এটা মাফিয়াদেরই কাজ এ বিষয়ে কারও সন্দেহ নেই। তাদের কয়েদি পাচারের কায়দাটা যদি বা অনুমান করে ঠেকাবার কড়া ব্যবস্থার চেষ্টা করা যায়, কোথায় পাচার করছে সেইটেই একেবারে অভেদ্য ধাঁধা।
মজার কথা হল এই যে কেঁচো খুঁড়তে গোখরো নয়, গোখরো খুঁজতে একেবারে চন্দ্রচূড়ের খাস কোটরের পাত্তা মিলে যাবে তা কে ভাবতে পেরেছিল।
মাফিয়াদের মানুষ পাচারের ব্যাপারে যা যা করা উচিত সে বিষয়ে যাদের সঙ্গে আলোচনা করবার তা মোটামুটি করে ফেলে ফিরে আসবার আগে দু-একজন ওখানকার বন্ধুর সঙ্গে দেখাশোনা সেরে নিচ্ছিলাম। সেই আলাপি বন্ধুদের প্রধান একজন হচ্ছেন বিখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী প্রফেসর নিভোচি। নিজের দেশ ছেড়ে প্রায় ছ-সাত বছর ধরে যিনি আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন শহরের ধারে মেরিল্যান্ডে একটি বিরাট ল্যাবরেটরিতে তাঁর গবেষণার কাজ করছেন।
মেরিল্যান্ডে নিভোচির বাড়িটা আমার চেনাই ছিল। সেখানে তাঁর খোঁজ করতে গিয়ে কিন্তু অবাক। বাসাটা ঠিকই আছে, সেখানে তাঁর থাকার প্রমাণস্বরূপ দরজায় নেমপ্লেটও লাগানো। কিন্তু তিনি সেখানে নেই। অনেকক্ষণ দরজায় বেল টেপবার পর সে ফ্ল্যাটবাড়ির ওপর তলার অন্য এক ফ্ল্যাটের বাসিন্দা আমায় হয়রান হয়ে বেল টিপে যেতে দেখে একটু দাঁড়িয়ে বলে গেলেন যে আমি বৃথাই বেল টিপছি। ওই ফ্ল্যাটে কেউ নেই। নেই আজ প্রায় এক বছরেরও বেশি।
এক বছরের বেশি কেউ ফ্ল্যাটে নেই! ফ্ল্যাটটা তবু প্রফেসর নিতোচির নামেই এখনও রাখা! আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার তাঁর এই রকম উধাও হয়ে থাকা নিয়ে কাগজে কোনও লেখালেখি, এমনকী মাফিয়াদের মানুষ পাচার নিয়ে যে সন্ধানী বৈঠক আমাদের সম্প্রতি চলছে তাতেও কোনও উল্লেখ কারওর মুখে শুনিনি!
একটা গভীর কিছু রহস্য যে ব্যাপারটার মধ্যে আছে, প্রফেসর নিভোচির ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে বার হবার পর থেকেই তার আভাস পেলাম।
ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমেই অবাক হয়ে দেখি একটা ট্যাক্সি আমার সামনের ফুটপাথ ঘেঁসে দাঁড়িয়েই হর্ন দিয়ে আমায় ডাকছে।
ট্যাক্সির দরকার আমার ছিল। কিন্তু এমনভাবে রাস্তায় পা দিয়েই সামনে অপেক্ষা করা ট্যাক্সি পাব তা ভাবিনি। বিশেষ করে সদর রাস্তা থেকে বেশ দূরের একটা রীতিমত নির্জন পাড়ায় একেবারে হুজুরে হাজির অবস্থায়।
ট্যাক্সিটা পেয়ে খুশি হয়েই তাকে আমার গন্তব্যস্থানটা জানালাম। ঠিকানাটা আমাদের গোপন বৈঠক যেখানে এখন চলছে সেই আস্তানার। আমেরিকার ট্যাক্সির একটা মস্ত সুবিধে এই যে ট্যাক্সিওয়ালাদের যাবার জায়গার ঠিকানা বোঝাতে গলদঘর্ম হতে হয় না। ঠিকমত ঠিকানা বলে দিলে তারা নির্ভুলভাবে সেখানে পৌঁছে দেয়। যে শহরে ট্যাক্সি চলে তার সমস্ত রাস্তাঘাট তন্নতন্ন করে জানা যে আছে তার পরীক্ষায় পাশ না করলে কেউ ট্যাক্সি চালাবার লাইসেন্স পায় না। আমার ট্যাক্সিওয়ালা এ নিয়মের ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই নয়।
