কিন্তু সেখানে আবার লোডশেডিং থাকবে না তো?
কাবাব গাঁথা টুকরো তখন ঘনাদা মুখে তুলেছেন। তাঁর কাছে কোনও উত্তর পাওয়া গেল না।
মৌ-কা-সা-বি-স বনাম ঘনাদা
ছুটির দিন। দুপুর বেলা খাওয়াদাওয়া শেষ হতে একটু দেরিই হয়। তবু যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি সে পাট চুকিয়ে ঘনাদা তাঁর খাওয়া সেরে নিজস্ব সেই চিলেছাদের টঙের ঘরে উঠে যাওয়ার পরই সবাই একসঙ্গে দোতলার সিঁড়ির বাঁকে শিশিরের ঘরে গিয়ে জমায়েত হয়েছি।
জমায়েত যে হয়েছি তা ঠিক খোশ-মেজাজ নিয়ে গুলতানি করবার জন্য নয়। তার বদলে রীতিমত একটা লজ্জা আর অপমানের জ্বালা নিয়ে।
লজ্জা আর অপমানের জ্বালাটা যা নিয়ে তার ব্যাপারেই শিবু তখন নীচের খাবার ঘরে খাওয়া শেষ করার পর আমাদের সঙ্গে ওপরে না এসে বাইরের গেটের পাশের লেটারবক্স হাতড়াতে গেছে আর আমরা শিশিরের ঘরে এসে জড়ো হয়ে অধীর আগ্রহে তার জন্য অপেক্ষা করছি।
অপেক্ষা বেশিক্ষণ করতে হল না। মিনিট দশেকের মধ্যেই শিবু এসে হাজির হল, কিন্তু যে চেহারা নিয়ে সে দেখা দিলে তাতে, ফলাফল সম্বন্ধে কোনও সংশয়ের অকাশ না থাকলেও হতাশ কণ্ঠেই জিজ্ঞাসা না করে পারলাম না—কী আজও কিছু নেই?
থাকবে না কেন, শিবু হতাশ কণ্ঠটা আরও গাঢ় করে জানালে, যা থাকবার তাই আছে।
তার মানে, নেই—টিটকিরির চিরকুট?
হতাশার সঙ্গে বেশ একটু ক্ষোভের জ্বালা নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেও শিবুর হাত থেকে চিরকুটটা নিয়ে না পড়ে পারলাম না।
পড়ার অবশ্য নতুন কিছু নেই। বেশ কিছুক্ষণ থেকে সোজাসুজি স্পষ্ট সমস্যার ধাঁধাটাঁধার বদলে যে ধরনের জ্বালা ধরানো টিটকিরির চিমটি আসছে তারই আর একটি নমুনা।
এবারেও সেই পোস্টকার্ডের মাপের একটা ধবধবে সাদা কার্ড। তার সম্বোধন নেই। কোথা থেকে আসছে তার কোনও হদিস নেই। কার্ডের মাঝামাঝি মোটা মোটা অক্ষরে শুধু লেখা—দুয়ো।
এ রকম কার্ড এ ক-দিনে আরও কয়েকটা পাওয়া গেছে। এক না হলেও সবগুলিই অপমান ধরা টিটকিরি দিয়ে লেখা।
এই জাতের যে কার্ড পাওয়া গেছে তাতে তার ভাষণ সংক্ষিপ্ত হলেও ভাষা একটু বিস্তারিত ছিল।
মাপজোকে এক হলেও সে কার্ডে বক্তব্য একেবারে অস্পষ্ট নয়।
লেখার ধরন-ধারণ অবশ্য এক। প্রমাণ আকারের সাদা কার্ডের মাঝখানে পর পর মোটা মোটা অক্ষরে কথাগুলি সাজানো
কে না কারা? এখনও বুঝলে কিছু, দুয়ো।
এর পরের চিঠিটা আর একটু বড় হলেও মোটেই ধোঁয়াটে নয়। তার একটি খোঁচাই স্পষ্ট করে দেওয়া। পর পর তিন লাইনে সাজিয়ে লেখা–
কোথায় এখন।
টঙের ঘরের তিনি!
ড়ুব মেরেছেন কোথায়?
নিয়মিতভাবে পর পর এ ধরনের ভেংচিকাটা চিঠি নিয়ে মেজাজগুলো তখন আমাদের কী হয়েছে তা বোধহয় বলে বোঝাবার দরকার নেই।
এ যে মৌ-কা-সা-বি-স-এর কাণ্ড সে বিষয়ে কোনও মতেই আমাদের সন্দেহ নেই।
কিন্তু কে সে মৌ-কা-সা-বি-স?
