না, না। সবেগে মাথা নেড়ে চক্ষুকর্ণের সব সাক্ষ্য অস্বীকার করে ডাহা মিথ্যাটায় সায় দিতে হয়।
দেখবে কেমন করে! ঘনাদা প্রসন্ন হয়ে আবার শুরু করেন—আমি তো তখন বাহাত্তর নম্বরের ধারে কাছে নেই।
এতটু থেমে নিজের কথাগুলোর গুরুত্বটা বুঝিয়ে দিয়ে ঘনাদা আবার বলেন, তা বলে আমায় আমাদের সরোবরসভাতে দেখা গেছে যেন কেউ ভেবো না। তার বদলে আধময়লা ছেঁড়াছেঁড়া বেঢপ কোট প্যান্টালুন পরা, সুতো দিয়ে ভাঙা-ডাঁটি বাঁধা নাকের ওপর ঝুলে-পড়া একটা নিকেলের চশমা চোখে দেওয়া এক বুড়োটে ভিখিরি গোছের মানুষ, পায়ে তালি দেওয়া ক্যাম্বিশের জুতো আর তারই সঙ্গে তাল রাখা ছেঁড়া ক্যাম্বিশের একটা ব্যাগ নিয়ে ডায়মন্ডহারবারের গঙ্গার ধারের নোঙর ফেলা একটা ছোট্ট লঞ্চের কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
লঞ্চটা তো গাঙের ধারে এক আঘাটায় বাঁধা। সেখানে ওই শুটকো টেট্যাঁস গোছের চেহারার বুড়োটে লোকটা করছে কী।
আর কিছু নয়, কাকুতিমিনতি করে কথা বলছে লঞ্চের ওপরে দাঁড়ানো এক খালাসির সঙ্গে।
খালাসি যাকে বলছি যেমন তেমন সাধারণ খালাসি সে কিন্তু নয়। আঁটসাঁট টি-শার্ট, প্রায় হাঁটু পর্যন্ত গুটোনো লম্বা খাকি ট্রাউজারে তাকে খালাসির মতো দেখালেও সে বোধহয় তার চেয়ে বেশি কিছু।
প্রথমত, এদেশের মানুষই সে নয়। রোদে জলে তামাটে হয়ে এলেও সে যে আদতে সাদা চামড়ার দেশের লোক তা দেখলেই বোঝা যায়। আর সেই সাদা চামড়ায় সে এক দৈত্যবিশেষ।
যেমন তার চেহারা, মেজাজও তেমনই বিদঘুটে। চেহারায় সাদা গোরিলা আর মেজাজে একটা খ্যাপা নেকড়ে বললে কিছুটা তাকে বোঝানো যায়।
শুটকো বুড়োটে মানুষটা যত তাকে কাকুতিমিনতি করে বলছে, শুনুন, শুনুন, আমার নাম আর্কি—আর্কি ট্রেগার—
কী বললি! ডার্টি বেগার! শোন, ডার্টি বেগার—
না, না, ডার্টি নয়, আর্কি, আর বেগার নয়—
আর্কি নামে বুড়োটে মানুষটার আর কথা শেষ করা হয় না। তাকে কথার মাঝখানেই ধমকে থামিয়ে দিয়ে সাদা গোরিলাটা বলে, তুই আর্কি নয়, ডার্টি বেগার। শোন হতভাগা ডার্টি বেগার, এখানে দাঁড়িয়ে আর যদি বেশি জ্বালাতন করিস তো টুটি ধরে তুলে এনে এই ডেকের ওপর আছড়ে গাঙের জলেই ফেলে দেব। এখনও তুই, ভালয় ভালয় বলছি, দূর হ এখান থেকে।
উটকো বুড়োটে আর্কি তবু নাছোড়বান্দা। কাতরভাবে বলে যায়—-কেন এত নিষ্ঠুর হচ্ছেন? আপনার কর্তাকে একবারটি শুধু খবর দিন এই বলে যে আর্কি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। আপনার কর্তার সঙ্গে আমার এই গাঙের পারের রাস্তাতেই দেখা হয়েছে। তিনি যা চান আমি সেই এ মুলুকের চাষাভুষো মাঝিমাল্লার গানের নমুনা জোগাড় করে তাঁকে শোনাতে এসেছি। একবারটি শুধু দয়া করে—
ধলা অসুরটা আর্কির কথা শুনতে শুনতে যেভাবে দাঁতে দাঁতে ঘসতে ঘসতে হাতদুটো মুঠো করছিল তাতে মনে হচ্ছিল সত্যি সত্যিই সে এবার সেই শুটকো আর্কিকে টুটি টিপে লঞ্চের ওপর তুলে আছাড় মারবে! কিন্তু তার সুযোগ মিলল না। সে কিছু করার আগেই লঞ্চের মালিক নিজে থেকেই ভেতরের কেবিন থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে ওদের দুজনকে দূর থেকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কে? কে ওখানে? কার সঙ্গে কথা বলছ, ড্যানি?
