর একটু শুনুন তাহলে, ভাল লাগবে। না লেগে পারে না।
আর্কি রেকর্ডার আবার চালু করে দিয়ে বলে, দামি কথা এইবারটা পাবেন।
রেকর্ডারে তখন শোনা যায়—দশ-বিশ বৎসরই না হয় আপনারা অপেক্ষা করতে রাজি বুঝলাম। কিন্তু শুধু এই কচালি জন্মালেই তো হল না। এ কচালি নিংড়োলে যা বেরুবে সে তো আর আসলি মাল নয়—
থামাও, থামাও, তোমার রেকর্ডার! আমি শুনতে চাই না, বলে এবার চিৎকার করে ওঠেন লঞ্চের মালিক। কাকে তুমি কী শোনাতে এসেছ?
লঞ্চের মালিক থামাও বলে চিৎকার করে উঠতে আর্কি তার যন্তরটা বন্ধ করে দিয়েছিল। তারপর ধৈর্য ধরে মালিকের কথা শুনে যেন অবোধকে বোঝাচ্ছে এমনই মিষ্টি করে বলে, আচ্ছা! আচ্ছা, ও টেপ রেকর্ডারে শুনতে হবে না। যা বলবার আমি মুখেই বলছি, শুনুন। ওই কচালিতে প্রচুর হাইড্রোকার্বন আছে এটা ঠিক, কিন্তু সেটা হল মোটা মাল, তাতে দু শিকলি গ্রন্থিতে ১৪টা করে কার্বন অ্যাটম, ২৪টা করে হাইড্রোজেন অ্যাটমের সরু জোড়া। কোনও ইঞ্জিন চালাবার পক্ষে তা অচল—
আর্কির কথা বলার মধ্যেই লঞ্চের সেই সাদা অসুর খালাসি কেবিনের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
লঞ্চের মালিক রাগে মুখ রাঙা করে তার দিকে তাকিয়ে হুকুম দেন, এই মর্কট আর ওর যন্তরটাকে গাঙের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এসো তো ড্যানি—এখুনি দাও গিয়ে।
এর চেয়ে পছন্দসই কাজ ড্যানির কাছে আর কিছু হতে পারে না। শুধু ছুঁড়ে ফেলা ন্য, সেই সঙ্গে মর্কটটার একটা হাত কাঁধ থেকে মুচড়ে খুলে নেবার সাধু ইচ্ছে নিয়ে ড্যানি আর্কির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
দাঁড়ান, দাঁড়ান! অত ব্যস্ত কেন? ঝাঁপিয়ে পড়া ড্যানি তখন যেখানে সচাপ্টে মেঝের ওপর আছড়ে পড়েছে সেদিকে এবার করুণার দৃষ্টি ফেলে আর্কি বলে যায়, আমার শেষ ক-টা কথা শুধু বলে যাই। তাতে সময় আর কতটুকু লাগবে! ওই যে অচল হাইড্রোকার্বনের কথা বললাম তাকে যাকে বলে খুচরো চোলাই, অর্থাৎ ফ্র্যাকশন্যাল ডিস্টিলেশন, করে সরল সচল করা এমন কিছু অসাধ্য ব্যাপার নয়। ঠিক মতো একটা ক্যাটালিস্ট খুঁজে বার করা এমন কিছু অসাধ্য ব্যাপার নয়। ঠিক মতো একটা ক্যাটালিস্ট খুঁজে বার করতে পারলেই হল। আরে, এই দেখো! ধীরে সুস্থে কথাটা শেষ করতে দিলে না—
আর্কির কথার মধ্যে ধলা গোরিলাটা মেঝে থেকে উঠে তখন আর্কির ওপর আবার ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কিন্তু ওই ঝাঁপিয়ে পড়াই সার। আর্কিকে জাপটে ধরার বদলে পরমুহুর্তে নিজেই সে বাইরের ডেকে ধরাশায়ী।
সেদিকে চেয়ে বেশ একটু সহানুভূতির সঙ্গে আর্কি বলে, হাড়গোড় আবার না ভেঙে থাকে বেচারার। সারারাত এখন আবার লঞ্চ চালাতে হবে তো।
