কিন্তু আমার কী অপরাধ, কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম, যে আমায় এমন করে মেরে ফেলছ?
তোর অপরাধ! নোকটা আমায় যেন ভেংচি কেটে বললে, তোর অপরাধ– তোর কৌতূহল আর আস্পর্ধার! মাফিয়াদের পেছনে লাগতে এখানকার টিকটিকিগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়েও থামিসনি, আবার ওই নিভোচির খোঁজ করতে গেছিস কেন?
বাঃ, আমি করুণভাবে কৈফিয়ত দিলাম, নিভোচি যে আমার বন্ধু। বন্ধুর খোঁজ নেব না?
বেশ, নে! আর তার—তার দামটাও দে। বলে দানোটা আমার ঘাড়টা ধরে ক্রেনের সেই দাঁড়াগুলোর দিকে টান দিল।
দাঁড়াও। দাঁড়াও, কাতর হয়ে এবার বললাম, সেই যখন মরতেই যাচ্ছি, তার আগে প্রফেসর নিভোচি আর তোমাদের মধ্যে কী সম্বন্ধ আর তার রহস্যটা কী একটু যদি জানিয়ে দাও।
বেশ। তাই দিচ্ছি। দু কথায় শোন, দানোটা আবার দূরের ক্রেনের দাঁড়াটার দিকে আমায় টেনে নিয়ে যেতে যেতে বললে, তুই মাফিয়াদের পেছনেই লেগে আছিস, এদিকে সারা দুনিয়ার ভয়ে যে নাড়িছাড়া অবস্থা জানিস না। জানবি আর কী করে, এই ওয়াশিংটনেই নানা মুলুকের মানুষের সব মাথাগুলো বড় বড় বিজ্ঞানীদের নিয়ে জড়ো হয়েছে শুধু একটা সর্বনাশ ঠেকাবার জন্য! সর্বনাশটা কী? সর্বনাশ হল এই যে ওই যে তোদের ক্লোরোফিল না কী বলে গাছের পাতার সবুজ ভাগটাকে, যা না হলে কোনও গাছপালাই কোথাও থাকত না আর তার দরুন পোকামাকড় থেকে সমস্ত জন্তুজানোয়ারও আর জন্মাতে পারত না, সেই ক্লোরোফিল—তোদের ওই ভাইরাস
কী একটা রোগের জীবাণুর এক ভয়ংকর ছোঁয়াচে রোগে পুরোপুরি তৈরি হতে না পেরে—শুকিয়ে যাচ্ছে। আর অন্য প্রাণীও শেষ পর্যন্ত বাঁচবার মতো খাবার না পেয়ে মারা যাচ্ছে। রোগটা আপাতত অতি সামান্য ছোট্ট একটা জায়গায় আরম্ভ হলেও এমন ভয়ংকর ছোঁয়াচে যে একবার কোনও রকমে সুবিধে পেলেই খড়ের গাদার আগুনের মতো সারা দুনিয়ায় দেখতে দেখতে ছড়িয়ে পড়বে। এখন–
লোকটাকে বাধা দিয়ে বললাম, এই রোগ আর তার সর্বনাশা কলাফল আবিষ্কার করেছেন ওই আমার বন্ধুটি প্রফেসার নিভোচি আর সেই জন্য ক্লোরোফিলে ছোঁয়াচে মহামারি না ছড়াতে দেবার জন্য সেখানে বাইরের কারওর যাওয়া বা সেখান থেকে কারওর বাইরে আসার মানা হয়ে গেছে, কেমন!
ঠিক, ঠিক? ঘাড়ে একটা রদ্দা দিয়ে লোকটা বললে, তোর যা বুদ্ধি দেখছি, তোকে নিউ এরা-তেই নিভোচির সঙ্গী হতে পাঠালে ভাল হত মনে হচ্ছে! কিন্তু এখন আর সময় নেই।
নিউ এরা! আমি তার কথার মানেই ভাবতে ভাবতে বললাম, নামটা যেন জানা মনে হচ্ছে! প্রশান্ত মহাসাগরের কুক দ্বীপপুঞ্জের একটা ছোট্ট দ্বীপ কি?