দানো শব্দটারই যেন মোচড়ানো রূপ। ড্যানিই তাহলে লঞ্চের খালাসি দৈত্যটার নাম! ড্যানি কিন্তু কিছু জবাব দেবার আগেই বুড়োটে শুটকো আর্কি কাতরভাবে চেঁচিয়ে জানায়, আজ্ঞে, আমি আর্কি, আর্কি ট্রেগার। আপনাকে সেদিন রাস্তায়—
আর্কিকে আর কিছু বলতে হয় না। লঞ্চের মালিকও কমবয়সী জোয়ান নন। পোশাকে-আশাকে না হোক, চেহারায় তো দুজনের মধ্যে কোথায় একটা মিল আছে। আর্কির মতো খেতে না-পাওয়া চেহারা না হলেও তিনিও বুড়োটে এবং শীর্ণ। আর্কির মতো চোখেও কম দেখেন।
আর্কির কথার মধ্যে তিনি সামনে এগিয়ে এসে তাকে দেখে চিনতে পারেন আর সেই সঙ্গে আর্কির আর্জি মঞ্জুর হয়ে যায়।
আরে তুমি, বলে লঞ্চের মালিক নিজে থেকেই তাকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, তুমি সত্যি এসেছ? আরে এসো এসো, ওপরে এসো।
এরপর ড্যানির দিকে ফিরে তিনি আর্কির চলে আসার সুবিধের জন্য লঞ্চটাকে আর একটু এগিয়ে একেবারে তীরের গা ঘেঁসে লাগাতে বলেন।
এবার তাই করতে হয় ড্যানিকে। কিন্তু মুখটা তখন তার দেখবার মতো। চোখ দুটো যেন জ্বলছে।
সে জ্বলুনির একটা শোধ না নিয়ে ছাড়ে না।
লঞ্চের মালিক আর্কিকে ওপরে আসার সুবিধে করে দিতে ড্যানিকে হুকুম দিয়ে আবার ভেতরের কেবিনে গিয়ে ঢুকেছিলেন। লঞ্চে উঠে ভেতরের সেই কামরার দিকে যেতে গিয়ে আর্কি সচাপ্টে ডেকের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে যায়।
পা পিছলেটিছলে নয়, পড়ে যায় আর্কির যাবার পথে ড্যানি হঠাৎ পা বাড়িয়ে তাকে লেঙ্গি মারায়।
ডেকের ওপর বেশ জোরেই আর্কি মুখ থুবড়ে পড়েছিল। চট করে ওঠা তার হয়।। বেশ খানিক বাদে গা-হাত-পা ঝাড়তে ঝাড়তে সে কিন্তু ড্যানির দিকে একবার ফিরে চেয়েও দেখে না। ক্ষোভও জানায় না কিছু। মুখ বুজে মাথা নিচু করে সে এরপর লঞ্চের কেবিনে গিয়ে ঢোকে।
কেবিনে ঢুকে আর্কি কি কোনও নালিশ জানায় লঞ্চের মালিকের কাছে? মোটেই না।
তার বদলে খানিকবাদে তাকে সত্যিই তার তালি-মারা ক্যাম্বিশের ব্যাগ থেকে। একটা টেপ-রেকর্ডার বার করে তা থেকে কয়েকরকম লোকসঙ্গীত বাজিয়ে মালিককে শোনাতে দেখা যায়।
মালিক খুশি হয়ে মাথা নেড়ে বললেন, খুব ভাল। এ রকম যত গান আমায় সংগ্রহ করে দিতে পারবে আমি তোমায় প্রত্যেকটির জন্য মোটা বকশিস দেব।
