আমাদের বেলা কথাটা ভালভাবে প্রমাণ হল প্রায় প্রতিটি বার।
প্রমাণ হল মৌ-কা-সা-বিস-এর চিঠির ব্যাপারে।
এ চিঠির ব্যাপারে এবারে আমিই একটু বেশি অস্থির হয়েছিলাম। মৌ-কা-সা-বি-স-এর শেষ চিঠি এসেছিল সেই মাস ছয়েক আগে। ঘনাদাকে তাতাবার ব্যাপারে সোজাসুজি লক্ষ্যভেদ না করলেও তেরছাভাবে সেই চিঠি যথাস্থানে খোঁচা দিয়ে ঘনাদাকে দিয়ে মহাভারতের শল্য চরিত্রের নতুন ব্যাখ্যা বার করিয়ে ছেড়েছিল।
মৌ-কা-সা-বি-স-এর কাছে এইটুকুর জন্যেই কৃতজ্ঞ হয়ে আমাদের একবারের জন্য, অন্তত একটু খোঁজখবর নেবার চেষ্টা করা কি উচিত ছিল না?
কিন্তু গৌর শিশিরের তাতে ঘোরতর আপত্তি।
না, না, কখনও না! গৌরের শাসানি। আমাদের একটু নরম দেখলেই ওরা লেজে খেলতে শুরু করবে।
কিন্তু আমি একটু প্রতিবাদ না জানিয়ে পারলাম না—আমাদের দিক দিয়ে একটু সাড়া দেওয়া কি উচিত নয়! শেষে আমাদের গা নেই মনে করে ওরাও যদি কারবার বন্ধ করে দেয়। একেবারে ফুটো ঢাক তো নয়। টঙের ঘরে ওঁকে একটু আধটু নাড়াচাড়া দেবার মতো দু একটা প্যাঁচ বাতলাবার চেষ্টা তো করেছে।
করেছে যেমন, তেমনই আবার করবে, শিশির আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললে, আমরা সাড়া দিই বা না দিই, নাম যাদের মৌ কা-সা-বিস, আমাদের মতো মক্কেল হাতে রাখবার গরজ তাদের খুব বেশি। সুতরাং অধীর না হয়ে শুধু লেটারবক্সটি দিনের পর দিন হাতড়ে যাও, এই তো তোমাদের বিধান।
শিবু তর্কটাকে আর বাড়তে না দিয়ে মিটমাটের রাস্তায় গিয়ে বললে, বেশ তা-ই মেনে নিলাম। কিন্তু মৌ-কাসা-বি-স হঠাৎ ওরা হয়ে বহুবচনের গৌরব কেমন করে পেল, একটু যদি বুঝিয়ে বললা।
আরে তাই তো! আমার মতো সবাই বোধ হয় একটু চমকে উঠে ব্যাপারটা খেয়াল করল। ব্যাখ্যা কিন্তু কারও কাছে পাওয়া গেল না। এইটুকুই শুধু স্থির হল যে, এক বা অনেক যাই হোক, মৌ-কা-সা-বি-স-এর গরজ আমাদের চেয়ে বেশি বই কম নয় ধরে নিয়েই আমরা ধৈর্য ধরে থাকব, আর তার ফল ফলবেই।
সত্যিই তাই ফলল। হপ্তাখানেক যেতে না যেতেই শিবু সিঁড়ির নীচের লেটারবক্স খুলতে গিয়ে হঠাৎ যে উল্লসিত চিৎকারটা ছাড়ল নেহাত বিকেলবেলা তাঁর নিত্য নিয়মিত সরোবর সভার টানে বেরিয়ে না পড়ে থাকলে টঙের ঘর থেকে তিনি নিশ্চয়ই শশব্যস্ত হয়ে বিদ্যাসাগরি চটি পায়ে এক দুর্ঘটনা ঘটাতেন। শিবুর উল্লাসধ্বনিটায় অবশ্য আমরা ওপরের দালান থেকেই ঠিকই বুঝলাম যে আমাদের ধৈর্য নিষ্ফল হয়নি। আমাদের নীরবতায় অস্থির হয়ে মৌ-কা-সা-বি-স-ই নিজে থেকে প্রথমে পত্রাঘাত করেছে। চিঠি অবশ্য লম্বা কিছু নয়। দু-চার ছত্রের মাত্র। তার ওপর বিদ্রুপের খোঁচাটাই প্রধান।
কী হে বাহাত্তর নম্বরের বালখিল্যরা।
চিঠির প্রথমেই টিটকারি দেওয়া সম্ভাষণ। সেই সুরেই লেখা—
