রহস্যটার একটা মীমাংসা তাই না করলেই নয়।
কিন্তু কীভাবে সে ব্যাপারে অগ্রসর হওয়া যায় ঠিক মতো বুঝতে না পেরে আপাতত শিবুর ওপরেই একটু চড়াও হয়ে বললাম, এতক্ষণ লেটারবক্স হাতড়ে তুই শুধু এই লেখাটুকু পেলি?
তার মানে? হঠাৎ আক্রমণটা কোন দিক দিয়ে যায়—কেনই বা এমন বেয়াড়া হয়ে ওঠে তা বুঝতে না পেরে শিবু বেশ একটু গরম মেজাজ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, কী বলতে চাইছিস তোরা।
আমরা-আমরা মানে— বলবার কিছু না পেয়ে আমরা তখন তোতলামিতে পৌঁছে গেছি।
আমাদের হয়ে শিবুই কথাগুলো গরম মেজাজে জানিয়ে দিলে, তার মানে আমি ওই কাটা কার্ডের টুকরোটা লিখে আনতে দেরি করছিলাম বলতে চাস?
না না— আমরা এবার অপ্রস্তুত হয়ে সরব প্রতিবাদ জানালাম।
তা–মানে তা কেন বলব—মানে বলছিলাম কী—
ও সব বাজে কথা রাখ— শিবুর চড়া মেজাজ ঠাণ্ডা হল না—স্পষ্ট আমায় যে সন্দেহ করছিস তা সাহস করে স্বীকার কর না।
না, না, মানে আমরা অপ্রস্তুত হয়ে যা বলতে যাচ্ছিলাম শিবু তাতে বাধা দিয়ে বললে, শোন, মিছিমিছি কথা বাড়িয়ে তো লাভ নেই। সত্য কথাটা তাই আমাদের সকলেরই স্বীকার করা ভাল। আসল ব্যাপারটা যা দাঁড়িয়েছে তা এই যে রহস্যটার ঠিক মতো কোনও হদিস না পেয়ে আমরা সকলেই সকলকে মনে মনে সন্দেহ করতে আরম্ভ করেছি। আমি নিজে এখন তা অকপটে স্বীকার করছি যে আমি নিজেও তাই করে একদিন হাতেনাতে আসল আসামিকে ধরবার মতলবে ছিলাম। তার জন্যে বেশ একরকম ফাঁদও পেতেছি।
সত্যিই তুই আমাদেরই কাউকে সন্দেহ করেছিস? অবিশ্বাস্য স্বরে জিজ্ঞাসা না করে পারলাম না। আর তাকে ধরবার জন্যে ফাঁদও পেতেছিস? নিজের কানকেই বিশ্বাস না করতে পেরে একটু রুক্ষ গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, কাকে?
কাকে জানতে চাইছিস? শিবু বিনা দ্বিধায় জানাল, কাকে না করেছি সেইটিই বরং জিজ্ঞাসা কর। তবে সে প্রশ্নেরও সঠিক জবাব দিতে পারব না।
তার মানে? একটু ধমক দেবার ভঙ্গিতে বলবার চেষ্টা করলাম, কী আবোল-তাবোল বকছিস।
হ্যাঁ, শুনলে আবোল-তাবোলই মনে হয়, শিবু অকপটে স্বীকার করলে, কিন্তু কথাটা পুরোপুরি ঠিক। সন্দেহ যখন শুরু হয়েছে তখন এক এক করে কেউই বাদ পড়েনি।
কেউই বাদ পড়েনি! নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে না পেরে বললাম, সন্দেহ করেছিস এক এক করে আমাদেরই সকলকে!
হ্যাঁ, তাই করেছি। শিবু সোজাসুজি জানালে, আর তার মধ্যে প্রথম কাকে সন্দেহ করেছি শুনবি?
এ ধরনের কথায় মেজাজ ঠিক রাখা যায়? বেশ একটু কড়া গলাতেই বললাম, সেইটেই তো জানতে চাই।
বেশ, শোন তাহলে, শিবু যেন নিজের দায়টা কাটিয়ে নিয়ে বললে, প্রথম সন্দেহ করেছি আর কাউকে নয়, এই তোমাকেই!