কিন্তু খানিক বাদেই খেয়াল হতে চমকে উঠলাম। এ ট্যাক্সিওয়ালা চলেছে কোথায়? ওয়াশিংটন আর তার আশপাশের অঞ্চলের সামান্য যেটুকু পরিচয় আমার জানা তাতে ট্যাক্সি তো সম্পূর্ণ উলটো দিকে কোথায় যাচ্ছে।
লোকটাকে প্রথমেই দেখে যেমন একটু হাসিখুশি তেমনই বেশ একটু বুদ্ধিমানই মনে হয়েছিল। দেহটা অবশ্য তার বিপুল, ওভারসাইজ পোশাকেও যেন না কুলিয়ে ফেটে বার হতে চাইছে।
একী? তুমি যাচ্ছ কোথায়? বলে ট্যাক্সিওয়ালাকে হুঁশিয়ার করতে চেঁচিয়ে না উঠে পারলাম না এবার। আর সেই সঙ্গে আমার দিকে সেই বিরাট দেহের ওপর যে জালার মতো আকারের মুখটা সে ফেরাল তাতে সরল কৌতুকের বদলে সে কী বীভৎস টিটকিরির হাসি।
দেখতেই পাচ্ছিস, মর্কট গাড়িটাকে হঠাৎ এক জায়গায় থামিয়ে সে বলল, তোকে তোর গোরস্থানে নিয়ে এসেছি।
দেখতে আমি ভাল করেই তখন পেয়েছি। গোরস্থানেই আমায় লোকটা এনে ফেলেছে ঠিকই। কিন্তু মানুষের সাধারণ কবরখানার চেয়ে এ আরও ভয়ংকর জায়গা। আমেরিকায় বড় বড় শহরের কাছাকাছি এই রকম বিরাট গোরস্থান থাকে। তবে মানুষের নয়, ভাঙা অকেজো যন্ত্রপাতির, বিশেষ করে বাতিল পুরনো মোটর গাড়ির এখানে শেষ সমাধি হয়। সে সমাধি আবার ভীষণ। বিরাট আট-দশতলা উঁচু একটি কি দুটি ক্রেন তাদের ঝোলানো চেনের নীচের প্রকাণ্ড কাঁকড়ার দাঁড়ায় বাতিল মোটরগুলো তুলে নিয়ে একটা বিরাট লোহার পাতে ঘেরা কুণ্ডের মতো জায়গার ভেতর ফেলে দেয়, আর তারপর দানবীয় জাঁতার মতো প্রকাণ্ড লোহার চাকতির চাপে বড় বড় মোটরের দেহগুলো পাকিয়ে গুঁড়িয়ে একটা চ্যাপ্টা ধাতুর দলে যাওয়া ডেলা হয়ে যায়। জায়গাটায় ওই বিরাট ক্রেন আর এদিক ওদিকে বাতিল মোটর আর অন্যান্য যন্ত্রপাতির স্তুপ ছাড়া মানুষজন নেই বললেই হয়। ক্রেন যে চালায় সে বসে আছে টঙের ওপর। দলা পাকাবার দানবীয় জাঁতা যারা চালাচ্ছে তারাও আছে বহুদূরে তাদের ইঞ্জিন রুমে।
বৃত্রাসুর মার্কা লোকটার মতলব বুঝতে আমার আর তখন বাকি নেই। তবু যেন অতি সরল বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে আমায় নিয়ে কী করবে তুমি? এখানে তো বাতিল যন্ত্রপাতি মোটরের মতো জিনিস গালিয়ে অন্য কাজে লাগাবার সুবিধে করার জন্য দলা পাকিয়ে রাখা হয়।
ঠিকই বুঝেছিস? সেই বিদঘুটে হাসির সঙ্গে আমার ঘাড়টা এক হাতে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে সে বললে, লোহালক্কড়ের দলার সঙ্গে একটু মানুষের হাড়গোড়ের গুঁড়ো থাকলে মিশেলটা হয়তো বেশি কাজের হবে। তাই ওই যে ক্রেনটার প্রকাণ্ড দাঁড়া দেখছিস–তোকে ধরে নিয়ে গিয়ে অন্য লোহালক্কড়ের সঙ্গে ওর ভেতর তুলে দেব। তারপর ওই ক্রেনের দাঁড়া তোকে শূন্যে তুলে ওই—ওই লোহার কুণ্ডের মধ্যে টুপ করে ফেলে দিলেই তুই উদ্ধার পেয়ে যাবি
