নিউ এরা!নিউ এরা শব্দটা মনে পড়ে তোমার মজা করে চেঁচিয়ে উঠতে ইচ্ছে করছে?—এ ঘনাদার গলা না দূর আকাশ থেকে ছুটে আসা মেঘের গুমরানি।
আহাম্মক শিবুর তবু কি হুঁশ আছে। ঘনাদার কথায় যেন আরও মজা পেয়ে সে বললে, চেঁচিয়ে উঠতে ইচ্ছে না করে পারে? ওরকম অদ্ভুত কথায় গলায় যে সুড়সুড়ি লাগে।
সুড়সুড়ি লাগে—ঘনাদার গলায় এবার যেন পাখোয়াজি গমক, তারপর যেন চাপা গর্জন—ওই আজগুবি উদ্ভুট্টে শব্দটায় কী বোঝায় তা জানো? জানোনা, একদিন ওই শব্দটা শুনে দুনিয়ার প্রধান প্রধান দেশের যাঁরা হর্তাকর্তা তাঁরা চোখে অন্ধকার দেখে গোপনে গোপনে দিনের পর দিন গোপন পরামর্শ-সভা ডাকছিলেন। সে সব একান্ত গোপন সভার কথা দুনিয়ার কোথাও কোনও খবরের কাগজে বার হয়নি। সেখানে ডাক পড়েছে শুধু সেরা সকল বৈজ্ঞানিকের। সে সব বৈজ্ঞানিকদের মুখ কিন্তু একেবারে তালা বন্ধ। তাঁদের অতি আপনজনও ঘুণাক্ষরে এ বিষয়ে কিছু জানতেন না।
কেন দুনিয়ার হর্তাকর্তাদের মহলে এই আতঙ্ক? কেন ঘনঘন এ সব গোপন পরামর্শ সভা? সে সব কিছুর সঙ্গে ওই নিউ এরা শব্দটা কীভাবে জড়ানো তা কল্পনা করতে পারলে ও শব্দটায় গলা সুড়সুড় করবার মতো মজা পেতে না।
ঘনাদা একটু থামলেন। তা থামুন, আমরা এখন তাঁকে লাইনে পেয়ে গেছি। এখন আর আমাদের পায় কে?
নিজের ভাবনায় যিনি তন্ময় তাঁর অন্যমনস্কতার ভেতরেই চিংড়ির কাটলেটের প্লেটটা তাঁর হাতে ধরিয়ে দিয়ে শিবু যেন ভয়ে ভয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললে, নিউ এরা মানে সুপার নিউট্রন বোমা গোছের কিছু নিশ্চয়। বড় বড় চাঁইদের আগে ছোটখাটো কোনও রাজ্য বিজ্ঞানের আচমকা-পাওয়া-কোনও-প্যাঁচে যা আবিষ্কার করে বানিয়ে ফেলেছে বলেই বড় বড় চাঁইদের এত ভয়।
সুপার মেগাটন! অন্যমনস্কভাবে শিবুর এগিয়ে দেওয়া প্লেটের সুপার চিংড়ির কাটলেট জোড়া প্রায় শেষ করে এনে মৃদু নাসিকা ধ্বনি করে ঘনাদা বললেন, ও সব সুপার নিউট্রন-এ চোখে অন্ধকার দেখবার পাত্র ওই বড় বড় চাঁইরা নয়–তাদের হার্টফেল করবার অবস্থা যাতে হয়েছে তা এমন কিছু যা মানুষের কল্পনারও বাইরে।
ঘনাদা সামান্য কয়েক সেকেন্ড থামতেই পাকা হাতে তাঁর প্লেট বদল করে নিয়ে চিংড়ির কাটলেটের জায়গায় শিকাবাবের থালি ধরিয়ে শিবু বললে, কল্পনার বাইরে মানে আপনিও তখন কল্পনা করতে পারেননি?
জানতেও পারেননি?—আমাদের গলায় সবিস্ময় অবিশ্বাসের সুর—কোথায় ছিলেন তখন আপনি?
