খেই পেয়ে গিয়ে আমি এবার একটু মেজাজি গলায় বলেছি, কিন্তু একটু আছে বইকী! নামটা যেমন হোক, জিনিসটি ওই দোসার রকমফের নয় কি!
দোসার রকমফের এই উত্তাপাম? শিবু যেন চরম অপমানে তোতলা হয়ে গিয়ে বলেছে, তোতোমাদের কী করতে হয়, জানো? ইকোয়েটর-এর লাগাও খাঁ খাঁ রোদের রাজ্যে ভিসুভিয়াস-এর মরা জাতভাইয়ের মাথায় বরফের চূড়ায় তুলে দিতে হয়। তখনও হয়তো তোমরা বলবে, এর আর নতুন কী?
দাঁড়াও! দাঁড়াও! আমরা যেন দিশাহারা হয়ে বললাম, আমাদের না তোমার কার মাথার ঘিলুটা নড়ে গেছে, আগে বুঝি! কী বললে তুমি? ইকোয়েটর-এর লাগাও মানে বিষুবরেখার কাছাকাছি খাঁ খাঁ রোদের রাজ্যে ভিসুভিয়াস-এর মানে সেই বিখ্যাত ভলক্যানো-র মরা জাতভাইয়ের বরফ ঢাকা চূড়ায়—
এই পর্যন্ত বলেই আমরা হাসতে শুরু করলাম, শিবুকে যেন তেলেবেগুনে জ্বালিয়ে।
হাসছ! তোমরা হাসছ? শিবু আমাদের দিকে তখন এমন হিংস্রভাবে চাইলে যেন আমাদের বিকশিত দন্তপাটিগুলো গুঁড়ো না করে তার তৃপ্তি নেই।
হ্যাঁ, হাসছি! আমরা নির্বিকারভাবে ঘনাদাকেই সালিশি মেনে বললাম, ঘনাদাই বলুন না, এরকম প্রলাপ শুনে না হেসে পারা যায়।
ঘনাদা তখন তাঁর তৃতীয় উত্তাপামটি শেষ করার পর বনোয়ারির টিফিন ক্যারিয়ারের অন্য একটি পাত্র থেকে বড় চামচে বার করে দেওয়া সুগন্ধে ভুরভুর ছানার পোলাও সবে একটু চাখতে শুরু করেছেন।
আমাদের জিজ্ঞাসায় তাঁর মুখে সামান্য যে একটু হাসির আভাস দেখা গেল, সেটা করুণার, না ধরি-মাছ না ছুঁই পানি গোছের দায় এড়ানোে চতুরতার, তা বোঝা শক্ত বলে তাঁকে আবার একটু উসকে দেবার চেষ্টায় বলতে হল, কী বলল শুনলেন তো! বিষুবরেখার কোথাও খাঁ খাঁ রোদের রাজ্যে ভিসুভিয়াস-এর মরা জাতভাইয়ের
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমিই বলছি, শিবুই কথাটা যেন আমাদের মুখ থেকে কেড়ে নিয়ে গড়গড় করে বলে গেল, তুষার ঢাকা চূড়োয়—এই তোমাদের আজগুবি মনে হচ্ছে? তা হলে যদি জিজ্ঞাসা করি, সিপাই যুদ্ধের পরের বছরে যিনি আরকী আশ্চর্য অজানা কিছু আবিষ্কার করেছিলেন, তার আগের বছরে তিনি কোথায় ছিলেন? এর পর সেই আশ্চর্য মানুষটি মিশরের কায়রো শহরের কফিখানায় ঘুরে ঘুরে আরব্য উপন্যাসের হাজার রজনীর উপাখ্যান নতুন করে উদ্ধার করেন।
থামো, থামো! আমরা নিজেদের মাথাগুলো দুধারে চেপে ধরে বললাম, মাথায় একেবারে চরকিপাক লেগে গেছে।
তাহলে আরও একটু লাগাই! বলে শিবু যেন মজা পেয়ে বলে গেল, এই সঙ্গে যদি উজিজি শব্দটা উচ্চারণ করি তাতে হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যায় কি?
