বেশ করেছ! সে বেশ করেছ? আমাদের কথাটা শেষ করতে না দিয়ে ঘনাদা বলেছেন, ও সবই ভাল। কিন্তু মুড়ির কাছে কিছু নয়। মুড়ি আর ফুলুরি। গরমগরম ফুলুরি। ওই যে আসবার পথে গলির মোড়ে ভাজতে দেখে এলাম।
ঘনাদা মুড়ি আর ফুলুরির গুণগান চালাবার মধ্যে বনোয়ারিকে পাড়ার তেলেভাজার দোকানে পাঠিয়ে দিতে হল।
বনোয়ারি দোকান থেকে ফিরে আসার পর বড় জামবাটি ভর্তি সে মুডিফুলুরি তো বটে, সেই সঙ্গে আগের আনানো কাটলেট কাবাব ইত্যাদিও পর পর পরিষ্কার করার মধ্যে ঘনাদার এই বিরল বদান্য মেজাজের কী করে সুযোগ নেওয়া যায় সবাই মিলে তাই তখন ভাবছি।
এখন কি হঠাৎ যেন সুন্দরবনে বেড়াতে যাওয়ার শখ হয়েছে বলে নিজেদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু করব!
না, উদ্ভিদবিজ্ঞানের গাছ-গাছড়া নয়, স্রেফ আগাছাদের একটা বিশ্বকোষ কোথাও আছে কি না খোঁজ করার উৎসাহ দেখাব।
কিছুই এসব করতে হল না।
ভাগ্য যেন আমাদের ওপর সদয় হবার জন্য ঘুমিয়েই ছিল। ক্যারমবোর্ডে স্ট্রাইকারের এলোপাতাড়ি মার-এ খুঁটিতে খুঁটিতে ঠোকাঠুকি হতে হতে লাল ঘুটিটাই পড়ল গিয়ে এক পকেটে।
কোনও মতলবটতলব নিয়ে নয়, বনোয়ারির আনা মুড়িফুলুরির, বিশেষ করে মুড়ির, আজগুবি দাম শুনে গৌর বুঝি অবাক হয়ে বনোয়ারিকে বলেছিল, আরে, বলছে কী! মুড়িমিছরির একদর ছিল একটা ঠাট্টা! এখন তাও যে মিথ্যে হতে চলেছে। মুড়ির দাম মিছরিকেও যাচ্ছে ছাড়িয়ে।
আর যাবে না! অবাক হয়ে ঘনাদার দিকে চাইতে হল। আমাদের এই তুচ্ছ কথাবার্তায় ঘনাদা টিপ্পনি কাটছেন! আর কী সে টিপ্পনি? তার মানেটাই বা কী?
আর যাবে না মানে? জিজ্ঞাসা করতেই হল ঘনাদাকে।
মানে, ওসব চড়া-টড়ার পালা এবার শেষ। এবার নামবে। দেশের সুদিন এবার ফিরছে।
সুদিন ফিরছে বলছেন দেশের? ধরবার হাতলটা পেয়ে গিয়ে আমরা আর ছাড়ি
দেশ বলতে যদি আমাদের এই বাংলা বলেন-শিশির আলাপটাকে যেদিকে দরকার সেই দিকেই মোচড় দিয়ে ঘুরিয়ে দেয়—তাহলে বলব এমন পোড়া কপাল আর কারওর আছে!