আ-আ-আমাকে? আমি তোতলা হয়ে কথাটা যখন জিজ্ঞাসা করতে পারলাম, ঘরেও অন্যদিকে তখন চাপা হাসির শব্দটা খুব অস্পষ্ট নয়।
সেটা গ্রাহ্য না করে তোতলামিটা এবার কাটিয়ে উঠে প্রায় ধরা গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, প্রথম সন্দেহ করলি এই আ-মা-কেই? মানে আমি প্রথমে মৌ-কা-সা-বি-স-এর ওই গোটা দু-তিন চালাকির খেল দেখিয়ে সে সব প্যাঁচের পুঁজি ফুরিয়ে যাবার পর এমনই করে সবাইকে টিটকিরি দিয়ে বাহাদুরি করছি।
হ্যাঁ, আমার মেজাজের ঝাঁঝটা গ্রাহ্যই না করে শিবু সোজাসুজি এবার স্বীকার করলে, হ্যাঁ, প্রথমে তোর ওই বোকা বোকা ভাবগতিকটা হয়তো একরকম সেজে থাকা বলেই সন্দেহ হয়েছিল। তারপর অবশ্য
শিবুকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে জ্বলন্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, তারপর অবশ্য কী?
তারপর, শিবু এবার একটু হেসেই বললে, বুঝলাম যে তোমায় সন্দেহ করাটা সম্পূর্ণ ভুল। মানে—
শেষ পর্যন্ত বুঝলে তাহলে সে কথা? খুশি হয়ে শিবুকে একটু তারিফ জানাতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তা আর হল না। শিবু তখন তার বক্তব্যটা শেষ করে বলছে, মানে তখন খেয়াল হয়েছে যে বোকা সাজাটা সহজ হলেও তোমার পক্ষে মৌ-কা-সা-বি-স-এর ওই সব প্যাঁচের এক-একটা গল্প ফাঁদা-তোমার কর্ম নয়। সে বুদ্ধি তোমার নেই।
এ অপমানের কি জবাব নেই?
থাকলেও তখন তা ভেবে বার করতে না পেরে নীরবে তা হজম করে শিবুর কথাই শুনে যেতে হল।
শিবু তখন বলছে, তোমাকে বাতিল করে তখন গৌর-শিশিরের কথা ভাবছি। হ্যাঁ, ওদের দুজনের পক্ষেই এরকম একটা বাহাদুরি দেখানো অসম্ভব নয়, আর বিশেষ করে ওদের যা দস্তুর—দুজনে সেইরকম জোট বেঁধে যদি কাজ করে।
শিবু একটু থেমে গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে এবার বললে, কিন্তু সেইটেই আর সম্ভব নয়।
সম্ভব নয়? আমি গৌর আর শিশিরের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? তা সম্ভব নয় কেন?
তাও বুঝিয়ে বলতে হবে? শিবু আমার মূঢ়তায় তার হতাশাটা গলার স্বরে বুঝিয়ে দিয়েও বললে, লীগ চ্যাম্পিয়ানশিপ-এর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে না। এখন ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান জোট বাঁধবে কী? মুখ দেখাদেখিও বন্ধ।
না, না, তা কেন গৌর আর শিশির দুজনেই প্রতিবাদ করে জানালে, ও সব খেলাধুলোর ঝগড়া আমরা মাঠেই রেখে আসি। ও ঝগড়া বাড়ি বয়ে আনব নাকি?
ঠিক, ঠিক, আমারই ভুল হয়েছে। শিবু নিজের ভুল স্বীকারের সঙ্গে মুখ টিপে একটু হেসে বললে, কিন্তু আসামিদের তালিকা থেকে একে একে সবাই বাদ যাবার পর পড়েছি ফাঁপরে। আমাদের চিঠির বাক্সের ও সব নাক কান মলা চিঠি দিয়ে মজা করছে কে বা কারা?
সত্যিই কি ব্যাপারটা তাহলে ভুতুড়ে কিছু?