ঠিক, ঠিক? লোকটা আমার ঘাড়ে আর একটা রদ্দা দিয়ে তারপর ক্রেনের দাঁডার দিকে হিচড়ে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বললে, কালা নেংটি হলে কী হয়, তুই তো হাঁ করলেই সব বুঝে ফেলিস দেখি, তবে অত বুদ্ধি থাকাটা ভাল নয়, তাই তোকে—
দাঁড়াও, দাঁড়াও আমি যেন মিনতি করে তাকে থামিয়ে বললাম, পৃথিবীর বক্ষে সর্বনাশা ক্লোরোফিল-এর ছোঁয়াচে রোগ না ছড়াতে দেবার জন্যে নিউ এরা দ্বীপে এখন আর পা দেবার কথা কেউ ভাবে না, আর এই আসল মহলে এই আতঙ্ক ছড়িয়ে তোমরা এখন ওই ঘাঁটিতে তোমাদের পাচার করা সব আসামি আর রাজনীতির বড় বড় চাঁইদের বিনা ঝামেলায় সেখানে চালান করে রাখবার ব্যবস্থা করেছ।
ঠিক! ঠিক! বলে লোকটা আমায় আর একটা রদ্দা ঝাড়তে যাচ্ছিল। সেটা এড়িয়ে তারিফ করবার সুরে বললাম, এ কাজে প্রফেসার নিভোচিই তোমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তাকে চুপিসাড়ে এখান থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে ওই নিউ এরা দ্বীপে পুরে প্রাণের ভয় দেখিয়ে তার মতো মস্ত সৎ বিজ্ঞানীকে দিয়ে যা রেডিও তরঙ্গ মারফত রটনা করাচ্ছ, দুনিয়ার ওপর মহলে তাতে কারওর সন্দেহ জাগেনি।
একটু থেমেসাবাস তোমাদের। সত্যি বলিহারি, বলে লোকটার ঘাড়ে এবার একটা চাপড় দিয়েছি। আচমকা মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গিয়ে লোকটা আগুনের গোলা হয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গেছে। পাশ কাটিয়ে একটু ঠেলা দিতেই সে এবার সটান একেবারে ক্রেনের হাঁ করা নীচের দাঁড়াটার ওপরই গিয়ে পড়েছে।
ওপরের দাঁড়াটা তখন নামতে শুরু করেছে। আতঙ্কে চিৎকার করে সে লাফিয়ে পালিয়ে আসতে গেছে প্রথমে একটু ঠেলা দিয়ে তাকে আবার দাঁড়াগুলোর মধ্যে ফেলে দিয়ে নিজেই আবার টেনে বার করে নিয়ে বললাম, শোনো চর্বির পাহাড়, ক্রেনের দাঁড়ায় লোহা পেষাইয়ের জাঁতাকলে যাবার যদি ইচ্ছে না থাকে তাহলে ভালয় ভালয় যেখানে বলছি, এখনই নিয়ে চলো। কী? তাই করবে, না ক্রেনের ওই দাঁড়াই তোমার পছন্দ?
না, আর বেয়াড়াপনার চেষ্টা সে করেনি। সুবোধ বালকের মতো আমায় যথাস্থানে। এফবিআই-এর বড় ঘাঁটিতে পৌঁছে দিয়ে গেছে আর প্রফেসর নিতোচিকে অন্য সাধু ও শয়তান ও আরও অনেকের সঙ্গে নিয়ে দ্বীপ থেকে উদ্ধার করে আনার পর পৃথিবীর সেই সর্বনাশা পরিণামের আতঙ্ক দূর হয়ে গেছে।
ঘনাদা তাঁর বলা শেষ করে হঠাৎ নিজের হাতের দিকে চেয়ে চমকে উঠে বললেন, তা এ কী!
তা চমকে অমন কথা তিনি বলতেই পারেন। কারণ চিংড়ির কাটলেট থেকে শিকাবাব আর মোরগ তন্দুরা পেরিয়ে তখন তিনি তাঁর হাতে ধরা রসোমালাই-এর প্লেটে এসে পৌঁছেছেন।
মৌ-কা-সা-বি-স—একবচন, না বহুবচন
হ্যাঁ, সবুরে মেওয়া সত্যিসত্যিই ফলে।
বারেবারে না হোক দু-চারবার তো বটেই।
