এ ব্যাপারে একমাত্র যিনি সব সন্দেহের বাইরে আছেন এ বিপাকে পড়ে এবার তাঁর শরণ নেবার কথা ভাবতে হচ্ছে! হ্যাঁ, টঙের ঘরের সেই তিনি। মৌ কাসা-বি-স-এর এ-রহস্যের কোনও সমাধান যদি থাকে তাহলে একমাত্র তাঁর কাছেই তা পাওয়া সম্ভব। তাই তাঁর শরণই এবার নিতে হবে।
তা নিতে চাও নাও, একটু সন্দেহ প্রকাশ করেই জানতেই চাইছিলাম, কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি সন্দেহের বাইরে কেন মনে করছ?
করছি, শিবু একটু গম্ভীর হয়েই জবাব দিল, গোড়ায় মৌ-কা-সা-বি-স-এর চিঠিগুলো তাঁর নিজের হাতের লেখার নকল দেখে।
তাঁর নিজের হাতের লেখার নকল। শিশিরই অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলে, সে লেখা যে নকল তা বুঝলে কী করে?
বুঝলাম তাঁর হাতের লেখার সঙ্গে মিলিয়ে, শিবু ব্যাখ্যা করে এবার বোঝালে, ওঁর হাতের লেখা আমাদের কাছে অতি সামান্যই আছে। একবার আমাদের এই বাহাত্তর নম্বর ছেড়ে অন্য কোথাও যাবার হুমকি দিয়ে যখন খবরের কাগজের বাড়িভাড়ার বিজ্ঞাপন দেখে ভাড়ার আবেদনের চিঠি লিখেছিলেন বনোয়ারিকে দিয়ে ডাকে পাঠাবার জন্য, তখন সে সব চিঠি ডাকবাক্সের বদলে আমাদের কাছেই জমা করেছি। সেই চিঠির লেখার সঙ্গে মিলিয়ে বুঝলাম এ লেখা ঘনাদার। সেই নিজের লেখারই নকল-নকল শুধু আমাদের ধোঁকা দেবার জন্য? এ ধোঁকা দেবার চালাকি কে বা কারা করছে তা বার করবার জন্য টঙের ঘরের তাঁরই শরণ নিতে হবে।
আরে মেঘ না চাইতেই জল! গৌর টিপ্পনি কাটলে, সিঁড়িতে তাঁর চটির আওয়াজ বোধহয় শোনা যাচ্ছে।
গৌর ভুল বলেনি। মিনিট কয়েক বাদে বিদ্যাসাগরি জোড়া চটির আওয়াজ নীচ থেকে ওপরে উঠে তখনকার আস্তানাঘরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে আবার আমাদের দরজায় ফিরেই বোধহয় কড়া ঠেলা দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আর দরকার হল না।
শিবুই ভেতর থেকে দরজা খুলে ধরে যেন কুর্নিশ করার মতো ভঙ্গিতে বললে, আসুন না। আপনি বোধহয় অন্তর্যামী। এইমাত্র আপনার কাছে যাবার কথাই ভাবছিলাম। কেমন করে তা বুঝে নিজে থেকেই তার আগে এসে পড়েছেন!
এ আদিখ্যেতায় ঘনাদা বিশেষ গললেন বলে মনে হল না। কথাগুলো যেন গ্রাহ্যই না করে তিনি ঘরের ভেতর গৌরের ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ানো সোফাটায় বসে গম্ভীরভাবে বললেন, ব্যাপার কী বলল তো, এমন ছুটির দিন বিকেলে তোমরা আড্ডাঘরের বদলে এখানে এসে জমা হয়েছ, আমার কাছেও যাবার কথা ভাবছিলে? কী হল কী হঠাৎ এমন?
হঠাৎ নয়, শিবুই গলাটা ভারি করে জানালে, ব্যাপারটা হয়েছে অনেকদিন। ছেলেখেলা বলে কিন্তু এখন আর উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মীমাংসার জন্যে তাই আপনার শরণ নিতে যাচ্ছিলাম।
সে কথা তো অনেকবার শুনলাম, ঘনাদা একটু অধৈর্যের সঙ্গে বললেন, কিন্তু ব্যাপারটা হয়েছে কী?
