উৎসাহভরে শিবু এবার একটু মাতব্বরি মন্তব্যের লোভ ছাড়তে পারেনি। যা থেকে ও দেশটার নামও টাঙ্গানাইকা।
না, ঘনাদা তাকে দমিয়ে দিয়ে বলেছেন, এখন ওই অঞ্চলের নাম হয়েছে টানজানিয়া। সে যাই হোক টাঙ্গানাইকা হ্রদ যিনি স্পিক নামে আরেক বন্ধুর সঙ্গে আবিষ্কার করেন তাঁর কথাই বলি। নাম তাঁর রিচার্ড বার্টন। নানা গুণে গুণী। একাধারে পণ্ডিত বিদ্বান তার ওপর অস্থির ছটফটে দুঃসাহসী ভবঘুরে মানুষ। সিপাই বিদ্রোহের আগেই ভারত থেকে এক বন্ধু জন স্পিককে নিয়ে নীলনদের উৎস সন্ধানে আফ্রিকায় চলে আসেন। তাঁর সেই অভিযানে টাঙ্গানাইকা হ্রদ আবিষ্কার করলেও এ সন্ধান ছেড়ে তিনি আরেক নেশায় মাতেন। তা হল সহস্রাধিক আরব্য রজনীর যে সব আশ্চর্য অপরূপ মুখে-মুখে বলা কাহিনী তখন আরবি ভাষার জগতে নেহাত সাধারণ সরাই আর কফিখানার আড্ডাবাজ খদ্দেরের মধ্যে ছড়িয়ে ছিল সেগুলি সম্পূর্ণ সংগ্রহ করা।
এ কাজের জন্যই তিনি সমস্ত সাহিত্যরসিক দুনিয়ার কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। স্যার উপাধিও তিনি এজন্য পেয়েছিলেন।
একটু থেমে আমাদের কিঞ্চিৎ হতভম্ব মুখগুলোর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ঘনাদা তারপরে বলেছেন, উজিজি আসলে একটা গ্রামের নাম। ওই টাঙ্গানাইকা হ্রদেরই ধারে। আগে গ্রাম ছিল, এখন শহর হয়েছে। রিচার্ড বার্টন আরবদের ক্রীতদাস জোগাড় আর চালানের এ ঘাঁটিতে গিয়েছিলেন। এবং এর পরে বিখ্যাত আফ্রিকা-পর্যটক লিভিংস্টোনকে আরেক আফ্রিকা-পর্যটক স্ট্যানলি ওখানে অসুস্থ অবস্থায় খুঁজে পান।
আগেকার চালু জার্মান ভাষা ছেড়ে ইংরেজি ধরার দায় এই অঞ্চলের বান্টু জাতেদের ওপরই পড়েছিল। প্রথম মহাযুদ্ধের আগে ও অঞ্চলটা ছিল জার্মানদের অধীনে। জার্মানরা প্রথম যুদ্ধে হেরে যাবার পর অঞ্চলটার আসল অধিকার ইংরেজদের হাতে আসে। শিবু এ পর্যন্ত যা বলেছে তা মোটামুটি ঠিক হলেও ওই শেষের কথাটাই একেবারে ভুল। ও যাদের সোনালি গমের খামার দেখতে দেখতে উটপাখি আর জিরাফ ছোটা তেপান্তরে টাঙ্গানাইকার মিষ্টি জলের অঢেল সেচে ক্রমশ ছড়িয়ে যাবার কথা বলেছে সেই বোথা আর স্মাটসরা আসলে কালা-ধলার আসমান-জমিন ফারাক বর্ণবিদ্বেষী দক্ষিণ আফ্রিকার বুয়র বংশের লোক। জার্মানদের প্রতাপের সময় তাদের একই মেজাজ মতলবের সুযোগ নিয়ে সেই বর্ণবিদ্বেষী বুয়রদের কিছু কিছু দল ওই সোনালি মাটির দেশে খামার পত্তন করতে শুরু করে। তাদের মতলব ছিল ধীরে ধীরে এ রাজ্যটাও হাতের মুঠোয় নিয়ে এখানে তাদের নিজেদের দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কালা-ধলার ভেদের রাজ্য সৃষ্টি করে।
