ধৈর্য না হারিয়ে আমাদের যে লাভই হয়েছে ওপরের উদ্ধৃতিটি তার প্রমাণ। উদ্ধৃতিটি যে সেই অদ্বিতীয় মৌ কাসা-বিস-এর কোনও লেখা থেকে তা অনেকেই এতক্ষণে বুঝে ফেলেছেন বোধহয়।
প্রায় তিন মাস ধরে এই রকম কোনও কিছু লেখা একটি চিঠির জন্য হা-পিত্যেশ করে আছি। কতবার লোভ হয়েছে মৌ-কা-সা-বি-স-এর দেওয়া একটি বিশেষ খবরের কাগজের নম্বর দেওয়া পোস্টবক্সের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠিয়েই দেখি, ফল কী হয়।
শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে সে দুর্বলতা জয় করে আরও কিছুকাল অপেক্ষা করবার পণ করেছি।
তার ফল সত্যি আশাতীতভাবেই ফলেছে বলা যায়। চিঠি যা এসেছে, ওপরের উদ্ধৃতিটুকু থেকেই বোঝা যাবে যে তা নেহাত মামুলি সাদামাঠা কিছু নয়, রীতিমত তাজা বারুদ-ঠাসা-কিছু, একটু আগুনের ফুলকি লাগলেই যা লণ্ডভণ্ড কাণ্ড বাধাতে পারে।
চিঠিটা আগের বারের মতোই এক প্রকাশকের মারফত এসেছে। তবে এবার প্রাপকের নামটা আমাদের টঙের ঘরের তাঁর নয়, এবার প্রাপক হিসাবে নাম যা দেওয়া হয়েছে তা একজন বিশেষ কারওর না হয়ে একেবারে পুরোপুরি চারজনের। সে চারজন হচ্ছি আমরা অর্থাৎ গৌর শিবু শিশির ও আমি।
নামগুলি সবই পদবিহীন। শুধু আদি অংশটুকুর সারি সেখানে এরকম দাঁড়িয়েছে, গৌর শিবু শিশির ও সুধীর।
যে প্রকাশকের ঠিকানায় এ চিঠিটি পাঠানো হয়েছে তিনি যে বাজে কাগজের ঝুড়িতে না ফেলে এ চিঠি কষ্ট করে আমাদের বাহাত্তর নম্বরের ঠিকানায় রি-ডাইরেক্ট করে পাঠিয়েছেন, এ তাঁর অনেক দয়া।
ঘনাদার নামে আর উদ্দেশে অনেক আজে বাজে আজগুবি আবদারের চিঠিপত্রই তো আসে। তেমনই একটা উটকো ঝামেলা মনে করে তিনি চিঠিটা আমাদের ঠিকানায় পাঠাবার কষ্ট না করলেই আমাদের কত বড় লোকসান যে হয়ে যেত তা শিবুর পড়তে-শুরু করা চিঠিটার সামান্য নমুনা থেকে বুঝতে পারছিলাম।
আজ শিবুর অবশ্য মস্ত একটা বাহাদুরির দিন। দুপুরবেলা আমাদের কেউ না কেউ রোজই বাইরের লেটারবক্সটা একবার হাতড়ে আসে। আজ পালাটা ছিল শিবুর।
মৌ-কা-সা-বি-স-এর প্রথম চিঠিটা পাওয়ার পর থেকে দুপুরের এই লেটারবক্স হাতড়াতে যাওয়াটার সঙ্গে একটা উত্তেজনা জড়িয়ে গেছে। কী আসে, কী হয় গোছের একটা আগ্রহের অস্থিরতা কিছুতেই যেন চাপা যায় না।
দিনের পর দিন হতাশ হয়ে বাইরে একটা নির্লিপ্ত উদাসীন ভাব দেখালেও শিবু বেশ একটু ধুকধুকুনি না নিয়ে কি নীচের তলার সিঁড়ির পাশের লেটারবাক্সটা খুলেছে?