কে না কারা?
আমাদের এমন কানমলা দেবার এ গরজই বা তার বা তাদের কেন?
আর আমাদের এই বাহাত্তর নম্বরের বাসার ডাকবাক্সে তারা তাদের চিঠি চালানই বা করছে কখন? কীভাবে?
সারাক্ষণ যতখানি সম্ভব আমরা সজাগ পাহারায় থেকেছি।
সকলে দল বেঁধে না হোক, কেউ না কেউ তো বটেই।
এই এত পাহারার মধ্যে কখন কী ভাবে তারা তাদের এই সব চিঠি চালান করছে। আমাদের চিঠির বাক্সে?।
দিনের বেলা তো নয়ই, রাত্রেও আমাদের অজান্তে চিঠির বাক্সে কিছু ফেলা অসম্ভব বললেই হয়। কারণ সন্ধ্যা হতে না হতেই আজকাল আমরা বাইরের গেট চাবি দিয়ে বন্ধ করার ব্যবস্থা করেছি।
অন্য কারও তো নয়ই, আমাদের নিজেদেরও কারও বাইরে থেকে ভেতরে আসতে হলে চাবি দিয়ে গেট না খুলিয়ে আসা যাওয়ার উপায় ছিল না।
এই অবস্থায় আমাদের অজান্তে আমাদের ডাকবাক্সে চিঠি বা চিরকুট চালান কেমন করে সম্ভব!
ব্যাপারটা যা দাঁড়িয়েছে তাতে আমরা পরস্পরের ওপর সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছি।
আমাদেরই কেউ কি চুপি চুপি এই সব চালাকি করছে। কিন্তু কে সে হতে পারে?
এ রকম মজার বেয়াড়াপনা করে তার লাভই বা কী!
আর তাছাড়া মৌ-কা-সা-বি-স যে সব মাথাগুলোনো ধাঁধার রহস্য আমাদের সামনে সাজিয়ে ধরেছে, একা এমন কিছু করার মতো বুদ্ধিও আমাদের কার আছে?
শিবুর?
না। কোনও একটা মজার ব্যাপার নিয়ে বেশ একটু হইচই বাধিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ছাড়া আর কোনও এলেম তার থাকার পরিচয় তো এখনও পেয়েছি বলে মনে হয় না।
যদিই বা এরকম ক্ষমতা তার থাকে, আপাতত তা অনুমানের মধ্যে রেখে অন্যদের কথা বিচার করে দেখতে পারি।
প্রথমে নিজেকে বিচারের দাঁড়িপাল্লায় তুলে চোখ বুজেই সরাসরি বাদ দিতে। পারি।
না, আমি দু চারটে খোঁচা দিয়ে সোজা কথাকে কখনও কখনও প্যাঁচালো করতে পারি, কিন্তু ভেবে চিন্তে সাজিয়ে গুছিয়ে একটা ধাঁধা বানানো–সে আমার কর্ম নয়।
আমার পর বাকি থাকে শুধু গৌর আর শিশির।
তা দু-দুজনের কেউ যে ফেলনা নয় একথা অকপটে স্বীকার না করে উপায় নেই। কিন্তু বাদ সেধেছে দুজনের নিজস্ব চরিত্রের বিশেষত্ব।
গৌর ইচ্ছে করলে সবই পারে। কিন্তু সকলের সঙ্গে সমান উৎসাহে যে কোনও ধান্দায় মাততে আপত্তি না থাকলেও মৌ-কা-সা-বি-স-এর মতো বাহাদুরির জন্য নিজের গরজে সময় আর বুদ্ধি খরচ সে করবে বলে মনে হয় না।
শিশিরের পক্ষে সে রকম কিছু করা অবশ্য সম্ভব।
কিন্তু ব্যাপারটা আরও তাহলে জমকালো হওয়া দরকার।
জমকালো না হোক, ব্যাপারটা এখন যা দাঁড়িয়েছে তাতে একটা গায়ে জ্বালাধরানো টিটকিরির চাবকানির আভাস আছে বলে অবশ্য শিবু, গৌর, শিশির কারওই সামান্য গা ঝাড়া দিয়ে তাচ্ছিল্য করার ভাবটা আর নেই।