আমি! ঘনাদা দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করলেন, যেখানকার হোয়াইট হাউসের গোপন বৈঠকে বড় বড় চাঁই আর বৈজ্ঞানিকদের বৈঠক বসেছে, আমি তখন সেই মার্কিন মুলুকেই ওয়াশিংটন শহরেই আছি। সেখানে অবশ্য গিয়েছি ওই—
এফবিআই-কেজিবি-সিআইএ-এর ডাকে নিশ্চয়! গৌর এবার উচ্ছাসভরে জানিয়ে দিতে দেরি করল না।
থাক! সে কথা থাক! বলে স্বীকার-অস্বীকারের মাঝামাঝি ভাব দেখিয়ে ঘনাদা বললেন, যেই ডাকুক, একটা খুব জরুরি ধান্দাতেই সেখানে যেতে হয়েছিল। মার্কিন মুলুকে মাফিয়াদের দাপট তখন একটু বেশি রকম বেড়েছে। ইটালির পায়ের তলায় নেহাত এক পাটি জুতোর শামিল সিসিলি দ্বীপে যারা শ-চারেক কি পাঁচেক বছর ধরে গাঁইয়া শয়তানিতে হাত পাকিয়েছে, সিসিলির সেই সব গুণ্ডা শয়তানের বংশ আমেরিকায় গিয়ে মনের মতো জল-হাওয়ায় ফুলে-ফেঁপে উঠে গোসাপ থেকে একেবারে নোনা গাঙের ধেড়ে মানুষ-খেকো কুমির হয়ে উঠেছে। তাদের নিয়ে তখন নতুন করে যে সমস্যাটা জেগেছে সেটা হল তাদের যেন এক আশ্চর্য গায়েব হয়ে যাওয়া বা গায়েব করে দেওয়ার ক্ষমতা। এ গায়েব হওয়া বা করা মানে একেবারে সাবাড় করে দেওয়া বা হয়ে যাওয়া নয়। যারা এমন নিরুদ্দেশ হয়—নিজেদের দরকার মতো তাদেরকে আবার যথাস্থানে হাজিরও করে—এই মাফিয়ার দল। কিন্তু কেমন করে যে তাদের লোপাট করে রাখে সেই রহস্যেরই কোনও কূল-কিনারা দুনিয়ার অন্য ধুরন্ধরেরা তো বটেই, এফবিআই-কেজিবি-সিআইএ মিলেও করতে পারছে না।
ব্যাপারটা ক্রমশ সঙ্গিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন মুলুকে দুটিই মাত্র রাজনৈতিক দল-রিপাবলিক্যান আর ডেমোক্র্যাট। ধরা যাক প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়াই চলছে। এ লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধিরই জেতবার বারো আনা সম্ভাবনা। তিনিই হঠাৎ দেখা গেল নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। নিরুদ্দেশ মানে শেষ কিন্তু নয়। কিছু দিন বাদে বাদে তাঁর টাটকা সব ভাষণ নানা বেতার তরঙ্গে শোনা যেতে লাগল। কোথা থেকে বেতার ভাষণ আসছে উপযুক্ত যন্ত্র দিয়ে তা ধরে ফেলে সেখানে যে সন্ধান চালাবে তার উপায় নেই। একদিন যদি নিকারাগুয়ার কোনও অঞ্চল থেকে বেতার ভাষণ আসছে বলে ধরা যায় তার দুদিন বাদে সে ভাষণ আসছে ক্যানাডার টরেন্টো কি কিউবার হাভানা থেকে। তার মানে রেকর্ড করা ভাষণ অমনই করে নানা জায়গা থেকে বেতার তরঙ্গে ছড়াবার ব্যবস্থা আছে।
শুধু এই ধরনের ব্যাপারই নয়, পর পর অনবরত খুনে ডাকাতদের মতো ফাঁসির আসামিরাও জেল থেকে কেমন করে পালিয়ে উধাও হয়ে গেছে। জেল থেকে পালানো—ঘুষ-ঘাস আর চোর-পাহারাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু তারা অমন হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে কী করে? তাদের বেলাতেও হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া মানে একেবারে নিকেশ হয়ে যাওয়া যে নয় তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। ওই রকম দিগ্বিদিক থেকে মাঝে মাঝে ছড়ানো বেতার ঘোষণায়। এদের ঘোষণাগুলো সাধারণত এই রকম যে, আছি, আমরা আছি! বহাল তবিয়তে আছি। মোটা করে গ্যাঁটের কড়ি ছাড়ো, তোমাদেরও আমাদের মতো কোনও গারদ আটকে রাখতে পারবে না। ইলেকট্রিক চেয়ারেরও সাধ্য নেই তোমাদের কোলে বসায়। টাকা ছাড়ো, মোটা টাকা!
