ঠিক তাল-ঠোকা বাহাদুরির সুরে নয়, এবার যেন খানিকটা সরল আগ্রহের সঙ্গে এসব কথা লিখে মৌ-কা-সা-বি-স এ-চিঠির শেষে যথারীতি একটি দৈনিকের একটি নম্বর দেওয়া পোস্টবক্সে আমাদের উত্তরটা তাদের পাঠাতে অনুরোধ করেছে।
হ্যাঁ, এবার সত্যিই চিঠির শেষে বেশ একটু নরম অনুরোধের সুর। আমরা যেন তাঁদের এ চিঠি অবহেলাভরে ছেঁড়া কাগজের ঝুড়িতে না ফেলি। আর কিছু না পারি নিউ এরা শব্দটার রহস্যটা যে কী তা একটু জানবার চেষ্টা যেন অতি অবশ্য করি।
তাল-ঠোকা টিটকিরির বদলে বিনীত অনুরোধ ঠিকই। কিন্তু তারই বা আমরা করতে পারি কী?
মৌ-কা-সা-বি-স-এর তাগিদের দরকার ছিল না, নিজেরাই এখন আমরা শুধু নিউ এরা নয়, নিভোচির রহস্যটা যে কী তা একটু জানবার জন্য ব্যাকুল।
কিন্তু জানতে চেষ্টা করার একমাত্র যা উপায় সেই বেড়ালের গলায় ঘন্টাটা বাঁধবে কে? আর বাঁধবেই বা কীভাবে।
টঙের ঘরের তাঁকে বাগে আনার সবচেয়ে সোজা উপায় তো তাঁর জন্য চর্ব চোষ্য লেহ্য পেয়র ঢালাও নৈবেদ্য সাজানো। কিন্তু তাতে এখন চিড়ে ভিজবে বলে তো আশা হচ্ছে না।
তবু চেষ্টার ত্রুটি আমরা করিনি। আমিষের দিকে তাঁর যা পছন্দ সেই চিংড়ির কাটলেট থেকে শুরু করে সাত্ত্বিকের দিকে বাগবাজারের সেরা রসোমালাই পর্যন্ত কিছুই তাঁর জন্য সাজিয়ে রাখতে ত্রুটি করিনি।
কিন্তু যাঁর জন্য এত যোঢ়শোপচারের নিবেদন তিনি কোথায়? প্রথমত, নীচের আড্ডাঘরের বারান্দায় আমাদের হইচই টঙের ঘরের টনক নড়াবার কথা। তার ওপর বনোয়ারিকে দিয়ে খবরটাও যথাসময়ে পাঠাতে ভুল হয়নি আমাদের।
তবু তেতলা থেকে নামবার ন্যাড়া সিঁড়িতে বিদ্যাসাগরি চটির ফট ফট শব্দ কই? কই বারান্দা থেকে আড্ডাঘরে ঢোকবার আগে সেই পেটেন্ট গলাখাঁকারি।
না, এবার আর নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকা যায় না। পরপর চারজনই ন্যাড়া সিঁড়ি বেয়ে খোলা ছাদে উঠে সটান সেই টঙের ঘরে। আমাদের পিছু পিছু ঢাউস দুটি ট্রেতে সব প্লেট সাজিয়ে বনোয়ারিও।
না, ভয় ভাবনা করার মতো কিছুই সেখানে দেখলাম না। ঘনাদা সশরীরে সেখানে উপস্থিত এবং বেশ বহাল তবিয়তেই।
তবে আমাদের আড্ডাঘরের অমন রসালো নিমন্ত্রণে সাড়া না দেবার কারণ কী?
বনোয়ারির সামনে ট্রে থেকে নামিয়ে প্লেটগুলো বড় টেবিলের অভাবে ঘনাদার তক্তপোশেরই এক ধারে সাজিয়ে রাখবার মধ্যে সেই কথা জিজ্ঞাসা করলাম। ব্যাপার কী, ঘনাদা? বনোয়ারি আপনাকে ঠিক মতো খবর দেয়নি বুঝি?
খবর? যে খবরের কাগজটি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলেন তা থেকে মুখ তুলে ঘনাদা যেন একটু বিস্মিতভাবে আমাদের দিকে চেয়ে বললেন, কীসের খবর?
