এরপরে আর যা যা করবার বুঝিয়ে বলবার আর অবসর মেলেনি।
আগাছা দিবস! সবাই একেবারে হেসে মেঝেতে গড়াগড়ি দেয় আর কী?
যত আমি তাদের থামিয়ে নিজের প্ল্যানটা বিশদভাবে জানাতে চাই ততই তারা এক-একবার করে আগাছা দিবস বলে হেসে লুটোপুটি খায়।
ঠিক! ঠিক! শিবু আবার গম্ভীর হবার চেষ্টা করে ডবল খোঁচা দিয়ে বলে, কত রকম দিবসের কথাই না শোনা গেছে এতদিন বিদ্যুৎ-দিবস, শিক্ষা দিবস, কলের জল দিবস, ডালমুট–
শিবুকেও আর এগোতে হয়নি।
গৌর শিশিরই তাকে বাধা দিয়ে বলেছে, ডালমুট দিবস আবার কী!
কী আবার? শিবু ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করেছে, ডালমুট আর আগের মতো মুচমুচ করছে না, সেই নালিশ জানাবার দিবস।
ঠিক! ঠিক! শিশির গৌর শিবুকে সমর্থন করার জন্যই বলতে শুরু করেছে, ডালমুট দিবসের মতো ফুচকা দিবস, ডালপুরি দিবস, চুল ছাঁটা দিবস
এবার বাধা দিয়েছে শিবুই, চুল ছাঁটা দিবস মানে? সে আবার কী?
সে আবার কী, জানো না? গৌর বুঝিয়ে দিয়েছে! মানে লম্বা চুল রাখার নতুন হুজুগে সেলুন আর প্রাইভেট নাপিতদের দিন খারাপ গেলেও আমাদের মাঝে মাঝে ক্ষৌরির পয়সা বাঁচছিল। ফের ধীরে ধীরে চুল ছাঁটার রেওয়াজ চালু হচ্ছে বলে আমাদের পকেটে টান পড়তে শুরু করেছে। চল ছাঁটা দিবস মানে তাই আবার লম্বা চুলের রেওয়াজ চালু করার আন্দোলন-বুঝলে!
এমনই সব দিবস খুঁজে বার করার হুজুগে আমাকে ছেড়ে দিলেও আসল কাজ আমাদের এগোয়নি। টঙের ঘরের তাঁকে গরম করে তোলবার মতো খোঁচা ভেবে বার করবার কথাটা ভুলেই গেছি সবাই। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে তাতে ক্ষতি হয়নি কিছু।
অর্থাৎ ঘনাদাকে খোঁচা দেবার দরকারই হয়নি মোটে।
হ্যাঁ, ঘনাদা কখনও কখনও অমাবস্যার চাঁদ হয়ে উঠে কল্পতরু বনে যান। তখন তাঁকে আর খুঁচিয়ে জাগাতে হয় না। হ্যাঁ না করতেই তিনি যেন মনের কথা আঁচ করে ফেলে আশা মিটিয়ে ঝুলি ভরে দেন।
আমাদের বেলাও তাই হল এক রকম অযাচিতভাবে।
এবারে বৃষ্টিটা দেরি করে এসে আর যেতেই যেন চাইছে না।
আকাশ বেশ পরিষ্কার আর আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস দিনটা আজ শুকনোই যাবে শুনে ছাতা না নিয়ে বেরিয়ে হঠাৎ এসে হঠাৎ-চলে-যাওয়া বৃষ্টিতে একেবারে ভিজে স্নান করে ফিরতে হবে।
ছুটির দিন হলেও ঘনাদাকে বাগ মানাবার উৎসাহে আমরা কেউ বাইরে কোথাও যাইনি।
কিন্তু ঘনাদা তাঁর বিকেলের সরোবরসভার টানে যথাসময়ে বেরিয়ে হঠাৎ নামা জোরালো বৃষ্টির পশলাটার মধ্যে আর ফিরতেই পারেননি।
এ বৃষ্টিতে একেবারে ভিজে দাঁড়কাকটি হয়ে আসবেন বুঝে আমরা তার উপযুক্ত নৈবেদ্যের ব্যবস্থা করতেও ভুলিনি।