ড্যানির দিক থেকে লঞ্চের মালিকের দিকে মুখ ফিরিয়ে আর্কি এবার বলে, হ্যাঁ, আপনাদের আবার হাতে বেশি সময়ও নেই। তাই যা বলছিলাম তাড়াতাড়ি সারছি। ওই ক্যাটালিস্ট মানে-যে শুধু দু-হাত এক করার ব্যবস্থা করে নিজে বাইরে থাকে। তেমনই গোছের হাইড্রোকার্বনকে মিহি করবার ঘটক আবিষ্কার করার পথে প্রায় বুড়ি ছুঁয়ে ফেলেছেন তার নাগাল পেলেই আপনার সুবিধে হত খুব বেশি। লোকসঙ্গীত খোঁজার নামে তার খোঁজও খুব বেশি করে করেছিলেন। কিন্তু সে খোঁজা সার্থক আর হল না। যাকে খুঁজছিলেন তিনি জানতেও পারলেন না, পারলে তাকে চুরি করে নিজেদের মুলুকে পাচার করবার মতলব নিয়ে এক দুশমনের জুড়ি এই এত কাছাকাছি ঘুরে বেড়াচ্ছিল। যাক, আর দেরি করব না। আপনার ড্যানি ডেকের ধার থেকে একটা লোহার হাতুড়ি জোগাড় করেছে দেখছি। সেই হাতুড়ি আমার মাথায় ভাঙবার সদিচ্ছা নিয়ে আমার দিকে আসছে। তবে এবার আর বুনো মোয-টোষের মতো নয়। যত নিরেটই হোক, মানুষ ঠেকে শেখে। ও তাই এবার হুশিয়ার হয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। আমার এ সব মারামারি-টারামারি ভাল লাগে না। তবু বাধ্য হয়ে আর একবার এই কেবিনের ওই কোণের টেবিলটার ধারে ওর ঘাড়মুখ গুঁজে পড়া দেখে যেতে হবে। তবে বেশি জোরে পড়বে না। হাড়গোেড় আস্ত না থাকলে এখন থেকে সারারাত লঞ্চ চালিয়ে সকালের আগেই সাগর দ্বীপে পৌঁছবে কী করে!—হ্যাঁ, এই দেখুন তেমন বেশি জখম হয়নি। দরকার হলে মুখেচোখে একটু লোনাজলের ছিটে দিলেই চাঙ্গা হয়ে উঠবে। আর তখুনি লঞ্চ চালু করে সাগর দ্বীপের দিকে রওনা হবেন। সেখানে পৌছবার পর কী করতে হবে তা আর আপনাকে বলে দিতে হবে না নিশ্চয়। আগের ব্যবস্থামতো হেলিকপ্টারটা যদি আসে তাহলে কোনও ভাবনাই নেই। হেলিকপ্টারে চড়বার আগে লঞ্চটা ওই দ্বীপের কাছাকাছি সমুদ্রে ড়ুবিয়ে দিয়ে যাবেন। ওরকম একটা লঞ্চের লোকসান গ্রাহ্য না করার ক্ষমতা আপনাদের আছে। আর যদি নেহাত কোনও কারণে হেলিকপ্টার সময়মতো না এসে পৌছয় তাহলে লঞ্চে করে সামান্য একটা পাড়ি দিলেই আপনারা নিরাপদ। তবে এসব কথা মিছে মিছে বকে মরছি। আমি জানি আজ আর একটু রাত হবার পর আপনাদের চুলের টিকি আর এ তটে দেখা যাবে না। কারণ আপনি জানেন যে রাত পোহাবার আগেই এ মুলুক থেকে একেবারে হাওয়া না হয়ে গেলে ধরা পড়ে যে-কেলেঙ্কারিট হবে তাতে আপনাদের নিজেদেরই গোয়েন্দা দপ্তর আনাড়িপনার জন্য কী দারুণ শাস্তি আপনাদের দেবে। সুতরাং গুডনাইট আর গুডবাই জানিয়ে চলে যাচ্ছি। আপনার ড্যানি একটু যেরকম নড়ছে তার মুখে এক জগ জল ঢাললেই উঠে বসবে। আচ্ছা! গুডলাক পরের বার।