সবাই একেবারে ভোক্কাটা হয়ে গেছ মনে হচ্ছে। টঙের ঘরের তাঁর লেঙ্গিতে বুঝি সবাই কাত। তা সুবুদ্ধি না নিলে কাত তো হবেই। সেই মৌ-কা-সা-বি-স-এর কাছে হাত পাততে এখনও মান যায় বলে আর একটা ফাঁদ নিজে থেকেই বাতলে দিচ্ছি। দিচ্ছি মিনি মাগনা। এ ফাঁদের ফাঁস ঠিক মতো টানতে পারলেই ষোলো আনা বাজিমাত। সুড়সুড় করে নিজের গরজে এসেই ধরা দেবে। দুনিয়ার সবাইকার হাহাকার কী নিয়ে? হাইড্রোকার্বন। অতলে পাতালে নয়, সেই সাত সমুদ্রে সাত হাজার রাজার রাজ্যের ধন নদী-নালা-পুকুর-ডোবার কচুরিপানার মতো জোলো ডাঙার আগাছায়। নাম ধরো কচুরিপানার ভাই কচলি ঝাঁটি। শুধু কচলিই বলো না।
জলাবাদার বুনো আগাছা তো নয়, তার মধ্যে কুবেরের দৌলতখানা। কিন্তু সিন্দুকে কুলুপ দেওয়া। সে কুলুপ কে খুলবে? খোলার আক যে কষে ফেলেছে গেঁয়ো যুগী বলে সে ভিখ পায় না।
ওদিকে রাক্ষস-খোক্ষসদের দেশের দুশমনরা ললাভে লোভে ঠিক এসে পড়েছে। কচলির মুল্লুকে।
কচলি-কুলুপ খোলার মন্তর সমেত খোদ গুণী কারিগরকেই যারা এ মুলুক থেকেই পাচার করবার প্যাঁচ করেছে, তার কিছু জানেন কি আমাদের টঙের ঘরের তিনি। একটু খুঁচিয়েই দেখুন না!
ব্যস, চিঠি ওইখানেই শেষ।
মৌ-কা-সা-বি-স-এর নামে এ চিঠি কে পাঠিয়েছে? কে, না কারা? এ চিঠি নিয়ে
কী করব আমরা এখন?
আমরাও ভাবনায় পড়েছি। কিন্তু ঘনাদাকে খোঁচা দেবার মতো কোনও ফিকির এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঘনাদাকে কীভাবে খুঁচিয়ে তাঁকে দিয়ে যা বলাতে চাই তা বলাব তাই ভেবে বার করতে তিন দিন তিন রাত্রি আমাদের ঘুম নেই। এক-আধটা নয়, চার মূর্তিমান আমরা চার পাঁচে অমন কুড়িটা ফন্দি এঁটে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছি। কিন্তু কারওর কোনও ফন্দিই শেষ পর্যন্ত যাকে বলে পুরোপুরি ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট পেল না।
গোড়াতেই আমরা ঠিক করে নিয়েছিলাম যে একেবারে সর্বসম্মতিক্রমে না হলে কোনও ফন্দিই মঞ্জুর বলে গ্রাহ্য হবে না।
মুশকিল হল সেখানেই।
দুজনে যেখানে একমত হয়ে একটা প্রস্তাব তোলে বাকি দুজন সেখানে ঘাড় হেলাতেই চায় না।
বিশেষ করে আমার বেলা দেখলাম মেজরিটি সবসময়ে আমার বিরুদ্ধে।
অথচ কী ভালভাবে একটা প্যাঁচই না মাথা থেকে বার করেছিলাম।
আমাদের লোকসভায় সেটার একটা ইশারা দিতে না দিতে সবাই যেখানে কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে ধন্যিধন্যি করবার কথা সেখানে কিনা সকলের একসঙ্গে গা-জ্বালানো হাসি আর টিটকিরির ধুম!
আচ্ছা, আমি বিচক্ষণজনেদের কাছে আমার প্রস্তাবটা পেশ করছি সুবিচারের জন্য। তাঁরাই বলুন, আমার ভেবে বার করা ফন্দিটা কি হেসে উড়িয়ে দেবার মতো কিছু! আমি বলেছিলাম কি যে বিকেলের আড্ডার ঘরে সবাই আমরা একটা করে ছোট থলিতে মাঠেঘাটে পার্কে-পার্কে ময়দানে ঘুরে জোগাড় করা আগাছা নিয়ে গিয়ে হাজির হব একদিন। সব টিপয় আর টেবিলের ওপর আগাছা থাকবে ছড়ানো, দেওয়ালেও টাঙানো থাকবে কিছু কিছু। আর সেখানে প্ল্যাকার্ড ঝুলবে বড় বড় হরফে, আগাছা দিবস লেখা।