একটু চুপ করে আমাদের সকলের মুখের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে ঘনাদা হঠাৎ যেন দিব্যদৃষ্টি পেয়ে বললেন, সেই তোমাদের মৌ-কা-সা-বিস আবার খোঁচা দিয়েছে? চিঠি দিয়েছে কিছু আবার।
চিঠি দিয়েছে, আবার দেয়নি—
শিবু হেঁয়ালি করে জানাবার চেষ্টা করাতে তার ওপর বিরক্ত হয়ে ঘটনাটা যা দাঁড়িয়েছে, ঘনাদাকে একটু বিস্তারিত করে জানালাম।
সেই সঙ্গে মৌ কাসা-বি-স-এর শেষ চিঠিগুলোও দেখাতে ভুললাম না।
ঘনাদা যেরকম গম্ভীর মুখে আমাদের পেশ করা কাগজপত্র প্রথমে দেখছিলেন, শেষের দিকে হঠাৎ তার বদলে তাচ্ছিল্যভরে হেসে ওঠাতে কিন্তু আমাদের অবাক হতে হল।
এই! এই তোমাদের সমস্যা! ঘনাদা ওঁর কাছে জড়ো হওয়া কাগজের টুকরোগুলো সামনের টেবিলের ওপর নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, করে দেওয়া এ যদি রহস্য হয়, তাহলে তার সমাধান এইগুলোর মধ্যেই করে দেওয়া আছে। এই কাগজের টুকরোগুলোর মধ্যেই।
আমরা অবাক হলাম। সেই সঙ্গে ঘনাদা বোধহয় আমাদের নিয়ে ঠাট্টা করছেন এই সন্দেহ করে একটু চুপ।
ক্ষোভটা গোপন না করে একটু তেতো গলাতেই জানতে চাইলাম, সমাধানটা আছে বুঝলাম, কিন্তু সেটা কোন ভাষায় তা একটু জানাবেন? ভাষাটা বাংলা না এসপেরান্টো গোছের কিছু?
না, না ওসব কেন হবে! ঘনাদা জড়ো করা কার্ডগুলোর একটা তুলে নিয়ে তার পেছনের সাদা পাতার সামনে যা লেখা আছে সেই কথাগুলোই নিজের পকেট থেকে একটা কলম বার করে লিখতে লিখতে বললেন, এই কার্ডের এক পিঠের লেখাটাই অন্য পিঠে লিখলাম। একটু মন দিয়ে পড়লে মানেটা বোঝা জলের মতো সহজ হবে বলে মনে করি।
কথাটা শেষ করে নিজের হাতের দুপিঠে লেখা কার্ডটা অন্য কাগজগুলোর মধ্যে মিশিয়ে দিয়ে হঠাৎ উঠে পড়ে দরজা দিয়ে ছাদের সিঁড়ির দিকেই পা বাড়াতে বাড়াতে যা বললেন তাও একটা ধাঁধা। বলে গেলেন, এবার লেখাটা পড়তে পারবে আশা করি। লেখা না পড়তে পারো কলম পড়লেই চলবে।
এ আবার কী আজগুবি কথা?
মনে হল ঘনাদার বিদ্যাসাগরি চটির শব্দ ন্যাড়া ছাদের সিঁড়িতে মিলিয়ে যাবার আগে তাঁকে মানেটা বোঝাবার জন্য ধরে নিয়ে আসি।
কিন্তু সেটা আর পারলাম না। তার বদলে মৌ-কা-সা-বি-স-এর টুকরো কার্ডগুলোর ভেতর থেকে ঘনাদার উলটো পিঠে লেখা কার্ডটা খুঁজে বার করে একটু মন দিয়ে পড়বার চেষ্টা করলাম।
কিন্তু তাতে লাভ কী হল?
কার্ডটায় এক পিঠে যা লেখা ছিল ঘনাদা অন্য পিঠে ঠিক তাই লিখেছেন।
মূল কার্ডটায় লেখা ছিল একেবারে সংক্ষিপ্ত দুটি মাত্র শব্দ কার্ডের ঠিক মাঝখানে মোটা মোটা অক্ষরে লেখা-কে আমি। কার্ডের অন্য পিঠে ঘনাদা আমাদের সামনে সেই কথাই লিখেছেন—