খুলে ভেতরে হাত গলিয়ে যা পেয়েছে তাতেই তুড়ি মেরে লাফ দিয়ে ওঠা খুব অন্যায় হত না। না, ইলেকট্রিকের বিল-টিল গোছের কিছু বা আজেবাজে সস্তা সাপ্তাহিক কাগজের পাওনা প্যাকেট নয়, রীতিমত লম্বা খামের মুখ বন্ধ করা চিঠি।
লেফাফাটা বার করে এনে তার ওপরের নাম চারটে পড়বার পর শিবুর ধীরেসুস্থে জামা খোলার আর তর সয়নি। একটানে লেফাফাটার একটা মাথা ছিঁড়ে ফেলে ভেতরের চিঠিটা বার করে এক-এক লাফে তিন-তিনটে করে ধাপ ডিঙিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে ওপরের বারান্দায় উঠেই, শোনো, শোনো, বলে চিৎকার করে আড্ডাঘরে ঢুকেই যা পড়তে শুরু করেছে তা আগেই জানিয়েছি।
দম নিতে একটু থামার পর শিবুর আর শুরু করবার সুযোগ হয়নি। তিনদিক থেকে আমরা তিনজন তার দিকে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে জিজ্ঞাসা করেছি অস্থিরভাবে, কী কীকার চিঠি? সেই মৌ-কা-সা-বি-স—
আমরাও আমাদের প্রশ্নগুলো শেষ করতে পারিনি। হাত বাড়িয়ে শিবুর কাছ থেকে চিঠিটা ছিনিয়ে নেওয়াও সম্ভব হয়নি। আমাদের উদ্দেশ্যটা অনায়াসে অনুমান করে আগেই চিঠিটা চটপট আমাদের নাগালের বাইরে সরিয়ে নিয়ে সে বলেছে, তিষ্ঠ, তিষ্ঠ। এতকাল যদি ধৈর্য ধরতে পেরে থাকো তাহলে আর কয়েক সেকেন্ড সে ক্ষমতার পরিচয় দাও। নইলে তোমাদের টানাটানিতে সমস্ত বর্তমান পৃথিবীর পক্ষে অমূল্য একটি বিপদ সংকেতের বার্তা ছিন্ন হয়ে–
আরে, থামো, থামো,—এবার তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগ্রহটা দমন করেই ধমক দিতে হয়েছে শিবুকে, বাজে বাল্লা না করে চিঠিটায় কী আছে, পড়ো। আমরা ঠাণ্ডা হয়েই শুনছি।
শান্ত হয়েই তারপর শিবুকে চিঠিটা পড়ে শোনাতে দিয়েছি, কিন্তু সে যা শুনিয়েছে তাতে অস্থির না হয়ে ওঠা আর সম্ভব হয়নি।
হ্যাঁ, চিঠিটা মৌ-কা-সা-বি-স-এর, কিন্তু তাদের কাছ থেকেও এমন আজগুবি আষাঢ়ে চিঠি পাওয়ার কথা ভাবতে পারিনি। মৌ-কা-সা-বিস এবার যেন নিজেদের আগের সব বাহাদুরির ওপর টেক্কা দিয়েছে।
চিঠিটা যে টঙের ঘরের তাঁর নামে নয়, আমাদের চারজনের নামে পাঠানো হয়েছে, তা আগেই জানিয়েছি। নাম বদলের কৈফিয়ত দিয়েই চিঠিটা এইভাবে শুরু—
বন্ধুগণ, ইতিপূর্বে আপনাদের মেসের টঙের ঘরের তাঁহার উদ্দেশে বেশ কয়েকটি পত্র প্রেরণ করিয়াও তাহাতে কোনও প্রকার সাড়া না পাইয়া এবার সেই একমেবাদ্বিতীয়ম এবং চার বাহনকে উদ্দেশ করিয়াই এ পত্র পাঠাইলাম। আশা করি এ পত্রে বিবৃত বিষয়ের গুরুত্ব বুঝিয়া আপনাদের সর্বজ্ঞ ঠাকুরের কাছে বিশ্বের মহাসংকটের কীসে পরিত্রাণ তাহা জ্ঞাত হইবেন।
বিশ্বের মহাসংকটের কথা এবার সহজ ভাষায় সংক্ষেপে বললে এইরূপ দাঁড়ায় বলে মৌ-কা-সা-বি-স যা জানিয়েছে তার খানিকটা শিবুর মুখে আগেই শুনেছি। শিবু যেখানে থেমেছিল তার পরের কথাগুলো হল—আপনাদের সর্বজ্ঞ ঠাকুর সে বিষয়ে কিছু জানেন কি? তিনি কি বলতে পারেন পৃথিবীর কোন এক অভিশপ্ত জায়গা থেকে সমস্ত প্রাণিজগতের চরম সর্বনাশ কেমন করে ঘনিয়ে আসছে? জানেন কি যে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিমান কটি দেশ সম্পূর্ণ খবর না পেলেও সামান্য একটু আঁচ পেয়েই গভীর আতঙ্কে অতি গোপন সব বৈঠকে আরও বিশদ করে ব্যাপারটা জানবার আর সম্ভব হলে তার প্রতিকারের উপায় সন্ধানের চেষ্টা করছেন? তিনি কি জানেন আকারে নেহাত সামান্য পৃথিবীর একটি বিশেষ জায়গা মাত্র কিছুদিন আগে থেকে মানুষের ভূগোল থেকে একরকম বাদ দিয়ে রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। বিশ্বে সাধারণ মানুষের মধ্যে উন্মত্ত আতঙ্ক ছড়াবার ভয়ে এই নিয়ে হইচই দূরে থাক, কোনও রকম আলোচনাও বাইরে প্রকাশ করতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু প্রধান প্রধান দেশের সবচেয়ে ওপরের মহলে কর্তাদের এই ব্যাপারে দিনেরাত্রে ঘুম নেই। যে জায়গাটুকু নিয়ে এই ভয়ংকর আতঙ্ক তা এখনও মাপে একশো বর্গমাইলের বেশি হবে না, কিন্তু পৃথিবীর বুকের বলতে গেলে ওই এক বিন্দু জায়গা এখন অমন দশ লক্ষ মেগাটন বোমার চেয়ে সর্বনাশা হয়ে উঠেছে। যে চরম ধ্বংসের নিয়তির দিকে তা আমাদের নিয়ে চলেছে তা ঠেকাবার আর উপায় আছে বলে মনে হয় না। সুতরাং অদূর ভবিষ্যতের অনিবার্য সৃষ্টি বিনাশের পরিণাম মেনে নিয়ে শেষ পর্যন্ত দুটো সাধারণ প্রশ্নই আপনাদের মারফত আপনাদের সেই টঙের ঘরের তাঁকে জিজ্ঞাসা করতে চাই। নিভোচি বলে কারওর কথা কিছু কি তিনি জানেন? আর নিউ এরা শব্দটা শুনলে কিছু তাঁর মনে হয় কি না।