দিনটা অবশ্য খুবই গরম হবার হুমকি দিয়েই শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ সকালের আবহাওয়া সংবাদে আগের দিনের তাপমাত্রা আটত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলে জানিয়ে গরমটা আজ বাড়বার আশঙ্কাটাই ব্যক্ত করেছিল। এই খাঁ খাঁ রোদের দিনের গরমে হাঁসফাঁস করা বিকেলে যেমনটি হওয়া উচিত তেমনই জলযোগের ব্যবস্থাই করেছিলাম প্রথমে। ফ্রিজে জমিয়ে তরমুজের ফালি, গাছপাকা পেঁপের টুকরো, মজঃফরপুরের সেরা সরেস লিচু, আমের মরসুম পার হয়ে গেলেও অনেক খুঁজে পেতে আসলি চৌষা আম, গেলাস ভর্তি মৌসম্বির রস আর সেই সঙ্গে চৰ্যচোষ্য হিসেবে নাটোরের জাত ময়রার কাঁচাগোল্লা, বাগবাজারের রসমালাই আর লেডিকেনি।
এ সবের সঙ্গে নোনতা হিসেবে আর কী দেওয়া যায় যখন ভাবছি তখনই শুরু হল এই এক নাগাড়ে মুষলধারে বৃষ্টি। বৃষ্টি তো নয়, আকাশ যেন একেবারে ভেঙে পড়ল শহরের ওপর আর এক ঘণ্টার মধ্যেই ব্যারোমিটারের পারা কিছু না হোক ন-দশ ডিগ্রি দিলে নামিয়ে।
ঘনাদা তাঁর সরোবরসভা থেকে সময়মত যদি সরে পড়তে পেরেও থাকেন তবু এই বৃষ্টিতে কী মন মেজাজ নিয়ে তিনি যে ফিরবেন তা অনুমান করে তখুনি মেনু পালটাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। বাতিল হয়ে গেছে তরমুজ আর পেঁপে, খরমুজা আর কাঁচাগোল্লা, রসমালাই। তার জায়গায় তাড়াতাড়িতে যতদূর পারা যায় সেইমত কবিরাজি কাটলেট, শামিকাবাব, মোগলাই পরোটা আর কাশ্মীরি কোপ্তার ব্যবস্থা হয়েছে।
কিন্তু এ সব কিছুরই যে দরকার ছিল না তা তখন আর কেমন করে বুঝব?
প্রথমত আমাদের সকলকে অবাক করে ঘনাদা এলেন ভিজে দাঁড়কাকটি হয়ে নয়, রেনকোটে আপাদমস্তক ঢেকে একেবারে শুকনো খটখটে অবস্থায়। আর এসেই কথায় বার্তায় মেজাজে বুঝিয়ে দিলেন যে আজ তিনি একেবারে কল্পতরু হয়েই ফিরেছেন।
নীচে থেকে দোতলায় এসে ন্যাড়া ছাদের সিঁড়ি দিয়ে সোজা তিনি তাঁর টঙের ঘরেই চলে যাবেন ভেবেছিলাম। তার বদলে তিনি রেনকোট গায়ে দিয়ে সোজা আমাদের আড্ডাঘরেই এসে ঢুকলেন আর তারপর বর্ষাতিটা গায়ে দিয়েই তাঁর মৌরসি আরামকেদারাটায় বসে বললেন, কই হে, এমন বর্ষার বিকেল আর
তোমাদের সঙ্গত নেই কেন?
সঙ্গত মানে? প্রশ্নটা আমাদের করবার দরকারও হয়নি। তার আগে নিজেই উৎসাহভরে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এমন বাদলা বিকেলের সঙ্গত হল মুচমুচে মুড়ি বুঝেছ! ওই তোমাদের যেমন তেমন চালে নুন মাখিয়ে ভেজে কুলোনো চটের বস্তার মুড়ি নয়, রীতিমত আসল মুড়ির চাল থেকে তৈরি করে শুকোনো আর তারপর পাকা হাতের ঝাঁটা খুন্তিতে বালির কড়াইয়ে ভেজে তোলা শিউলির মতো সাদা আর হালকা মুড়ি। ফুঁ দিলে উড়ে যায়। মুখে দিলে মিলিয়ে যায়।
আজ্ঞে, মুড়ি মানে—আমরা অপরাধীর মতো নিজেদের গলতির কৈফিয়তটা দেবার চেষ্টা করেছি—আমরা বাদলার দিন বলে কবিরাজি কাটলেট আর শামিকাবাব—