এই—এই মানে— আমরাই এবার একটু ফাঁপরে পড়লাম নিজেদের কথাটা অর্ধেক ঢেকে জানাতে। আমতা আমতা করে বললাম, মানে, ওই আজ হঠাৎ ক-টা স্পেশ্যাল ডিশ আনাবার সুবিধে পেলাম কিনা, তাই এই।
শিশিরের বাধো বাধো কথাটা গৌরই প্রাঞ্জল করে দিয়ে বললে, এই যেমন ডাবল সাইজ চিংড়ির কাটলেট, শিক নয়, একেবারে সাচ্চা শিকাবাব।
হাঁ, ঘনাদা প্লেটগুলোর ওপর দৃষ্টি বোলাতে বোলাতে বাধা দিয়ে বললেন, দেখতে তো পাচ্ছি, প্লেটগুলো। তবে আজ বারটা যে বুধ সেটা তো ভুলতে পারছি না।
বারটা যে বুধ! বলছেন কী ঘনাদা? বুধবারের সঙ্গে এই সব উপাদেয় ভোজ্যের কী সম্বন্ধ?
সেই কথাই সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে হঠাৎ সম্বন্ধের সূত্রটা যে কী তা মনে পড়ে গেল।
দোষটা সম্পূর্ণ শিবুর। আগের বুধবারে বাজারে তেমন ভাল মাছ-টাছ না পেয়ে ফুলকপি, স্কোয়াস কড়াইশুটির মতো অসময়ের বেশ ক-টা দুর্লভ সবজি এনে দোষটা কাটাতে চেয়েছিল। তার সেই নিরামিষ বাজারেও খুব একটা অপরাধ হত না। কিন্তু এর ওপর সবাই মিলে টেবিলে খেতে বসবার পর সে যে টিপ্পনিটা কেটেছিল সেইটিই যে মারাত্মক হয়েছে তা এখন বুঝলাম।
নিরামিষ হলেও রামভুজের রান্নার বাহাদুরি যাবে কোথায়? একটার পর একটা পদে থালা চেটেপুটে সাফ করতে করতে ঘনাদা আধা ঠাট্টার সুরে একবার বলেছিলেন, কী হে, আজ শুধু বোটানিক্যাল গার্ডেনেই ঘুরতে হবে নাকি?
কথাটায় ঠিক বরাদ্দ মাফিক হাসলেই ব্যাপারটা চুকে যেত। কিন্তু আহাম্মকের মতো শিবু একথার ওপর বলে বসেছিল, সেইটেই উচিত নয় কি? হপ্তায় একদিন স্রেফ আমিষের বদলে নিরামিষ তো সব শাস্ত্রের বিধান।
ও! তাই বুঝি! বলে যে ঘনাদা তারপর একটু বেশি রকম গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন অন্য কী-একটা আলোচনার উত্তেজনায় সেটা সেদিন তেমন লক্ষই করিনি। কিন্তু এখন ফ্যাসাদ যা বেধেছে তা থেকে উদ্ধারের উপায় কী?
কিন্তু কীসে যে কী হয় তা কেউ কি পারে বলতে? যার আহাম্মকিতে আমাদের এই মহাসংকট, সব মুশকিল আসান হয়ে গেল তারই আর-এক আহাম্মুকিতে।
বারটা যে বুধ ঘনাদার এই কথাটায় হঠাৎ যেন দারুণ মজার খোরাক পেয়ে শিবু হাসতে হাসতে বলল, বারটা যে বুধ! বাঃ, এই সব প্লেট দেখে আপনার বুধবারের কথা মনে হল। আর আমার কী মনে হচ্ছে জানেন? মাথা নেই মুণ্ডু নেই তবু মনে হচ্ছে কী এক নিউ এরার কথা। হঠাৎ খেয়াল হচ্ছে যে ইউরেকার মতো নিউ এরা বলে চেঁচিয়ে উঠি। সেই সঙ্গে নিভোচি বলেও চেঁচাতে পারি।
আমরা তখন প্রায় জমে পাথর হয়ে গেছি। আহাম্মক শিবুটা শেষ পর্যন্ত করল কী! ঘনাদার দিকে চেয়েই বুঝেছি, সর্বনাশের আর কিছু বাকি নেই। মুখটা তাঁর ঘণ্টায় একশো মাইল বেগে ছুটে আসা সাইক্লোনের পূর্বাভাষের মতো থমথমে। যে কোনও মুহূর্তে আকাশটায় ফেটে পড়তে পারে।