তারা এখানে এসে নিজেদের মতলব হাসিল করতে প্রথমে সরল কাফ্রিদের অবজ্ঞা আর কুসংস্কারের সুযোগ নেবার জন্য মোটারকম নানা ঘুষ দিয়ে ধড়িবাজ সব ওঝাদের হাত করে। এই ভূতের ওঝা বা উইচ ডক্টরদের সাহায্যে এ অঞ্চলের সরল বান্টুদের তারা ক্রমশ গোলাম বানিয়েই ছাড়ত। কিন্তু তা আর হল কই! একের পর এক তাদের খামারের সব গমের খেত শুকিয়ে ঝলসে যেতে লাগল কী যেন এক অভিশাপে। শেষে এমন হল যে, নিজেদের চাষবাস সব কিছু ছেড়ে আবার সেই দক্ষিণ আফ্রিকায় ফেরা ছাড়া তাদের আর কোনও উপায় রইল না।
কিন্তু হঠাৎ তাদের খামারগুলোর অমন অবস্থা হল কেন? না জিজ্ঞাসা করে পারলাম না আমরা— চাষবাসের বিদ্যে তাদের তো ভালই জানা ছিল। অভিশাপ-টভিশাপ গোছের কুসংস্কার কাটাবার মতো ভূতের ওঝারাও ছিল তাদের হাতে।
তা ছিল! ঘনাদা স্বীকার করলেন, কিন্তু ওঝাদেরও ভিরমি খাওয়ানো বুনো হাতির পিঠে-চড়া কাঁধে ঝোলা-জড়ানো এক নতুন ওঝার জাদুতে খ্যাপা অসুরের মতো ওঝাদেরও আতঙ্ক এসে সব ফসলের খেতে দেখা দেবে, আর তারপর কিছুদিন বাদে কী এক ফসলদানার মতো পোকার ঝাঁকে আকাশ অন্ধকার হয়ে যাবার পর সমস্ত খেত ঝলসে যাবে, এ তো আর কেউ ভাবেনি।
তার মানে? আমরা একটু বিমূঢ় হয়ে বলেছি, ওই সেরা নতুন ওঝাই এ কাজ করেছে, কিন্তু বুনো হাতির পালের একটার পিঠে চড়ে যাওয়াও তো চারটিখানি কথা নয়। বুনো হাতি বশ মানাল কী করে?
খুব অবাক হবার কিছু আছে কি? ঘনাদা একটু হাসলেন, প্রথম হাতি ধরে বশ মানানোর বিদ্যা যিনি শিখিয়েছিলেন, সেই ঋষি পালক্যপ্যের দেশের মানুষের পক্ষে ও কাজ কি অসম্ভব!
তার মানে এই আমাদের বাংলা অঞ্চলের কেউ গেছলেন ওখানে, ওঝার সেরা ওঝা হয়ে? আমাদের চোখগুলো সব বিস্ফারিত—কিন্তু অভিশাপটা ছিল কী?
কী আর, ঘনাদা বলেছেন হেসে, থলের মধ্যে মাজরা পোকার ডিম। তখন পর্যন্ত ঝলসা রোগের বাহন এ পোকার খবর তো দুনিয়ার কাছে পৌঁছয়নি।
ঘনাদা চুপ করলেন। আমাদেরও কারও মুখে কিছুক্ষণ আর কথা বার হল না।
এরপর কী করব এই আমাদের ভাবনা। ব্যক্তিগত কলমে প্রস্তুত বলে বিজ্ঞাপন দেব একটা, না এবার চুপ করে বসে থাকব কিছুদিন, এখনও ঠিক ধরতে পারিনি।
মৌ-কা-সা-বি-স থেকে রসোমালাই
হ্যাঁ, পৃথিবীর এমন বিপদ তার সৃষ্টির সময় থেকে আগে কখনও আসেনি। সমস্ত পৃথিবীই তার সমস্ত প্রাণিজগৎ নিয়ে ধ্বংস হতে যাচ্ছে। না, না, পারমাণবিক বিস্ফোরণ নয়, তার চেয়ে ভয়ংকর অপ্রতিরোধ্য কিছুতে। কল্পনাতীত সে সর্বনাশ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে, ধীরে ধীরে, কিন্তু অমোঘভাবে কোথা থেকে—
শিবু দম নেবার জন্য থামল। কথাগুলো কিন্তু শিবুর নিজের কিংবা আমাদের কারওর বা স্বয়ং টঙের ঘরের তাঁরও নয়। কথাগুলো সেই তাদেরই, ধৈর্য ধরে বেশ কিছুকাল যাদের জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম।