আমি যেন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠার ভান করে রীতিমত বিরক্তির সঙ্গে বললাম, শোনো শোনো, অত যদি আবোলতাবোল বকবার শখ থাকে তো নিজের ঘরে গিয়ে খিল দিয়ে দরজা বন্ধ করে মনের সুখে যা খুশি বললাগে যাও। আমাদের এমন জ্বালাতন করবার অধিকার।
অধিকার আমার নেই বলছ? কিন্তু এত জ্বালাতন না হয়ে তোমাদের নিরেট মাথাগুলো একটু নাড়া দিয়ে সচল করার চেষ্টাও তো হতে পারে। তাই বলছি উনিশশো চৌদ্দ থেকে প্রায় আঠারো পর্যন্ত জার্মান শিখতে শিখতে কাদের আবার ইংরেজি শিখতে হয়েছিল। আর জিরাফ, উটপাখি আর শিম্পাঞ্জি যেখানে পাওয়া যায় সেখানে উটপাখি ছোটা তেপান্তরে অঢেল মিঠে জলের মদত পেয়ে বোথা আর স্মাটসদের সোনালি পাকা গমের সব খামার ছাড়াতে ছাড়াতে কালামাটি ধলা করবে আর কতদূর?
ভুল! ভুল!!
সত্যিই আমরা চমকে উঠেছি সবাই। মায় শিবু পর্যন্ত। কথাগুলো জোরালো গলায় প্রতিবাদ নয়। একটু কৌতুক মেশানো টিপ্পনির মতো। কিন্তু গলাটা স্বয়ং ঘনাদার। , তাঁর দিকে ফিরে দেখি প্লেট সাফ করে বনোয়ারির পরিবেশনের মর্যাদা রেখে তিনি রামভুজের আনা স্পেশ্যাল চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে একটু হাসছেন।
প্রথমটা একটু ধাঁধার মধ্যে পড়লেও গৌরই প্রথম গলায় উপরি উৎসাহ ফুটিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, ভুল তো? শিবু যা বলেছে সবই গুল, মানে ভুল—
না, সব নয়। ওই ঘনাদা তাঁর বাড়িয়ে ধরা ডান তর্জনী আর মধ্যমার মধ্যে খুঁজে দেওয়া শিশিরের সিগারেটটা মুখের কাছে এনে শিশিরের লাইটারের অপেক্ষাতে কথাটা অসমাপ্ত রাখলেন। তারপর শিশির সিগারেটটা ধরিয়ে দেবার পর দুটি সুখটান দিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, প্রথমে যা সব বলেছে তার কোনওটাই ফালতু বুকনি নয়।
ফালতু বুকনি নয়! আমাদের এবার আর অবাক হবার ভান করতে হল না। ওই যে, কী বলছিল, ভিসুভিয়াসের মরা খাঁ খাঁ রোদের রাজ্যে তুষার চূড়ায় পাহাড়–
হ্যাঁ, ও সবই সঠিক বর্ণনা, ঘনাদা সস্নেহে আমাদের অজ্ঞতা যেন ক্ষমা করে বললেন, শিবু যা যা বললে, সবই পৃথিবীর একটি বিশেষ জায়গার নানা রকমারি বিবরণ। বিষুবরেখার লাগাও খাঁ খাঁ রোদের রাজ্যে ভিসুভিয়াস-এর মরা জাতভাই এক তুষার চূড়ার পাহাড় সত্যিই আছে। আফ্রিকার সবচেয়ে উচু সে পাহাড়ের নাম কিলিমানজারো। বহু বছরকাল, আগে ও-পাহাড়টা সত্যিই ছিল এক আগ্নেয়গিরি। তারপর সে আগ্নেয়গিরি কবে থেকে ঠাণ্ডা হয়ে আছে। ওই কিলিমানজারোর কাছেই আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিষ্টি জলের হ্রদ। সাইবিরিয়ার এক বৈকাল হ্রদ ছাড়া যার চেয়ে গভীর হ্রদও দুনিয়ায় নেই।
ভারতবর্ষের সিপাই বিদ্রোহ হয় ১৮৫৭তে। ঠিক তার কিছু আগে এই ভারতের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একজন সেনাপতি এখানকার কাজ ছেড়ে দিয়ে নীল নদের উৎস আবিষ্কারের আশায় দুঃসাহসিক অভিযানে বেরিয়ে পড়েন। নীল নদের উৎস তিনি আবিষ্কার করতে পারেননি। কিন্তু সিপাই বিদ্রোহের পরের বছর ১৮৫৮ সালে সে আবিষ্কারের পথে নীল নদের উৎস রহস্যের কয়েকটি অমূল্য সমাধান সূত্রের সন্ধান পান। এগুলির প্রধান হল ওই কিলিমানজারো পাহাড়ের রাজ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিষ্টি জলের হ্রদ টাঙ্গানাইকা আবিষ্কার।