পোড়া কপাল বলব আমাদের এই বাংলার?—ঘনাদার অপেক্ষায় না থেকে আমরাই ধুনিটায় হাওয়া দিয়ে যাই।
পোড়া কপাল নয়! গৌর শিশিরের হয়ে ব্যাখ্যাটা শোনায়—এই যে দেশের সব বড় বড় নদী—সব নদীর মোহনা থেকেই শুনছি—তেল ওঠবার প্রচুর আশা দেখা যাচ্ছে। যাকে বোম্বে হাই বলি সেখানে উঠছেই, তা ছাড়া ওই কষ্ণা গোদাবরী নর্মদা সব নদীর মোহনায় নাকি একবার ঠিক মতো নল নামাতে পারলেই কলকল করে তেল উঠবে।
আর আমাদের এই পোড়া বাংলার? আমি খেইটা ধরে নিয়ে চালিয়ে যাই— এমন গঙ্গাভাগীরথীর মোহনা থেকে কোনও সুখবর এখন পর্যন্ত এসেছে? পাবার মধ্যে পেয়েছি একটা খুদে দ্বীপ, দ্বীপ না বলে তাকে একটা চড়া বললেই মানায়। ভাল করে ডাঙার ঘাসও সেখানে এখনও জন্মায়নি, তেলের জন্য খোঁড়াখুঁড়ির কোনও কথাই সেখানে ওঠেনি।
না ওঠবার কারণ আছে যে!—শিবু আমার একটু সংশোধন করে—আমাদের গঙ্গাভাগীরথীর মোহনার দুঃখটা কী তা জানো তো! বে অফ বেঙ্গলের কালাপানিতে যেখানে এসে আমাদের মা-জননী পড়েছেন সেখানে এমন অতল-পাতাল-দেখা গভীর এক গাড্ডা—যা যুগযুগান্তের নদীর জলে বয়ে আনা পলিতেও ভরাট হতে কত যুগ যে যাবে এখনও তার ঠিকঠিকানা নেই। তাই তেলের জন্য খোঁড়ার কোনও কথাই ওঠে না। খুঁড়বেই বা কোথায়? দরকার হবে না খোঁড়ার! আমাদের সকলের চমকে-ওঠা বিস্মিত দৃষ্টি এক জায়গায় গিয়েই স্থির হয়েছে।
না, কোনও ভুল নেই! এতক্ষণ ধৈর্য ধরে চুপ করে থাকার পর ঘনাদাই এবার মুখ খুলেছেন। আর সে মুখ খোলার মহিমাটি কী? সমস্ত আড্ডাঘরটা যেন এক মুহূর্তে সম্মোহিত হয়ে গেছে। দেওয়ালেতে টিকটিকিটা ভেন্টিলেটরের ধারে বসা পোকাটাকে তাক করে গুটিগুটি পা চালাতে চালাতে থেমে গিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নট-নড়নচড়ন নট-কিচ্ছু হয়ে গেল।
খোঁড়বার দরকার নেই, মানে? আমরা ক্ষীণকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেছি, মানে খুঁড়ে কোনও লাভ নেই বলছেন!
না, বলছি, লাভ যা পাবার তা না খুঁড়েই আমরা পাব, ঘনাদা আমাদের বরাভয় দিয়ে বলেন, অন্যেরা খুঁড়ে মরুক, আমরা শুধু কুড়োব।
শুধু কুড়োব?ঘনাদা যে আমাদেরই সিনেরিয়ো মাফিক সংলাপ বলছেন তা যেন বিশ্বাস করতে না পেরে একটু বোকা সেজে বলেছি, কী কুড়োব কী? রাস্তার নুড়িপাথর?
নুড়িপাথর কেন কুড়োবে? ঘনাদা পুরোপুরি বিশদ না করে বলছেন, যার মধ্যে সাত রাজার ধনমানিক হেলায় লুকিয়ে আছে কুড়োবে সেই অমূল্য জিনিস।
হেলায় লুকিয়ে আছে অমূল্য সাত রাজার ধনমানিক! সে কোন জিনিস? আমরা যেন হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করি, সে জিনিস আবার শুধু কুড়িয়ে নেবার অপেক্ষায় আমাদের এখানে এই মুল্লুকে ছড়িয়ে আছে?
আছে! আছে? ঘনাদা গাঢ় গম্ভীর স্বরে ভরসা দিয়ে বলেন, আর যাতে তা থাকে, যাতে কারও লোভী থাবা বাড়িয়ে কেউ সহজে তার নাগাল না পায় তার ব্যবস্থাই করে এলাম।
সেই ব্যবস্থাই করে এলেন?
এবার আমাদের তাজ্জব হওয়াটা সিনেরিয়ো ছাড়ানো।
ঘনাদা ব্যবস্থা করে এলেন বলছেন! কী ব্যবস্থা! কীসের? ঘনাদা ওই ইশারাটুকু দিয়েই চুপ হয়ে যাবেন নাকি? ব্যবস্থা করে এলাম বলে যে নাটকের আভাসটুকু দিয়ে আমাদের ছটফটানি শুরু করিয়ে দিয়েছেন সে-নাটকের যবনিকা আর তুলবেন নাকি! তা তোলাতে কী নজরানা তাঁকে দিতে হবে!
দিতে হল না কিছুই। ঘনাদা আজ সত্যি কল্পতরু হয়ে শিশিরের বাড়িয়ে দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া সিগারেটটায় একটা লম্বা টান দিয়ে যেন নিজের গরজে বলতে শুরু করেন—কেউ লক্ষ করেছ কিনা জানি না, কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার খানিক পরেই বিকেলের অনেক আগে থেকে আমাকে আর বাহাত্তর নম্বরে দেখা যাচ্ছে না। কী! কেউ তোমরা দেখেছ তখন আমাকে
